মসজিদে হামলার ভিডিও কেন ব্যবহার করছেন এরদোয়ান?

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

মসজিদে হামলার ভিডিও কেন ব্যবহার করছেন এরদোয়ান?

পরিবর্তন ডেস্ক ৬:০২ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৪, ২০১৯

মসজিদে হামলার ভিডিও কেন ব্যবহার করছেন এরদোয়ান?

ভিডিওটা শুরু হয় নাটকীয় বাজনার সঙ্গে। বিশেষ প্রভাব তৈরির জন্য এটা এডিট করে যোগ করা হয়েছে।

এরপর নিউজিল্যান্ডের বন্দুকধারী সন্ত্রাসী হামলা চালানোর আগে যে ইশতেহার প্রকাশ করেছিল সেটির স্থিরচিত্র দেখানো হয় ভিডিওতে। ইশতেহারের যেসব জায়গায় তুরস্ককে লক্ষ্য করে বক্তব্য দেয়া আছে সেগুলো হাইলাইট করে অনুবাদ করা হয়েছে ভিডিওতে।

এরপর দেখানো হয় হামলাকারী ক্রাইস্টচার্চের মসজিদের ভিতর গুলিবর্ষণের যে লাইভ ভিডিও প্রকাশ করেছিল সেটি দেখানো হয়।

এরপর, দেখানো হয় তুরস্কের বিরোধীদলীয় নেতা কামাল কিলিকদাররোগলুর একটি ভাষণ, যেখানে তাকে বলতে দেখা যায় ‘ইসলামি বিশ্বে শিকড় গেড়ে আছে সন্ত্রাসবাদ’।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এই ভিডিও দেখানোর পর উপস্থিত জনতা উম্মত্ত হয়ে দুয়োধ্বনি দিতে থাকে। তিনি কমপক্ষে আটটি নির্বাচনী প্রচারণার র‍্যালিতে এই ভিডিও দেখিয়েছেন বলে গত সপ্তাহে জানান বিবিসির সাংবাদিক মার্ক লোয়েন।

‘কামাল সন্ত্রাসীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন!,’ একটি সভায় বলেন প্রেসিডেন্ট।

আরেকটি সভায় তিনি ক্রাইস্টচার্চের হামলাকারীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তোমাকে এর মূল্য দিতে হবে। যদি নিউজিল্যান্ড তোমাকে এটা দিতে বাধ্য না করে, তাহলে আমরা করব।’ এরপর নিউজিল্যান্ডকে তিনি ফের মৃত্যুদণ্ড চালু করার আহ্বান জানান।

‘এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা আরও সংঘবদ্ধ কিছু,’ মন্তব্য করেন এরদোয়ান। পরে তিনি অভিযোগ করেন, পশ্চিমারা ওই হামলাকারীর ইশতেহার ‘তৈরি করে তার হাতে দিয়েছে।’

সারা বিশ্বজুড়ে ওই হামলার ভিডিও প্রচারের বিরুদ্ধে নিন্দা চলছে। ফেসবুক ১৫ লাখ সাইট থেকে ওই ভিডিও সরিয়েছে। কিন্তু ন্যাটোর সদস্য একটি দেশের নেতা এরদোয়ান নিউজিল্যান্ডের শোককে নিজের কাজে লাগাতে চাওয়ায় এবং বারবার নির্বাচনী র‍্যালিতে প্রদর্শনের বিষয়টি একই সঙ্গে বিভ্রান্তিকর ও পীড়াদায়ক।

নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটারস এটাকে ‘অন্যায্য’ বলে অভিহিত করেছেন এবং এতে বিদেশে দেশটির নাগরিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলে সতর্ক করেছেন।

এরপরও এরদোয়ান একই কাজ করে চলেছেন এবং আরও বেশি এগিয়ে গেছেন।

গ্যালিপলিতে অটোমান সৈন্যরা ব্রিটিশদের বাহিনীকে পরাজিত করেছিল। ওই বাহিনীতে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সৈন্যরাও ছিল।

১৯১৫ সালের গ্যালিপলি যুদ্ধের বর্ষপূর্তির সময় আয়োজিত একটি র‍্যালিতে গত সপ্তাহে তিনি মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে তুরস্কে যাওয়ার বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন:

‘আপনাদের দাদারা এসেছিলেন এখানে এবং কফিনে করে ফিরে গেছেন। নিঃসন্দেহ থাকুন: আমরা আপনাদেরও আপনাদের দাদাদের মতো ফেরত পাঠাবো।’

এরপর অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী তুরস্কের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠান এবং সেখানে ভ্রমণরত অস্ট্রেলীয়দের জন্য দেয়া বিভিন্ন উপদেশ পুনর্মূল্যায়ন করেন।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আসলে কী করতে চাইছেন?

