কৃষ্ণ সাগরে জর্জিয়ার সমুদ্রবন্দর নিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

কৃষ্ণ সাগরে জর্জিয়ার সমুদ্রবন্দর নিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা

আহমেদ শরীফ ৪:৩৭ অপরাহ্ণ, মার্চ ২১, ২০১৯

কৃষ্ণ সাগরে জর্জিয়ার সমুদ্রবন্দর নিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে জর্জিয়ার আনাকলিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সময় জর্জিয়ার প্রধানমন্ত্রী গিওর্গি কুইরিকাশভিলি বলেন, এখানেই ইউরোপ এবং এশিয়ার মিলনস্থল। এর মাধ্যমে ‘নতুন জর্জিয়া’র ভিত্তি স্থাপিত হলো। ‘জর্জিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, কৃষ্ণ সাগরের উপরে অবস্থিত জর্জিয়ার সবগুলি সমুদ্রবন্দরেরই উন্নয়ন করা হচ্ছে, যা কিনা আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হতে চলেছে। জর্জিয়ার বন্দরগুলি ককেশাস এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলির জন্যে ট্রানজিট সুবিধা দেবার জন্যে তৈরি করা হচ্ছে। ‘ইউরোপিয়ান ব্যাঙ্ক ফর রিকনস্ট্রাকশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট’এর ডিরেক্টর ব্রুনো বালভানেরা বলছেন, চীনের সাথে ইউরোপের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এই বন্দরগুলি হবে গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রকল্পগুলি জর্জিয়াকে ইউরোপ, চীন এবং এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলির আরও কাছাকাছি আনবে, যা কিনা কৌশলগত দিক থেকে অত্র অঞ্চলের হিসেব-নিকেশ পালটে দিতে পারে। আনাকলিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রকল্পটার দেখাশুনা করছে আনাকলিয়া ডেভেলপমেন্ট কনসোরশিয়াম (এডিসি) , যা কিনা জর্জিয়ার টিবিসি হোল্ডিং-এর সাথে মার্কিন কোম্পানি কন্টি ইন্টারন্যাশনালের জয়েন্ট ভেঞ্চার। এডিসি-র প্রধান নির্বাহী লেভান আখুলেদিয়ানি বলছেন, এর আগে এখানে গভীর সমুদ্রবন্দর করার অনেক প্রকল্প নেয়া হলেও ২০১৬ সালে এডিসি-র প্রকল্প নেবার আগে কোনটাই সফলতার মুখ দেখেনি। আড়াই বিলিয়ন ডলার এখানে বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। তারা আশা করছেন যে, ২০২১ সাল নাগাদ আনাকলিয়া বন্দরটা ১০ হাজার টিইউএস কন্টেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ হ্যান্ডলিং-এ সক্ষম হবে। বর্তমানে জর্জিয়ার কোন বন্দরই দেড় হাজার টিইউএস ধারণক্ষমতার চাইতে বড় কন্টেইনার জাহাজ হ্যান্ডলিং-এ সক্ষম নয়। এই বন্দরের অপারেটর হতে যাচ্ছে মার্কিন কোম্পানি এসএসএ ম্যারিন। একইসাথে এই বন্দরের সাথে দেশের ভেতরের এবং ককেশাসের অন্য দেশগুলির যোগাযোগ ভালো করার লক্ষ্যে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার খরচে রাস্তা এবং রেল উন্নয়ন করা হচ্ছে। বন্দরকে কেন্দ্র করে ৪’শ হেক্টর জমিতে একটা স্পেশাল ইকনমিক জোনও তৈরি করা হবে।

গত জানুয়ারিতে ইউরোপিয়ান কমিশন এবং বিশ্বব্যাঙ্ক একত্রে জর্জিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে ব্যাপক বিনিয়োগের পরিকল্পনা প্রকাশ করে। ১৮টা অবকাঠামো প্রকল্পে মোট ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হবে। আনাকলিয়া বন্দরে করা হবে ২’শ ৬৪ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ। অন্যান্য প্রকল্পগুলি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আনাকলিয়ার সাথে সম্পর্কিত। জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক ডিইজি এবং ডাচ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কও আনাকলিয়াতে বিনিয়োগে রাজি হয়েছে। আনাকলিয়ার দক্ষিণে পটি শহরে একটা ‘মাল্টিমোডাল ট্রানজিট টার্মিনাল’ তৈরি করা হচ্ছে। কাজটা করছে ব্রিটিশ কোম্পানি ‘ওয়ান্ডারনেট এক্সপ্রেস’। ৬০ হাজার টন ধারণক্ষমতার কেমিক্যাল সার স্টোরও তৈরি করা হচ্ছে সেখানে। ইউরোপের মায়ের্স্ক গ্রুপের মালিকানায় থাকা কোম্পানি ‘এপিএম টার্মিনালস’ পটি সমুদ্রবন্দরের উন্নয়ন করার জন্যে প্রকল্প নিতে চাইছে। মার্কিন ‘ওভারসীজ প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন’ও পটি সমুদ্রবন্দরের উন্নয়নে ৫০ মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে।

