ট্রাম্পের স্বীকৃতিতে নেতানিয়াহুর লাভ, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষতি

ঢাকা, ২৪ মার্চ, ২০১৯ | 2 0 1

ট্রাম্পের স্বীকৃতিতে নেতানিয়াহুর লাভ, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষতি

পরিবর্তন ডেস্ক ৯:২৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৬, ২০১৯

ট্রাম্পের স্বীকৃতিতে নেতানিয়াহুর লাভ, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষতি

দখলকৃত গোলান মালভূমিকে ইসরাইলের সার্বভৌম এলাকা হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বীকৃতি দিয়েছেন সোমবার।

নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জন্য ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ স্বর্গের অমৃতের মতো।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়, এর ফলে আরব অঞ্চলের অধিবাসীদের মনে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে কোনও একদিন শান্তি প্রতিষ্ঠার যে আশা ছিল তা চূর্ণ হয়ে গেছে। এই প্রক্রিয়ায় ওয়াশিংটন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবে না এমন সন্দেহও বেড়ে গেছে।

কিন্তু শত্রু-মিত্র দুই পক্ষই একটা বিষয়ে একমত হবেন- ১৯৬৭'র যুদ্ধে ইসরাইল কর্তৃক সিরিয়া থেকে দখলকৃত গোলান মালভূমি নিয়ে বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের দেয়া বক্তব্য একটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল। ১৯৮১ সালে ইসরাইল এলাকাটি তাদের দেশের অন্তর্ভুক্ত করে, যা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বেআইনি বলে ঘোষণা করে।

ট্রাম্প যখন টুইটারে এই ঘোষণা দিচ্ছিলেন তখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ইসরাইল সফরে ছিলেন। সেখানে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'আমি আত্মবিশ্বাসী যে ঈশ্বর এখানে সক্রিয় করছেন।'

এই ঘোষণার জন্য নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। আগামী ৯ এপ্রিল তিনি পুনরায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার জন্য নির্বাচনে লড়বেন। কিন্তু তিনটি দুর্নীতি মামলায় তার সাজা হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় কঠিন চাপের মধ্যে আছেন নেতানিয়াহু।

 

যুক্তরাষ্ট্র সফরে সোমবার ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের কথা ছিল নেতানিয়াহুর। নেতানিয়াহু একে একজন ইসরাইলি নেতা ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বন্ধন হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে, ট্রাম্প বলেছেন গোলান মালভূমি নিয়ে তার সিদ্ধান্তের সঙ্গে আসন্ন নির্বাচনের কোনও সম্পর্ক নেই।

কিন্তু, গত ডিসেম্বরে ট্রাম জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর অন্য পরাশক্তিগুলোও পরের জমি দখল করে নিজ দেশের অন্তর্ভুক্ত করতে উৎসাহিত করতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার মার্কিন পরিকল্পনা উত্থাপন ব্যাহত হতে পারে এবং আরব প্রতিবেশীদের সঙ্গে আবারও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে ইসরাইল, বলছেন মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকরা।

'ডোনাল্ড ট্রাম্প এটা নিশ্চিত করেছেন যে আগামী বেশ কয়েক দশক ধরে ইসরাইল তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে স্থায়ী যুদ্ধাবস্থায় থাকবে,' বলেন ফাওয়াজ গের্গেস। তিনি লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের একজন অধ্যাপক এবং 'মেকিং দ্য অ্যারাব ওয়ার্ল্ড' বইটির লেখক।

'ট্রাম্প শান্তি প্রক্রিয়া এবং আরব-ইসরাইল সমঝোতায় শেষ পেরেকটা ঠুকেছেন। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট। সেখানে আর আলোচনার কিছু বাকি নেই,' বলেন তিনি।

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, নিষ্ঠাবান খ্রিস্টানদের বিপুল পরিমাণ ভোট পেয়ে ২০২০ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য ট্রাম্প এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। এদের অনেকেই ২০১৬ সালে তাকে ভোট দিয়েছেন এবং তার প্রশাসনে পম্পেও, ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সসহ অন্যান্যরাও এদেরকে ব্যাপক সমর্থন দিয়েছেন।

গোলান মালভূমির স্বীকৃতি দেয়াসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে ইসরাইল-আরব দ্বন্দ্বের গতিপ্রকৃতি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

হোয়াইট হাউজ কর্মকর্তারা বলছেন, জেরুজালেম এবং ইসরাইল বিষয়ে মার্কিন সিদ্ধান্ত মাটিতে বিদ্যমান বাস্তবার প্রতিফলন এবং এটাকে শান্তি প্রক্রিয়ার ভিত্তি হিসেবে নেয়া অপরিহার্য।

ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত জেসন গ্রিনব্লাট বলেন, 'ইসরাইল গোলানের নিয়ন্ত্রণ সিরিয়া বা ইরানের মতো বিপথগামী কোনও দেশের হাতে ছেড়ে দিবে এটা অচিন্তনীয়।'

কিন্তু ইয়েমেন, সিরিয়া, লিবিয়া, আলজেরিয়া, সুদান এবং কাতারের সংকট এবং শিয়া ইরানের সঙ্গে দ্বন্দ্বে ব্যস্ত সুন্নি আরব নেতারা ইসরাইল সমস্যার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে পারছেন না।

ট্রাম্পের সহযোগীরা একান্তে জানিয়েছেন, তারা মনে করেন জেরুজালেম নিয়ে তার সিদ্ধান্তে আরব বিশ্বে যতটা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেছিলেন, ততটা দেখা যায়নি। নাম গোপন রাখার শর্তে রয়টার্সকে একথা জানান সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।

ওই ব্যক্তি বলেন, গালফে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো তাদের সাধারণ শত্রু ইরানের মোকাবেলায় সাম্প্রতিক সময়ে পর্দার আড়ালে ইসরাইলের সঙ্গে নিরাপত্তা বিষয়ক যোগাযোগ গড়ে তুলেছে। এরা কেউ জেরুজালেম ইস্যুতে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পর এই যোগাযোগ বন্ধ করেনি।

ট্রাম্পের সহযোগীরা তাকে বলেছেন, আবারও এমন ঝড় উঠলে তারা সামাল দিতে পারবেন, জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্রটি।

ছায়া যুদ্ধ বা প্রক্সি ওয়ারে সিরিয়ায় ইরানের সৈন্যদের অবস্থানের বিষয়ে ইসরাইলের উদ্বেগে গত বছর ট্রাম্পের প্রশাসনে এসব পদক্ষেপের প্রক্রিয়া তরান্বিত হয় বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

কিন্তু অনেকেই সন্দেহ করছেন, এসব পদক্ষেপের ফলে ইরান ও তাদের স্থানীয় মিত্র হিজবুল্লাহ ইসরাইলে নতুন করে হামলা চালানোর যৌক্তিকতা খুঁজে পাবে এবং ইরান-বিদ্বেষী আরব নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ মেনে নিলে বেকায়দায় পড়ে যাবেন।

ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০১৫ সালে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে ইরান যে পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল তা থেকে গত বছর একতরফা ভাবে বেরিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র।

কিন্তু জেরুজালেম ও গোলান মালভূমি বিষয়ে মার্কিন সিদ্ধান্তের পর ইরান ও হিজবুল্লারা নিজেদেরকে ফিলিস্তিনিদের দাবির একমাত্র একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।  

তারা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে শত্রুপক্ষ হিসেবে চিত্রিত করতে সাহায্য করতে পারে।

'এটা ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরান-হিজবুল্লা-আসাদের প্রতিরোধকে শক্তি জোগাবে,' বলেন গালিপ দালায়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ভিজিটিং ফেলো মনে করেন, মার্কিন পদক্ষেপে ইরানি জোটের 'শক্তিশালী প্রতীকী বিজয় হয়েছে' এবং তারা এখন 'নৈতিক ভাবে উন্নততর' অবস্থানে রয়েছে।

তিনি বলেন, আরব নেতারা প্রকাশ্যে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে পারবেন না। কারণ এতে তাদের জনপ্রিয়তা হুমকির মুখে পড়বে, এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা বিশেষ জনপ্রিয় নন।

মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ডেনিশ রস বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে আরও দুর্বল অবস্থানে চলে যাচ্ছে আরব দেশগুলো।

রস আরও বলেন, গোলান মালভূমিকে স্বীকৃতি দেয়ায় ইসরাইলের ডানপন্থীরা দখলকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ স্থাপনাগুলোও  তাদের দেশের অন্তর্ভুক্ত করতে সাহসী হয়ে উঠতে পারে।

'আমার চিন্তা হচ্ছে ইসরাইলের ডানপন্থীরা হয়ত বলবে, 'ওরা এটাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। পশ্চিম তীরের কিছু অংশ বা পুরোটা দখল করে নেয়া শুধু সময়ের ব্যাপার।' তেমন হলে দুই রাষ্ট্র সমাধানের কোনও পথ থাকবে না,' বলেন তিনি।

এমআর/এসবি

 

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: আরও পড়ুন

আরও