অস্ট্রেলিয়ার সাথে বিবাদে জড়িয়ে এরদোয়ান কী পেতে চাইছেন?

ঢাকা, ২৬ মার্চ, ২০১৯ | 2 0 1

অস্ট্রেলিয়ার সাথে বিবাদে জড়িয়ে এরদোয়ান কী পেতে চাইছেন?

আহমেদ শরীফ ৫:৪৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৪, ২০১৯

অস্ট্রেলিয়ার সাথে বিবাদে জড়িয়ে এরদোয়ান কী পেতে চাইছেন?

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে খ্রীস্টান জঙ্গী হামলার তিনদিন পর, অর্থাৎ ১৮ই মার্চ, তুর্কী প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোয়ান এক নতুন বিতর্কের জন্ম দেন। দুই সপ্তাহের মাঝে তুরস্কে মিউনিসিপ্যাল নির্বাচন। এই নির্বাচনে জয়লাভ করা এরদোয়ানের ক্ষমতাসীন ‘একে পার্টি’র জন্যে গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখা হচ্ছে। কারণ অনেকেই এই নির্বাচনকে এরদোয়ানের নীতির অনুমোদনের পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন। এই নির্বাচনেরই এক জনসভায় এরদোয়ান ক্রাইস্টচার্চের হামকারীর কথা তুলে ধরে তুরস্কের ‘শক্তি’ জাহির করেন। তিনি বলেন যে, যদি অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের কেউ তুরস্কের সাথে বিবাদে জড়াতে চায়, তাহলে তাদের পূর্বপুরুষদের মতো তাদেরকে কফিনে করে ফেরত পাঠানো হবে। এরদোয়ান শতবর্ষ আগের গ্যালিপোলি যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন, যেখানে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের সেনারা যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু এত বছর পর গ্যালিপোলির কথা মনে করিয়ে এরদোয়ান কি পেতে চাইছেন?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝে ১৯১৫ সালের ২৫শে এপ্রিল তুরস্কের বসফরাস প্রণালীর কাছে কানাক্কালে বা গ্যালিপোলিতে ব্রিটিশ-ফরাসী মিত্রবাহিনীর প্রায় ৫ লাখের মতো সেনা অবতরণ করেছিল। সেসময় বর্তমান তুরস্কের জন্ম হয়নি; ইস্তাম্বুলে আসীন ছিলেন উসমানি খলিফা, যাকে মুসলিম দুনিয়ার নেতা হিসেবে দেখতো বিশ্ব। মিত্রপক্ষের অনেকেই বলেছিল যে, গ্যালিপোলিতে অবতরণ ছিল সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত বাজে সিদ্ধান্ত। শেষ পর্যন্ত সেই বছরের শেষেই মিত্র বাহিনী সেখান থেকে তাদের সৈন্য সরিয়ে নেয়। যুদ্ধে মিত্রপক্ষের ৫৬ হাজারের বেশি সেনা নিহত হয়; যাদের মাঝে ৮ হাজার ৭’শ ৯ জন ছিল অস্ট্রেলীয় এবং ২ হাজার ৭’শ ২১ জন ছিল নিউজিল্যান্ডের। এই ২৫শে এপ্রিলকেই দুই দেশ ‘এনজাক ডে’ হিসেবে প্রতিবছর পালন করে থাকে।

তবে এখানে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, যেহেতু এই দুই দেশের সেনাদের কবর রয়েছে গ্যালিপোলিতে, তাই তাদের অনেকেই গ্যালিপোলিতে গিয়ে এই দিনটা উদযাপন করে থাকেন। তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড থেকে আসা পর্যটকদের কাছ থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলার আয় করে থাকে। গ্যালিপোলিতে বিশেষভাবে পর্যটন কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যার একটা গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট এই দুই দেশের পর্যটকরা।



যথারীতি, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন দু'দিনের মাথায় কঠোর ভাষায় এরদোয়ানের সমালোচনা করেন, এবং একইসাথে তিনি এই হুমকিও দেন যে, অস্ট্রেলীয় জনগণের ‘এনজাক ডে’ উপলক্ষে তুরস্ক যাবার ক্ষেত্রে তিনি ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে বাধা সৃষ্টি করতে পারেন। মরিসনের এমন কথার পর এরদোয়ানের উপদেষ্টা ফাহরেত্তিন আলতুন এক বার্তায় বলেন, এরদোয়ানের কথাগুলি অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডকে টার্গেট করে বলা হয়নি, বরং বলা হয়েছে ক্রাইস্টচার্চের খুনির লেখা ম্যানিফেস্টোকে টার্গেট করে। একইসাথে আলতুন এ-ও বলেন যে, ‘এনজাক ডে-তে তুরস্কের জনগণ অস্ট্রেলিয়ার জনগণকে সর্বদাই সাদর আমন্ত্রণ জানায়।

