বর্তমানের সিরিয়া-লেবানন-জর্দানের জন্ম কিভাবে?

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

বর্তমানের সিরিয়া-লেবানন-জর্দানের জন্ম কিভাবে?

আহমেদ শরীফ ১:৪৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ৩০, ২০১৯

বর্তমানের সিরিয়া-লেবানন-জর্দানের জন্ম কিভাবে?

আল-শাম বা সিরিয়া সর্বদাই মধ্যপ্রাচ্যের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলির একটা। এর অন্তর্গত রয়েছে বর্তমানের সিরিয়া, জর্দান, লেবানন এবং প্যালেস্টাইন। এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপকে একত্রিত করেছে আল-শাম। এর উত্তরে রয়েছে আনাতোলিয়া (বর্তমানের তুরস্ক) ও রাশিয়া, দক্ষিণে মিশর ও আরব উপদ্বীপ, পূর্বে পারস্য এবং পশ্চিমে ইউরোপ এবং ভূমধ্যসাগর। এই অঞ্চলটা ছিল পূর্ব-পশ্চিম এবং উত্তর-দক্ষিণের যোগাযোগের সংযোগস্থল। এশিয়ার সাথে ইউরোপের বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র ছিল সিরিয়া। একারণে বিভিন্ন সময়ে সকল বড়বড় সাম্রাজ্যই চেয়েছিল এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে। তবে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হলো বিশ্বাসগত দিক থেকে এই অঞ্চলের গুরুত্ব। সকল আব্রাহামিক ধর্ম-বিশ্বাসের কাছেই সিরিয়া গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম, খ্রীস্টান এবং ইহুদী – সকলের কাছেই এই অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। আর সিরিয়ার মাঝে সকল বিশ্বাসের কেন্দ্র হলো জেরুজালেম। কাজেই সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণই শুধু নয়, জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ না নিতে পারলে এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ কারো হাতে পুরোপুরিভাবে যাবে না।

কনস্টানটিনোপল থেকে ইস্তাম্বুল এবং ক্রুসেডের শুরু

এই অঞ্চলটায় কৌশলগত বাধা– যেমন অনতিক্রম্য পর্বত, বিশাল নদী বা সাগর নেই। তাই আনাতোলিয়া বা পারস্য বা আরব বা মিশরের দিক থেকে এখানে সামরিক বাহিনী নিয়ে ঢুকে পড়া সহজ। তাই এই অঞ্চলটা সর্বদাই আনাতোলিয়া বা পারস্য বা আরব বা মিশরের নিয়ন্ত্রণে থেকেছে। সপ্তম শতাব্দীতে (৬৩৪ থেকে ৬৩৮ খ্রীস্টাব্দের মাঝে) খলিফা উমর (রাঃ)-এর সময় ইসলামিক শাসনের অধীনে আসে জেরুজালেম-সহ পুরো সিরিয়া। প্রায় একইসাথে পারস্য এবং মিশরও মুসলিমদের অধীন হয়ে যাওয়ায় সিরিয়াকে মুসলিমদের হাত থেকে পুনর্দখল করা ইউরোপিয়দের জন্যে খুবই কঠিন হয়ে যায়। তবে আনাতোলিয়া এবং ভূমধ্যসাগর ইউরোপিয়দের নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে সিরিয়াতে ইউরোপিয় আক্রমণের রাস্তা খোলা রয়ে যায়। আনাতোলিয়া ছিল তৎকালীন পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য বা ব্যাইজ্যানটাইন সাম্রাজ্যের অধীনে, যার রাজধানী ছিল বাইজ্যান্টিয়াম বা কনস্টানটিনোপল, যা বর্তমানে ইস্তাম্বুল বলে পরিচিত। ১৪৫৩ সালে মুসলিম শাসনের অধীনে চলে আসলে শহরটার নতুন নামকরণ করা হয় ইস্তাম্বুল। এর আগে ৩২৪ খ্রীস্টাব্দে রোমান সম্রাট কনস্টানটিন খ্রীস্টধর্ম গ্রহণ করার পর এই শহরের নামকরণ করা হয় কনস্টানটিনোপল। কনস্টানটিনোপল নামকরণ ছিল শহরটার খ্রীস্টান শাসনে আসার মাইলস্টোন। অন্যদিকে ইস্তাম্বুল নামকরণ ছিল শহরটার মুসলিম শাসনের অধীনে আসার মাইলস্টোন। একারণে জেরুজালেম নিয়ে যেমন খ্রীস্টানদের সাথে মুসলিমদের বিরোধ রয়েছে, তেমনি ইস্তাম্বুল নিয়েও রয়েছে। খ্রীস্টানদের মাঝে ইসলাম-বিদ্বেষী মনোভাব এতটাই প্রবল যে, পশ্চিমা বেশিরভাগ লেখায় বর্তমান ইস্তাম্বুলের নাম ইস্তাম্বুল লেখা হয় না; কনস্টানটিনোপল লেখা হয়।

