আলজেরিয়ায় সরকার-বিরোধী আন্দোলনের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

ঢাকা, ২৬ মার্চ, ২০১৯ | 2 0 1

আলজেরিয়ায় সরকার-বিরোধী আন্দোলনের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

আহমেদ শরীফ ১:০৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৬, ২০১৯

আলজেরিয়ায় সরকার-বিরোধী আন্দোলনের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

২২শে ফেব্রুয়ারি থেকে আলজেরিয়ার রাস্তায় হাজারো মানুষের ঢল নেমেছে। পরপর পঞ্চমবারের মতো প্রেসিডেন্ট আব্দুলআজিজ বুতাফ্লিকা নির্বাচনে দাঁড়াতে চাইছেন। জনগণ বলছে যে, ৮২ বছর বয়স্ক বুতাফ্লিকা শুধু যে অতিরিক্ত সময় ধরে ক্ষমতায় থাকতে চাইছেন তা-ই নয়, তিনি রাষ্ট্র চালাবার জন্যে অযোগ্যও বটে। ১৯৯৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা এই প্রেসিডেন্ট ২০১৩ সালে স্ট্রোক-এ আক্রান্ত হন। পরের বছর নির্বাচনে তিনি একবারের জন্যেও জনসন্মুখে না আসলেও চতুর্থবারের মতো নির্বাচন জিতে যান। এবারে জনগণের চাপের মুখে ১১ই মার্চ বুতাফ্লিকা ঘোষণা দেন যে, তিনি পঞ্চম বারের মতো আর প্রেসিডেন্ট হতে চাইছেন না; তবে নির্বাচনের সময় তিনি কিছুটা পিছিয়ে দেবার কথা বলেছেন। রাজধানী আলজিয়ার্স-এর রাস্তায় মানুষ ব্যাপারটাকে বুতাফ্লিকার নতুন কোন ধোঁকাবাজি হিসেবে দেখলেও আলজেরিয়ার সমস্যা শুধু বুতাফ্লিকার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশটার সমস্যা অনেক গভীর এবং এর রয়েছে ব্যাপক ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব।

১৯৬২ সালে তিন লক্ষাধিক প্রাণের বিনিময়ে আলজেরিয়া ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা পায়। ১৯৫৬ সালে বুতাফ্লিকা ১৯ বছর বয়সে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেন, এবং হুয়ারি বুমেদিয়েন-এর অধীনে খুব অল্প বয়সেই ক্ষমতাবান হন। ১৯৬৩ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি দেশটার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন, এবং ১৯৬০-৭০-এর দশকে ‘জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলন’এর নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট বুমেদিয়েন-এর মৃত্যুর পর বুতাফ্লিকা তার প্রতিপত্তি হারান এবং পরবর্তীতে দেশ ছাড়েন। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দরপতনের পর ক্ষমতাসীনরা বহুদলীয় গণতন্ত্রের দিকে দেশকে নিয়ে যায়। সেই সুবাদে ‘ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট’ নামের এক ইসলামিক দলের আবির্ভাব হয়, যারা ১৯৯১ সালের নির্বাচনে প্রায় নিশ্চিতভাবেই পরিপূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছিল। সংবিধান পরিবর্তনের একটা ভয় তৈরি হওয়ায় সামরিক বাহিনী তৎক্ষণাৎ ক্ষমতা দখল করে নির্বাচন বাতিল করে। এর ফলশ্রুতিতে ১০ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যার কারণে কমপক্ষে দেড় লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বুতাফ্লিকার জীবনী নিয়ে এক আলোচনায় ‘আল-জাজিরা’ বলছে যে, ১৯৯৯ সালে বুতাফ্লিকা দেশের রাজনীতিতে ফিরে যুদ্ধ শেষ করেন এবং ৭৪ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সেসময় তেলের বাজার ভালো থাকায় বুতাফ্লিকা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সক্ষম হন। ২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় জনগণকে ব্যাপক প্রণোদনা দেবার মাধ্যমে সেদেশে আন্দোলন বেড়ে উঠতে দেননি বুতাফ্লিকা। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে তেলের বাজার আবারও পড়তে শুরু করলে দেশের অর্থনীতি আবারও বিপদে পড়ে।