মূলত এটাই আদি অকৃত্রিম এরদোয়ান।

তিনি নিজেকে মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসবে চিত্রিত করতে পছন্দ করেন। মসজিদে হামলার পরপরই তিনি তার সহযোগী এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে নিউজিল্যান্ডে পাঠান।

সন্ত্রাসী হামলার দায়ে অভিযুক্ত অস্ট্রেলীয় নাগরিক ব্রেন্টন টারান্ট তার ইশতেহারের কয়েক জায়গায় তুর্কিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়েছেন। মুসলিমদের প্রতি অন্যায় করার জন্য বহুদিন ধরে পশ্চিমাদের সমালোচনা করে আসছেন এবং ‘ইসলামিস্ট টেররিজম বা ইসলামি সন্ত্রাসবাদ’ এই ধারণার সমালোচনা করছেন এমন একজন গর্বিত ইসলামিক প্রেসিডেন্টের জন্য এই হামলা আদর্শ একটা সুযোগ।

একটা শত্রুপক্ষ তৈরি করলে, তুরস্ক হুমকির মুখে আছে এবং তিনি তার রক্ষাকর্তা নিজেকে এমন ভাবে চিত্রিত করলে এরদোয়ানের উন্নতি লাভ সহজ হয়। এবং এতে সবচেয়ে বেশি লাভ হয় নির্বাচনের আগে।

এ মাসে স্থানীয় নির্বাচনে তার দল কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন। সেখানে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, ডলারের বিপরীতে তুরস্কের মুদ্রার মূল্য কমে যাওয়ায় এরদোয়ান মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নিতে আগ্রহী।

দুই বছর আগে একটি গণভোটের সময় তিনি জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। সেসব জায়গায় তুর্কি মন্ত্রীদের বৈঠক নিষিদ্ধ করায় তিনি এই দেশগুলোকে ‘নাৎসি’ এবং ‘ফ্যাসিবাদি’ বলে আখ্যায়িত করেন, এবং পুরো প্রচারণার সময় তিনি শুধু এগুলো নিয়েই কথা বলেন।

আগের র‍্যালিগুলোতে তিনি বহির্বিশ্বে তুরস্ক সম্পর্কে প্রচারিত প্রতিবেদনের প্রতি সমর্থকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিবিসিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সমালোচনা করেন।

এছাড়াও তার নিয়মিত আক্রমণের লক্ষ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, জাতিসংঘ। সেই সঙ্গে তার দেশের ভিতরেই থাকা শত্রুদেরও নিয়মিত সমালোচনা করেন তিনি, যাদের মধ্যে রয়েছে কুর্দি ‘জঙ্গি’ এবং ২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের হোতারা।

দেশটিতে প্রচলিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হচ্ছে পশ্চিমারা তুরস্ককে টুকরো টুকরো করতে চায়। সেখানে সবার জানা একটা আপ্তবাক্য হচ্ছে ‘একজন তুর্কির বন্ধু কেবল আরেক তুর্কি’।

এবং সর্বোপরি, এসব বক্তব্যের ব্যাপক আবেদন রয়েছে রক্ষণশীল, ধার্মিক সমর্থক গোষ্ঠীর কাছে, যারা এরদোয়ানের রুদ্রমূর্তি দেখে উদ্বেলিত হন। যত যাই হোক, আবারও নির্বাচনে জয়ী হতে তার দরকার দেশের অর্ধেক মানুষের সমর্থন।

বিপদজনকভাবে বিভাজিত তুরস্কের অন্য অর্ধেক অধিক পশ্চিমাপন্থি এবং ধর্ম নিরপেক্ষ জনগোষ্ঠী বরাবরের মতোই শঙ্কিত। ক্রাইস্টচার্চের ভিডিও দেখিয়ে ‘পয়েন্ট কুড়ানোর’ সমালোচনা করেছেন বিরোধী দলের মুখপাত্র।

তুরস্কের আমন্ত্রণে নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তুরস্ক সফরে গিয়ে বিষয়গুলো সুরাহা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

কিন্তু, অন্যান্য দেশের সরকারেরা যেমন বার বার টের পেয়েছে যে, তুরস্কের যুদ্ধংদেহী নেতার সঙ্গে কাজ করা কোনও সহজ খেলা নয় এবং তিনি এতে জেতার আর্টটা তিনি বেশ ভালই রপ্ত করেছেন।

[মার্ক লোয়েন ইস্তানবুলে নিযুক্ত বিবিসি প্রতিনিধি]

এমআর/এএসটি

 

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: আরও পড়ুন

আরও