একাদশ শতকে ইউরোপে খ্রীস্টানদের নেতৃত্বে আসেন পোপ দ্বিতীয় আরবান। ফ্রান্সে জন্মগ্রহণকারী এই পোপ ১০৮৮ খ্রীস্টাব্দে তিনি ক্ষমতায় আরোহন করেন। ১০৯৫ সালে তিনি পিয়াচেঞ্জা শহরের (বর্তমান উত্তর ইতালিতে) এক কাউন্সিলে বাইজ্যানটাইন সম্রাটের কাছ থেকে আসা এক দূতকে গ্রহণ করে, যিনি মুসলিমদের হাত থেকে কনস্টানটিনোপলকে রক্ষার জন্যে পোপের সহায়তা চান। বাইজ্যানটাইন সাম্রাজ্য ছিল ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের অধীনে; পোপের রোমান ক্যাথলিক চার্চের অধীনে নয়; তাই এই সহায়তা চাওয়াটা ছিল বেশ অন্য রকমের। এখানে মুসলিমদের বিরুদ্ধে খ্রীস্টানদের ঐক্যকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল। ঐ বছরের ২৭শে নভেম্বর পোপ দ্বিতীয় আরবান ফ্রান্সের শহর ক্লারমন্টে এক বিরাট সভায় ইসলামিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্রুসেডের ডাক দেন। বাইজ্যানটাইন সাম্রাজ্য রক্ষা করার ব্যাপারটা পোপ আরবানের সিরিয়ার পবিত্র-ভূমি পুনরুদ্ধার করার আহ্বানের মাঝে চাপা পড়ে যায়। সেসময় ইসলামিক রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল বাগদাদ। রাষ্ট্রের মাঝে অনেক এলাকার গভর্নররা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে নিজেকে স্বাধীন ভাবতে থাকেন এবং খলিফার শাসনকে অমান্য করতে থাকেন। এই সুযোগটাই ইউরোপিয়রা নেয় এবং কনস্টানটিনোপল ও আনাতোলিয়া হয়ে ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনার এক সেনাবাহিনী সিরিয়া প্রবেশ করে এবং মুসলিমদের বিরোধের সুযোগ নিয়ে ১০৯৯ সালে জেরুজালেম দখল করে নেয়। শহর দখলের পর খ্রিস্টান বাহিনী ঠান্ডা মাথায় শহরের কমপক্ষে ৩০ হাজার মুসলিম ও ইহুদী বাসিন্দাকে হত্যা করে শহর “পবিত্র” করে। একইসাথে সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটা অঞ্চলও তাদের দখলে থাকে। ৮৮ বছর খ্রীস্টান শাসনের পর ১১৮৭ সালে সালাহউদ্দিন আইয়ুবির নেতৃত্বে মুসলিমরা একত্রিত হয়ে জেরুজালেম পুনর্দখল করে নেয়।