আলজেরিয়ার অর্থনীতি পুরোপুরিভাবে তেল-গ্যাস রপ্তানির উপরে নির্ভরশীল। পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম তেলের রিজার্ভ এবং ১০ম বৃহত্তম গ্যাসের রিজার্ভ রয়েছে আলজেরিয়াতে। ইউরোপ-আমেরিকায় তেল-গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে সরকার যা আয় করে, সেই অর্থ দিয়ে সরকার জনগণের জন্যে বিভিন্ন সার্ভিসে ভর্তুকি দিয়ে থাকে। খাবার এবং ভোগ্যপণ্যের বেশিরভাগই আমদানি-নির্ভর। অর্থাৎ তেল রপ্তানির অর্থ দিয়েই আলজেরিয়া খাবার ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্য কিনে থাকে। ‘কার্নেগি মিডল-ইস্ট সেন্টার’এর বিশ্লেষক ডালিয়া গ্রানেম-ইয়াজবেক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা ব্রোকার’এ এক লেখায় বলেন যে, আলজেরিয়ার অর্থনীতি কোন দীর্ঘমেয়াদী শক্ত ভিতের উপরে প্রতিষ্ঠিত নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দরপতন হলেই দেশের মানুষের উপরে কষ্টের বোঝা নেমে আসে। ২০১৩ সালে দেশটার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২’শ বিলিয়ন ডলার, যখন তেলের বাজার ছিল চাঙ্গা। ‘আনাদোলু এজেন্সি’ বলছে যে, ২০১৮ সালের নভেম্বরে রিজার্ভ নেমে আসে ৮২ বিলিয়ন ডলারে। দেশটার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে যে, রিজার্ভ ২০১৯ সালে ৮০ বিলিয়ন এবং ২০২০ সালে ৭৬ বিলিয়নে নেমে আসবে। দীর্ঘকাল আমদানি-নির্ভর থাকার কারণে আলজেরিয়াতে শিল্পোন্নয়ন হয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। আর জিডিপি-র মাত্র ৮ শতাংশ কৃষির অবদান, যা কিনা দেশের খাদ্য উৎপাদনের জন্যে যথেষ্ট নয়। খাবারের ৪৫ শতাংশ আর ঔষধের ৬২ শতাংশ আমদানি করা হয়। আলজেরিয়ায় সরকার পরিবর্তিত হলেও দেশটা যে খুব সহজেই স্বাভাবিক হয়ে যাবে না, তা দেশটার ঠুনকো অর্থনৈতিক ভিতের দিকে তাকালেই বোঝা যায়।

শুধু তেল-গ্যাস নয়, আলজেরিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানও দেশটাকে অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভুমধ্যসাগরে ১২’শ কিঃমিঃ উপকূল থাকায় এবং একাধারে মরক্কো, মৌরিতানিয়া, মালি, নিজের, লিবিয়া ও তিউনিসিয়ার সাথে স্থলসীমান্ত থাকায় উত্তর আফ্রিকার ‘মাগরেব’ এবং পশ্চিম-মধ্য আফ্রিকার ‘সাহেল’ অঞ্চলের জন্যে আলজেরিয়া গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে আলজেরিয়ার জনসংখ্যাও সবচাইতে বড় – চার কোটি বিশ লাখ। দেশটার জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে, যা কিনা বিশাল কর্মক্ষম জনশক্তির উৎস। কিন্তু দেশটার বেকারত্ব এখন প্রায় ১২ শতাংশ; তরুণদের মাঝে যা হলো ২৫ শতাংশ।       

পার্শ্ববর্তী মরক্কো, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, মালি, মৌরিতানিয়া ও নিজের-এর স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে আলজেরিয়ার নিরাপত্তা সক্ষমতার উপরে। মালি, নিজের, লিবিয়া ও তিউনিসিয়ার জঙ্গী গোষ্ঠিগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে আলজেরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী। পাঁচ লক্ষ সেনা, ১২০টা যুদ্ধবিমান, ৩৪০টা হেলিকপ্টার নিয়ে আলজেরিয়ার সামরিক বাহিনী বেশ শক্তিশালী। তবে এই সামরিক বাহিনী ধরে রাখতে প্রতিবছর ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হচ্ছে দেশটাকে; বর্তমান অর্থনীতিতে যা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আফ্রিকা থেকে ইউরোপ-অভিমুখী শরণার্থীর মিছিল নিয়ন্ত্রণেও আলজেরিয়ার ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। মালি ও নিজের-এ সামরিক কর্মকান্ডে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র আলজেরিয়ার কাছ থেকে অনেক সহায়তা পাচ্ছে।

বুতাফ্লিকা সরে গেলেও আলজেরিয়ার সমস্যা যাচ্ছে না; কারণ বহুকাল দেশটা এক দলের অধীনে থাকায় বিকল্প কোন রাজনৈতিক দলই এখন নেই। আর নেতার পরিবর্তন অপেক্ষাকৃত সহজ হলেও দেশের অর্থনীতির ভিত পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ। ‘রেডিও ফ্রান্স ইন্টারনাসিওনাল’এর এক লেখায় আমান্ডা মরো বলছেন যে, দুর্বল অর্থনৈতিক ভিত যদি আলজেরিয়াকে অস্থিতিশীল করে ফেলে, তাহলে শুধু আফ্রিকা নয়, ইউরোপের নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হবে। তাই ইউরোপীয়রা, বিশেষ করে ফ্রান্স ও ইতালি, আলজেরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত। আলজেরিয়া সমস্যায় পড়লে ইউরোপ শুধু তেল-গ্যাস পাবার নিশ্চয়তা থেকেই বঞ্চিত হবে না, তাদের ভূমধ্যসাগরের উপকূলের নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হবে। আলজেরিয়ায় নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়, বরং দেশটাকে স্থিতিশীল রাখাটাই এখন ইউরোপের জন্যেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।    

 

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: আরও পড়ুন

আরও