জর্জিয়া চীনের ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’এর অংশ নয়; তথাপি চীনের কাছেও জর্জিয়ার গুরুত্ব বাড়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘গ্লোবাল রিস্ক ইনসাইটস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীন রাশিয়ার রেল নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ করার জন্যে যথেষ্ট আগ্রহ না দেখানোয় রাশিয়া কিছুটা নাখোশ হয়েছে। বর্তমানে রাশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপের সাথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রাশিয়ার রেল নেটওয়ার্ক খুবই শ্লথ গতির। একারণেই চীন চাইছে ককেশাস এবং কাসপিয়ান-এর মাধ্যমে রাশিয়ার রেল নেটওয়ার্কের কোন বিকল্প তৈরি করা যায় কিনা। জর্জিয়ার বন্দর প্রকল্পগুলিতে চীনারাও বিনিয়োগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

তবে জর্জিয়ার প্রকল্পগুলির সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে অত্র অঞ্চলের দেশগুলির সাথে জর্জিয়ার যোগাযোগ বৃদ্ধি। জর্জিয়ায় সবচাইতে বড় বিনিয়োগকারী হলো প্রতিবেশী দেশ আজেরবাইজান। তেল-গ্যাস সমৃদ্ধ আজেরবাইজানের তেল-গ্যাস রপ্তানির জন্যে জর্জিয়া গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট দেশ। এই খণিজ সম্পদ জর্জিয়ার ভূমির উপর দিয়ে বাটুমি, পটি, সুপসা এবং কুলেভি তেলের টার্মিনাল এবং কয়েকটা পাইপলাইনের মাধ্যমে তুরস্ক এবং ইউরোপ যায়। তেল-গ্যাসের এই রুট রাশিয়াকে বাইপাস করে বিধায় এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট। আজেরবাইজানের সাথে সম্পর্ক ভালো না থাকায় এই রুট একইসাথে আর্মেনিয়াকেও বাইপাস করে। অত্র অঞ্চলে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে রাশিয়া জর্জিয়ার ব্যাপারে পশ্চিমা দেশগুলিকে ছাড় দেয়নি। ১৯৯০ সালে জর্জিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আলাদা হবার পর থেকে রাশিয়ার সাথে জর্জিয়ার সম্পর্কের টানাপোড়েন চলেছে। আর ছোট দেশ হবার কারণে জর্জিয়াও তুরস্ক এবং পশ্চিমা শক্তিশালী দেশগুলির সহায়তা চেয়েছে। ২০০৮ সালে রাশিয়া জর্জিয়া আক্রমণ করে সাউথ অসেটিয়া এবং আবখাজিয়া প্রদেশ দখল করে নেয়। এর ফলে জর্জিয়ার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত তেল-গ্যাসের অবকাঠামো রাশিয়ার হুমকির মাঝে পড়ে যায়।

জর্জিয়ার বাণিজ্য রুটগুলি এখন মধ্য এশিয়ার দেশগুলিও ব্যবহার করতে চাইছে। ইতোমধ্যেই কাস্পিয়ান সাগরে তুর্কমেনিস্তানের বন্দর তুর্কমেনবাসির সাথে সমুদ্রপথে আজেরবাইজানের রাজধানী বাকুর যোগাযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামনের দিনগুলিতে এই রুটে মধ্য এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ খণিজ এবং কৃষি পণ্য পরিবহণ বৃদ্ধি পাবে। একইসাথে মধ্য এশিয়ার দেশগুলির জন্যে অন্য দেশ থেকে পণ্য আমদানিও সহজ হবে। জর্জিয়ার নতুন কনটেইনার টার্মিনালগুলি এই লক্ষ্যেই নির্মিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, জর্জিয়ার সমুদ্রবন্দরগুলি এবং এর উপর দিয়ে প্রবাহিত তেল-গ্যাসের পাইপলাইনগুলির গুরুত্ব যতই বাড়তে থাকবে, সেগুলির নিরাপত্তার প্রশ্নও ততই সামনে আসতে থাকবে। আর এক্ষেত্রে রাশিয়াই হবে এই অবকাঠামোর জন্যে সবচাইতে বড় হুমকি। অন্যদিকে রাশিয়াও অত্র অঞ্চলে পশ্চিমা প্রভাব বৃদ্ধিকে নিজের স্বার্থবিরোধী হিসেবে দেখে। তবে প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় জর্জিয়ার নিরাপত্তার জন্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুরস্কের। ২০১৭ সালের শেষে আজেরবাইজানের বাকু থেকে জর্জিয়ার রাজধানী তিবিলিসি হয়ে তুরস্কের কার্স পর্যন্ত রেললাইন উদ্বোধন করা হয়। ককেশাস এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সাথে তুরস্কের সম্পর্ক প্রাচীন। দেশগুলির সাথে তুরস্কের নিরাপত্তা সম্পর্কও সাম্প্রতিককালে গভীর হচ্ছে। জর্জিয়ার উপর দিয়ে প্রবাহিত কৌশলগত বাণিজ্য রুটগুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাশিয়া এবং তুরস্কের মাঝে প্রতিযোগিতা চলবে। একইসাথে জ্বালানি আমদানিকারক হিসেবে ইউরোপও চাইবে এই রুটগুলি রাশিয়ার হুমকি থেকে নিরাপদ থাকুক। সেই লক্ষ্যে ইউরোপ, বিশেষ করে ন্যাটো, কৃষ্ণ সাগরে তাদের জ্বালানি রুটের নিরাপত্তা দিতে সামরিক শক্তি দেখিয়ে যাবে। রাশিয়াও তার নিজের এলাকায় পশ্চিমা অনুপ্রবেশকে থামাতে গিয়ে ইউক্রেন, আজভ সাগর বা জর্জিয়ার মতো স্থানে বিবাদে জড়াবে।

লেখক: ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: আরও পড়ুন

আরও