সিরিয়াতে মিশনারি কর্মকান্ড

জেরুজালেম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে খ্রিস্টানরা কৌশলগত কিছু ভুল করেছিল। তারা মিশরকে মুসলিম শাসনের অধীনে রেখে দেয়। মিশরের জনসংখ্যা বড় হওয়ায় এখান থেকে একটা বড় সেনাবাহিনীর জেরুজালেম অভিমুখে রওয়ানা হওয়াটা শুধু সময়ের ব্যাপার ছিল। একইসাথে মিশরের শাসক সালাহউদ্দিন যাতে সিরিয়ার অন্যান্য শাসকদেরকে একত্র করতে না পারে, সেব্যাপারে মুসলিমদের মাঝে বিরোধ জিইয়ে রাখার ক্ষেত্রে খ্রিস্টানরা কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনি। তবে ক্রুসেডের পরবর্তীতে ইউরোপিয়রা এব্যাপারে যথেষ্ট জোর দেয়। ১৪৫৩ সালে কনস্টানটিনোপল মুসলিমদের অধীনে চলে যাওয়ায় আনাতোলিয়া হয়ে সিরিয়া আক্রমণের আর পদ্ধতি রইলো না। একমাত্র পথ খোলা থাকে ভূমধ্যসাগরের সমুদ্রপথ ব্যবহার করে। এজন্যেই সিরিয়াতে ইসলামিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করার লক্ষ্যে ইউরোপিয়রা বাণিজ্যকে ব্যবহার করেছিল। বাণিজ্য করার নামে তারা সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অনেকগুলি শহরে শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলে। ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকে ইউরোপিয় রাষ্টগুলি, বিশেষতঃ ভেনিস এবং জেনোয়া সিরিয়ার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। ভেনিস পূর্ব-ভূমধ্যসাগরের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতো বেশকিছু দ্বীপের মাধ্যমে, যার মাঝে ক্রিট, সাইপ্রাস এবং দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জ রয়েছে। এই বাণিজ্যের মাঝে তারা উথমানি খিলাফতের বিরুদ্ধে কাজ করতো। স্থানীয় মানুষজনকে খলিফার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা, শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, জাতিগত বিদ্বেষ উস্কে দেয়া, সরকারের উচ্চপদে নিজেদের লোক বসানো, ইত্যাদি কাজগুলি করতে ভেনিসিয়রা অনেক এজেন্ট ব্যবহার করতো। এদের মাঝে অনেকেই বাইরে থেকে মুসলিম মনে হলেও ভেতরে ছিল খ্রীস্টান; অর্থাৎ তারা তাদের বিশ্বাস পরিবর্তন করেনি, যদিও সমাজের সামনে তারা ছিল মুসলিম। ১৫২২ সালে রোডস দ্বীপ, ১৫৭০ সালে সাইপ্রাস এবং ১৬৬৯ সালে ক্রিট দ্বীপ উথমানিরা দখল করে নেয়, তারপরেও সিরিয়াতে ইউরোপিয়রা তাদের গোপন কাজকর্ম চালিয়ে যায়। ১৬২৫ সালে খ্রীস্টান মিশনারিরা সিরিয়াতে তাদের কর্মকান্ড নতুন করে শুরু করে। এই কর্মকান্ডকে খিলাফত বারংবার বন্ধ করে দেয়; তারপরেও প্রায় ২’শ বছর ধরে তারা তাদের চেষ্টা চালিয়ে যায়। 