পরিষ্কারই বোঝা যায় যে, আলতুন এক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন এড়ানোর চেষ্টা করছেন। ওআইসি-র এক জরুরি বৈঠকেও তুর্কী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু একই ধরনের কথা বলেন। একই সময়ে নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স-ও দ্রুত উড়ে যান এরদোয়ানের সাথে দেখা করতে। এরদোয়ান পিটার্সকে বলেন, ‘এনজাক ডে-তে নিউজিল্যান্ডের পর্যটকদের নিরাপত্তায় কোনো সমস্যা হবে না। সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে পিটার্স বলেন, এরদোয়ান সেই একই হুঙ্কার আবারও দেবেন কিনা, তা নিয়ে দু’জনের মাঝে কোনো কথা হয়নি। এই কথাগুলি বলার কয়েক ঘন্টার মাঝেই এরদোয়ান আরেক নির্বাচনী র্যা লিতে ব্রেনটন টারান্টের বীভৎস ভিডিও দেখান এবং কথা বলেন। এবারেও সাংবাদিকেরা পিটার্সকে ধরলে তিনি এ ব্যাপারে কথা বলেননি। মাত্র দু’মাস পরে অস্ট্রেলিয়াতেও নির্বাচন। তাই স্কট মরিসনও হিসেব করেই কথা বলছেন।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি মর্নিং হেরাল্ড এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরদোয়ান এই কথাগুলির মাঝদিয়ে নির্বাচনে কিছু পয়েন্ট বাড়াতে চাইছেন মাত্র। কারণ তিনি এবং তার সরকারের অন্য সদস্যরা রাষ্ট্রীয় আলাপে ঠিকই ‘এনজাক ডে’ পালনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। যদিও এরদোয়ানের কথাগুলি মুসলিম বিশ্বে জনগণের মাঝে আলোড়ন তৈরি করতে পারে, তথাপি কথাগুলির সারশূণ্য প্রকৃতি সেদিকেই ইঙ্গিত করে। মিলিয়ন ডলারের পর্যটন আয় বাদ দিয়ে তিনি আসলে কাউকেই কফিনে ভরার পক্ষপাতি নন। আর গ্যালিপোলি দিবস পালনে অস্ট্রেলীয়দের আমন্ত্রণ জানানোর মাঝে ইসলামের পক্ষে শক্ত অবস্থানের কোনো কথাই নেই। গ্যালিপোলি যুদ্ধ ছিল উসমানি খলিফার বিরুদ্ধে। আর পরবর্তীতে গ্যালিপোলিতে জয়লাভ করা তুর্কীরাই খলিফাকে সরিয়ে দিয়ে সেক্যুলার তুরস্ক প্রতিষ্ঠা করে।

তুরস্কের হুরিয়েত ডেইলি নিউজ এর এক লেখায় বরা বায়রাকতার বলছেন, গ্যালিপোলিতে দুই পক্ষে যারা যুদ্ধ করেছিল, তারা তো পরবর্তীতে নিজেদেরকে বন্ধু হিসেবে আলিঙ্গন করেছিল। গ্যালিপোলিতে হিরো বনে যাওয়া ‘ইয়াং টার্কস’ জাতীয়তাবাদীরাই ইসলামী শাসন সরিয়ে পশ্চিমা ধাঁচের সেক্যুলার শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। গ্যালিপোলিতে খোদাই করে লেখা রয়েছে সেক্যুলার তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মুস্তফা কেমাল আতাতুর্কের কিছু কথা। কেমাল বলছেন, এখানে (গ্যালিপোলিতে) যেই বিদেশি সেনারা শায়িত রয়েছে, তারা একটা বন্ধু দেশের মাটিতে শায়িত রয়েছে। এখানে যুদ্ধ করা খ্রিষ্টান এবং মুসলিম সেনাদের মাঝে কোনো পার্থক্য তিনি করেন না। দূর দেশের যে মহিলারা তাদের সন্তানদের গ্যালিপোলিতে পাঠিয়েছিলেন, তারা এখন নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন যে, এই সেনারা এখন কেমালের কোলে রয়েছে এবং শান্তিতে রয়েছে।

কথাগুলি মনে করিয়ে দিচ্ছে, উসমানি শাসনের সময় আক্রমণকারী বিদেশি সেনাদের কেমাল আলিঙ্গন করেই নিয়েছিলেন। গ্যালিপোলি যুদ্ধই কেমালকে ক্ষমতা দখলের প্ল্যাটফর্ম দিয়েছিল; আর কেমালের অধীনেই তুরস্ক পশ্চিমের সাথে শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ হবার চেষ্টা করে। কেমালের আদর্শের উপরেই যখন তুরস্ক দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে এরদোয়ানের কথাগুলি কতটা মানানসই, তা নিয়ে প্রশ্ন করছেন বায়রাকতার। তিনি তার লেখায় বলছেন, ক্রাইস্টচার্চের হামলাকারী শুধু মুসলিমদেরই মারতে চায়নি, সে চেয়েছিল গ্যালিপোলির আদর্শটাকেও মেরে ফেলতে। কেমাল এবং অস্ট্রেলীয়রা উভয়েই গ্যালিপোলির সেক্যুলার আদর্শকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু এরদোয়ান কেন ব্যাপারটাকে অন্যদিকে নিচ্ছেন? বিশ্লেষকেরা বলছেন, এরদোয়ান বুঝতে পারছেন যে, কেমালের আদর্শের চাইতে ইসলামের প্রতি আবেগটাই তুরস্কের মানুষের কাছে এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। গ্যালিপোলির সেক্যুলার আদর্শ নয়, বরং গ্যালিপোলিতে উসমানি শাসনের অবসানে সকল সেক্যুলারদের এক পক্ষে থাকার ব্যাপারটাই এখন বেশি আলোচ্য বিষয়। এরদোয়ানও তাই নির্বাচন জয়লাভের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সেটাকেই ব্যবহার করছেন।

লেখক: ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: আরও পড়ুন

আরও