ব্রিটিশ-ফরাসী-মার্কিন প্রভাব এবং সংখ্যালঘু রাজনীতি

অষ্টাদশ শতকে সিরিয়াতে ঢোকে ব্রিটিশ এবং ফরাসীরা, এবং পরবর্তীতে উনিশ শতকে এদের সাথে যোগ দেয় আমেরিকানরা। উপকূলীয় শহরগুলি, যেখানে খ্রীস্টান জনসংখ্যা বেশি ছিল, সেখানেই তাদের কর্মকান্ড ছিল বেশি। বিভিন্ন জাতিগত সহিংসতা উস্কে দেবার মাধ্যমে তারা প্রথমে খ্রীস্টানদের নিরাপত্তা হুমকিতে ফেলতো; এবং তারপর খ্রীস্টানদের নিরাপত্তা প্রদানে তারা যুদ্ধজাহাজ প্রেরণ করতো। জাতিগত সহিংসতাকে উস্কে দিতে তারা যত ধরনের ছলচাতুরি রয়েছে, সবগুলিরই ব্যবহার করেছিল। ১৮২০-এর পর থেকে এই মিশনারি কর্মকান্ডের পালে শক্ত হাওয়া লাগে। মিশরের শাসক মুহাম্মদ আলী তার নিজ বংশের স্বার্থকে রাষ্ট্রের স্বার্থের উপর স্থান দিয়ে ব্রিটিশ-ফরাসীদের স্বার্থরক্ষায় তার ছেলে ইব্রাহিম পাশাকে সিরিয়া প্রেরণ করেন। ১৮৩২-এর মাঝে ইব্রাহিম পাশা খলিফার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে পুরো সিরিয়া দখল করে ফেলেন। এসময় ইব্রাহিমকে ঠেকাতে খলিফা রাশিয়ার সাথে চুক্তিতে গেলে ব্রিটিশ-ফরাসীরা নিজেদের স্বার্থরক্ষায় হস্তক্ষেপ করে। তারা মুহাম্মদ আলীকে সিরিয়া ছেড়ে দিতে বাধ্য করেন বটে, কিন্তু মুহাম্মদ আলীর ছেলে ইব্রাহিমকে সিরিয়ার শাসক হিসেবে মেনে নিতে খলিফাকে বাধ্য করা হয়। সিরিয়া খিলাফতের অধীনেই থাকে, কিন্তু পশ্চিমাদের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ইব্রাহিম চলতে থাকেন ইউরোপিয়দের কথায়। ইব্রাহিমের পৃষ্ঠপোষকতায় বৈরুতে চালু করা হয় নতুন খ্রিস্টান মিশনারি সেন্টার।

১৮৩৪ সালে মার্কিন প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারি এলি স্মিথ এবং তার স্ত্রী হেটি বাটলার স্মিথ বৈরুতে এসে ঘাঁটি গাড়েন। স্মিথ সিরিয়াতে একটা মিশনারি প্রিন্টিং প্রেস চালু করেন, যার মাধ্যমে আরবী ভাষায় খ্রীস্টান ধর্ম প্রচারের ব্যবস্থা করেন তিনি। মুসলিম ঘরে ঘরে বাইবেল পৌঁছে দেয়ার কাজটাও তিনিই শুরু করেন। স্মিথের কাজ এগিয়ে নেন আরেক মিশনারি কর্নেলিয়াস ভ্যান ডাইক, যিনি বাইবেলের আরবী অনুবাদ করেন। ‘আমেরিকান বোর্ড অব কমিশনারস ফর ফরেন মিশনস’ নামক সংস্থা ভ্যান ডাইককে ১৮৪০ সালে সিরিয়া পাঠায়। সেসময় থেকে ৫০ বছর ভ্যান ডাইক সিরিয়াতে মিশনারি কাজ করেন। স্যামুয়েল ম্যারিনাস জোয়েমার-এর নামও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তিনি ১৮৯০ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে মিশনারি কাজ করা শুরু করেন এবং গোটা পঞ্চাশের মতো বই লেখেন মুসলিম বিশ্বকে ইসলাম থেকে সরাবার লক্ষ্যে। তিনি বলতেন যে, ইসলাম থেকে সরে আসা মানেই উন্নতি; আর ইসলামের দিকে ধাবিত হওয়া মানেই অবনতি।

এই সময়েই সিরিয়াতে ফরাসীরা তাদের প্রভাব বাড়াতে থাকলে ব্রিটিশদের সাথে তাদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেবার জন্যে ফরাসীরা মাউন্ট লেবানন এলাকায় বসবাসকারী মারোনাইট খ্রীস্টানদের উস্কে দিতে থাকে। অন্যদিকে ব্রিটিশরা উস্কে দিতে থাকে দ্রুজ ধর্মের অনুসারীদের। খ্রীস্টীয় চতুর্থ শতক থেকে খ্রীস্টান ধর্মগুরু মারন-এর অনুসারীদের মারোনাইট খ্রীস্টান বলা হয়। মারোনাইটরা কনস্টানটিনোপল-এর ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চকে অনুসরণ করলেও ক্রুসেডের সময় ফরাসী এবং রোমান ক্যাথলিকদের সাথে তাদের যোগাযোগের পর ফ্রান্সকে অনুসরণ করতে থাকে। ফরাসীরা এই সূত্র ধরে মারোনাইটদের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করে সিরিয়াতে নিজেদের প্রভাব বাড়ায়। আর দ্রুজরা একাদশ শতকে শিয়া মুসলিম থেকে বের হয়ে নিজেদের ধর্ম প্রতিষ্ঠা করে। ইসলাম ত্যাগ করলে মুসলিম শাসকরা যে তাদের শাস্তি দেবেন, সেটা তারা জানতো। তবে দ্রুজরা খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। দ্রুজরা সংখ্যায় অল্প হলেও মারোনাইটদের তুলনায় তারা বেশ প্রভাবশালী ছিল। দুই শক্তিশালী রাষ্ট্রের ইন্ধনে দুই গোষ্ঠীর মাঝে গৃহযুদ্ধ আরম্ভ হয়। ১৮৬০ সালে মারাত্মক গণহত্যার সূচনা হয়। বহু মানুষের হতাহতের মাঝে ব্রিটিশ-ফরাসীরা নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে হস্তক্ষেপ করে। ফ্রান্স সিরিয়াতে সৈন্য অবতরণ করে নিজেদের স্বার্থকে রক্ষা করে।

ইউরোপিয় বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন

ফরাসীরা তাদের প্রভাব বাড়াতে ‘সেন্ট জোসেফ জেসুইট ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠা করে। তাদের দেখাদেখি ১৮৬৬ সালে মার্কিন মিশনারি উইলিয়াম ম্যাকলুর থমসন ‘প্রোটেস্ট্যান্ট কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা কিনা বর্তমানে ‘আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত’ নামে পরিচিত। প্রতিটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের মাঝে মিশনারি কর্মকান্ড চালানো, যাতে ইসলাম ছেড়ে মানুষ খ্রীষ্টধর্ম নেয়, অথবা নূন্যপক্ষে তারা যেন ইসলাম থেকে সরে আসে বা ইসলামের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা শুরু করে। 

মিশনারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি আরবী ভাষাকে ব্যবহার করে আরব জাতীয়তাবাদ উস্কে দেয়। এই জাতীয়তাবাদ তুর্কীদের থেকে আরবদের আলাদা করে। ইস্তাম্বুলের অধীন উথমানি খিলাফতকে “তুর্কী” খিলাফত বলা শুরু হয়, যাতে আরবকে ইসলামিক রাষ্ট্র থেকে আলাদা করা যায়। এই উদ্দেশ্যে মারোনাইট খ্রিস্টানরা আরবী ভাষার ইতিহাস এবং গর্বকে তুলে ধরার চেষ্টা করে এবং সকলকে নিজেদের আরব উৎসের প্রতি আসক্ত করে তোলার চেষ্টা করে। একইসাথে বৈরুত সেন্টার থেকে বহু পশ্চিমা বই ছাপানো হয় আরবী ভাষায় অনুবাদ করে। ১৮৪২ সালে বৈরুতে একটা ‘সায়েন্টিফিক এসোসিয়েশন’ গঠন করা হয়, যা ১৮৪৭ সালে হয় ‘দ্যা সায়েন্স এন্ড আর্টস এসোসিয়েশন’। খ্রিস্টানদের মাঝ থেকে বুট্রোস আল-বুসতানি এবং নাসিফ আল-ইয়াজিজি এটা গঠন করলেও তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দেন কর্নেল চার্চিল, এলি স্মিথ এবং কর্নেলিয়াস ভ্যান ডাইক। মুসলিমদের নিয়ে আসতে না পারার কারণে ১৮৫০ সালে ‘ইস্টার্ন এসোসিয়েশন’ নামে ফরাসী জেসুইট ফাদার হেনরি ডেব্রেনিয়ে-র নেতৃত্বে আরেকটা সংগঠন তৈরি করা হয়। এটাও মুসলিমদের নিয়ে আসতে পারেনি বিধায় ১৮৫৭ সালে আরও একটা এসোসিয়েশন গঠন করা হয়। পশ্চিমারা সংগঠনের মাঝে থাকা থেকে বিরত থাকায় এবারে প্রায় দেড়’শ সদস্য রিক্রুট হয়, যাদের মাঝে বেশ কিছু মুসলিম এবং দ্রুজ ছিল। ১৮৭৫ সালে ‘সিক্রেট এসোসিয়েশন’ নামে আরেকটা সংগঠন তৈরি করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক। খ্রিস্টান, মুসলিম এবং দ্রুজরা এর সদস্য ছিল। এরা গোপনে লিফলেট বিলি করতো, যেগুলির মাঝে বলা হতো যে– তুর্কীরা আরবদের কাছ থেকে খিলাফত কেড়ে নিয়েছে। এসব কর্মকান্ডের মাধ্যমে আরবরা রাজনৈতিকভাবে উচ্চতর অবস্থানে না পৌঁছালেও খলিফার শাসন থেকে আলাদা হবার প্রস্তুতি নিতে থাকে।

সাইকস-পিকো চুক্তি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝে ১৯১৬ সালে ব্রিটিশ কূটনীতিক মার্ক সাইকস ফরাসী কূটনীতিক ফ্রাঁসোয়া গিওর্গেস-পিকো এক গোপন বৈঠক করেন; রাশিয়াও সেই বৈঠকের অংশ ছিল। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে উথমানি খিলাফতকে ধ্বংস করে এর অঞ্চলগুলি তারা নিজেদের মাঝে ভাগ করে নেবে। মানচিত্রের উপর দাগ দিয়ে এই অঞ্চলগুলি ভাগ করা হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী প্যালেস্টাইন, জর্দান এবং ইরাক থাকবে ব্রিটিশদের অধীনে; সিরিয়া, লেবানন থাকবে ফ্রান্সের কাছে; আনাতোলিয়া এবং বসফরাস প্রণালী থাকবে রাশিয়ার অধীনে। তবে রাশিয়াতে বলশেভিক বিপ্লবের পরে এই চুক্তিতে পরিবর্তন হয়। ফ্রান্স তার পূর্বের প্রভাবের জায়গাগুলিই চেয়েছিল, যেখানে সেই ক্রুসেডের সময় থেকেই তারা প্রভাব বিস্তার করেছিল। ব্রিটিশরা মক্কার শরীফ হুসেইন বিন আলীকে ইসলামের খলিফা বানিয়ে দেবে বলে বললেও প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশরা তাদেরকে খিলাফতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করেছিল মাত্র। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ইন্টেলিজেন্স অফিসার ক্যাপ্টেন টি ই লরেন্স আরবদের এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিল। তবে সাইকস-পিকো চুক্তি এবং ব্যালফুর ডিক্লারেশনের মাধ্যমে ইস্রাইলের সৃষ্টিতে হুসেইন বিন আলী বুঝেছিল যে ব্রিটিশরা তাকে কতটুকু ব্যবহার করেছে। হুসেইন বিন আলীর এক ছেলে আবদুল্লাহকে নতুন রাষ্ট্র জর্দানের রাজা বানানো হয় এবং আরেক ছেলে ফয়সালকে আরেক নতুন রাষ্ট্র ইরাকের রাজা বানানো হয়। অন্যদিকে রাশিয়া কমিউনিস্ট হয়ে যাওয়ায় বসফরাস প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার হাতে দেয়া হয়নি; দেয়া হয়েছিল নতুন রাষ্ট্র তুরস্কের হাতে, যা কিনা ব্রিটিশদের পক্ষেই থাকবে। এই রাষ্ট্রগুলির প্রত্যেকটারই নেতৃত্বে থাকে পশ্চিমাদের পছন্দের লোকজন। রাষ্ট্রগুলির গুরুত্বপূর্ণ পদ্গুলিতেও তাদেরই মনোনীত লোকজন স্থান পায়। একারণেই ১৯৪৮ সালে ইস্রাইল স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেবার পর সবগুলি আরব দেশ মিলেও ইস্রাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হতে পারেনি।

আল-শাম বা সিরিয়াকে ভেঙ্গে ব্রিটিশ অংশ থেকে তৈরি হয়েছিল জর্দান এবং ইস্রাইল। ‘ম্যান্ডেট ফর সিরিয়া এন্ড দ্যা লেবানন’এর মাধ্যমে ফরাসীরা বেশ কয়েকটা রাষ্ট্র তৈরি করতে চেয়েছিল –স্টেট অব আলেপ্পো, দামাস্কাস, আলাওয়াতি, গ্রেটার লেবানন, জাবাল দ্রুজ। তবে ব্রিটিশ বাধার মুখে শেষ পর্যন্ত ফরাসীদেরকে সিরিয়া এবং লেবানন গঠন করেই ক্ষান্ত হতে হয়েছিল। গ্রেটার লেবানন হয়েছিল বর্তমানের লেবানন; আর আলেপ্পো, দামাস্কাস, দ্রুজ এবং আলাওয়াতি নিয়ে বর্তমান সিরিয়া। ফরাসীদের রেখে যাওয়া রীতি অনুসারে সিরিয়ার ক্ষমতা এখনও সংখ্যালঘু আলাওয়াতি সম্প্রদায়ের হাতেই রয়েছে।

আল-শাম বা সিরিয়ার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

সিরিয়ার কোন প্রাকৃতিক সীমানা নেই। এই এলাকাটা চারিদিক থেকেই আক্রমণ করা সম্ভব। কোন পাহাড়, নদী বা সমুদ্র কাউকে সিরিয়া আক্রমণ থেকে দূরে রাখতে পারেনি। পুরো আল-শাম-এর আকৃতি ৩ লক্ষ বর্গ কিঃমিঃ-এরও বেশি; কিন্তু এখানকার জনসংখ্যা কম – সিরিয়া ২ কোটির কম; জর্দান ১ কোটির কম; লেবানন ৬১ লক্ষ; ইস্রাইল ৮৭ লক্ষ – মোট সাড়ে ৪ কোটির কম। এর দক্ষিণে আরবের (সৌদি আরব, আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, ইয়েমেন) জনসংখ্যা ৭ কোটিরও বেশি; পূর্বে ইরাক-ইরানের জনসংখ্যা ১২ কোটির বেশি; উত্তরে তুরস্কের জনসংখ্যা প্রায় ৮ কোটি; দক্ষিণ-পশ্চিমে মিশরের জনসংখ্যা প্রায় ১০ কোটি। অর্থাৎ আল-শামের জনসংখ্যা এর আশেপাশের এলাকার চাইতে অনেক কম, যা কিনা আল-শাম-এর নিরাপত্তাকে আশেপাশের এলাকার উপরে নির্ভরশীল করছে। একইসাথে আল-শাম-এর সাড়ে চার কোটি জনসংখ্যার মাঝে ৪০ লক্ষের বেশি আলাওয়াতি, ৬৩ লক্ষ ইহুদি, ২৫ লক্ষ খ্রীস্টান, প্রায় ১০ লক্ষ দ্রুজ। অর্থাৎ এই এলাকার বিশ্বাসগত পার্থক্য অনেক, যা কিনা এই এলাকাকে বিভাজিত করার জন্যে ইউরোপিয় শক্তিদের সহায়তা করেছে। আরব জাতীয়তাবাদ উস্কে দিতে সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ পশ্চিমা-সমর্থিত মিশরের শাসকের হাতে থাকাটা ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেই শাসকই সিরিয়াতে ইউরোপিয়দেরকে মিশনারি কর্যক্রমের সুযোগ করে দেয়।   

আবার, আল-শাম-এর ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। আল-শাম এবং পারস্যের (ইরাক) খণিজ তেলের বেশিরভাগ ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরগুলি হয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানি হয়। এককালে চীন এবং মধ্য এশিয়ার সাথে ইউরোপের বাণিজ্য হতো আল-শাম-এর সমুদ্রবন্দরগুলির মাধ্যমে। সুয়েজ খাল চালু করার পর থেকে এশিয়ার স্থলভাগের উপর দিয়ে যাওয়া এই বাণিজ্যপথের গুরুত্ব কমে আসে। সুয়েজ খাল তৈরি হবার আগে আল-শাম-এর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ সকল শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ পুরষ্কার ছিল। গ্রীক, পারস্য এবং মিশরীয় সাম্রাজ্য আল-শাম-কে নিয়ন্ত্রণ করেছে। রোমানরাও এই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করেছিল। এরপর পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য বা বাইজ্যানটাইন সাম্রাজ্যও এর নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই অঞ্চল ইসলামিক রাষ্ট্রের অধীনে আসে সপ্তম শতাব্দীতে। গ্রীক, রোমান এবং বাইজ্যানটাইন সাম্রাজ্য উত্তরের আনাতোলিয়া (বর্তমান তুরস্ক) নিয়ন্ত্রণের পর আল-শাম-এ ঢুকেছিল। পারস্য এবং মোঙ্গলরা এখানে এসেছিল পূর্বে অবস্থিত ইরাক-ইরান হয়ে। আর ইসলাম এখানে এসেছিল দক্ষিণের আরব থেকে। পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর হয়ে সমুদ্র-পথেও আল-শাম আক্রান্ত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। আশপাশের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি আল-শাম-এর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পুরো শক্তি নিয়োগ করেছে।  

তবে ইসলামিক শাসনের সময়ে আল-শাম-এর নিরাপত্তা এসেছে বিভিন্ন দিক থেকে। সপ্তম শতকে এই নিরাপত্তা এসেছে আরব থেকে। এরপর পারস্য এবং মিশর ইসলামের অধীনে চলে আসার পর থেকে আল-শামের নিরাপত্তা এসেছে তিন দিক থেকে। উমাইয়া খিলাফতের সময় প্রায় ৮৩ বছর ইসলামের রাজধানী ছিল দামাস্কাসে। এরপর আব্বাসী খিলাফতের সময়ে রাজধানী চলে যায় পারস্যের কুফা, বাগদাদ, রাক্কা, সামারা এবং অন্যান্য শহরে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মোঙ্গল আক্রমণের পর কিছু সময়ের জন্যে রাজধানী চলে যায় মিশরের কায়রোতে। এরপর পঞ্চদশ শতকে উথমানি খিলাফতের রাজধানী চলে যায় ইস্তাম্বুলে। তবে রাজধানী যেখনেই থাকুক না কেন, আল-শাম-এর গুরুত্ব, বিশেষ করে জেরুজালেমের গুরুত্ব, ইসলামের কাছে কখনোই কমে যায়নি। যেকারণে আল-শাম-কে রক্ষা করাটা ইসলামিক রাষ্ট্রের জন্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। একে রক্ষা করতে গিয়ে জীবন দেয়াটা বিশ্বাসগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই পুরো ব্যাপারটা পরিবর্তিত হয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে, যখন উথমানি খিলাফতের পতনের সাথে সাথে মিশর, আরব, পারস্য এবং আনাতোলিয়া – অর্থাৎ পুরো মধ্যপ্রাচ্য পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। আল-শামের আশেপাশের আনাতোলিয়া-মিশর-আরব-পারস্যের নিয়ন্ত্রণ পশ্চিমাদের হাতে চলে যাওয়ায় আল-শামের ভবিষ্যৎ স্বাভাবিকভাবেই নির্ধারিত হয়ে যায়। যেহেতু এই পুরো এলাকা ছিল ইসলামি রাষ্ট্রের অধীনে, সেই রাষ্ট্র না থাকায় এর ভবিষ্যৎও নির্ধারিত হয় পশ্চিমাদের দ্বারাই।

লেখক: ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: আরও পড়ুন

আরও