মধ্য এশিয়ায় চীনের প্রভাব বিস্তারকে কিভাবে দেখছে রাশিয়া?

ঢাকা, শনিবার, ২৩ মার্চ ২০১৯ | ৯ চৈত্র ১৪২৫

মধ্য এশিয়ায় চীনের প্রভাব বিস্তারকে কিভাবে দেখছে রাশিয়া?

আহমেদ শরীফ ৬:১১ অপরাহ্ণ, মার্চ ১২, ২০১৯

মধ্য এশিয়ায় চীনের প্রভাব বিস্তারকে কিভাবে দেখছে রাশিয়া?

গত ফেব্রুয়ারিতে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্য এশিয়ার দেশ তাজিকিস্তানের সীমানায় গত তিন বছরে চীনা সামরিক উপস্থিতি বেড়েছে। সেখানকার সুউচ্চ পার্বত্য এলাকার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলি চীন নতুন করে নজরদারির মাঝে এনেছে। সেই এলাকায় বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলে, স্যাটেলাইটের ছবি এবং ভূপৃষ্ঠে তোলা বিভিন্ন ছবি বিশ্লেষণ করে এই উপসংহারই টানে পত্রিকাটি।

জায়গাটা তাজিকিস্তানে হলেও তা পাকিস্তান এবং আফগান সীমানার কৌশলগত ‘ওয়াখান করিডোর’এর ঠিক উত্তরে। চীনের এই সামরিক উপস্থিতি নিয়ে কোনো দেশের সরকারই এখন পর্যন্ত মুখ খুলতে রাজি হয়নি। সেখানে মোতায়েন করা চীনা ইউনিটগুলি এসেছে পার্শ্ববর্তী শিনজিয়াং বা উইঘুর প্রদেশ থেকে, যেখানে প্রায় ১০ লাখ মুসলিমকে আটক রেখেছে চীনা সরকার।

২০১৬ সালের কিছু রিপোর্টে ওয়াখান করিডোরে চীনা সৈন্য এবং সাঁজোয়া যানের আনাগোনার খবর ছবি সহকারে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে এই অঞ্চলে চীনা সামরিক টহলের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কথা বলেনি।

‘সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি’র এলি র্যাকটনার-এর মতে, এই অঞ্চলে চীনাদের সামরিক অবস্থান অবাক করা কিছু নয়; এবং এটা ওয়াশিংটনের চিন্তার বিষয়ও হবার কথা নয়। মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন যে, এই দূর্গম এলাকায় চীনা টহল অত্র অঞ্চলের নিরাপত্তা দেবে। কিন্তু মধ্য এশিয়াতে চীনের সামরিক অবস্থানকে রাশিয়া কিভাবে দেখছে?

মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে চীনারা বিপুল বিনিয়োগ করছে। সেখানে জ্বালানি এবং অবকাঠামো খাতে চীনারা সবচাইতে বেশি এগিয়ে এসেছে। চীনা ঋণ সেখানকার দেশগুলিকে চীনাদের উপরে নির্ভরশীল করে ফেলেছে। এই বিনিয়োগের সাথে সাথে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অত্র অঞ্চলে চীনের সামরিক উপস্থিতি ভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। ঊনিশ শতক থেকে রাশিয়া মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে প্রভাব বিস্তার করেছে। অর্থনৈতিক কারণে নয়, বরং তার দক্ষিণের সীমানার নিরাপত্তা দিতেই মস্কো এখানে তার অবস্থানকে সামরিক দিক থেকে সুসংহত করেছে। সোভিয়েত সময়ে এই অঞ্চল মস্কোর অধীনেই ছিল। এখন বেইজিং-এর অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার সেখানে মস্কোর প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে।

‘কার্নেগি মস্কো সেন্টার’এর আলেক্সান্ডার গাবুয়েভ বলছেন, ২০১৭-এর শেষের দিকে চীনের প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার’ বাছাইকৃত রুশ চিন্তাবিদদের বেইজিং-এ ডেকে নিয়ে আলোচনায় বসে। আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল যে, মধ্য এশিয়ায় চীনা নিরাপত্তা স্থাপনাগুলিকে রাশিয়া কিভাবে দেখবে; অথবা রাশিয়া কতটুকু কর্মকান্ডকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেবে।

ঐতিহাসিকভাবেই মধ্য এশিয়া এবং দূরপ্রাচ্যে রাশিয়া এবং চীন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ঊনবিংশ শতকে দূরপ্রাচ্যে রাশিয়ার সীমানার ব্যাপ্তি ঘটে চীনের সীমানা হ্রাসের বিনিময়ে। বিংশ শতকের দ্বিতীয় অংশে রাশিয়া এবং চীন কাছাকাছি আসে সমাজতন্ত্রের কারণে। তবে দুই কমিউনিস্ট দেশের মাঝে চীন রাশিয়ার তুলনায় সবদিক দিয়েই পিছিয়ে ছিল। চীন তার প্রায় সকল প্রযুক্তিই পেয়েছিল রাশিয়া থেকে। ১৯৬০-এর দশকে দুই দেশের মাঝে সংঘাত শুরু হলে চীনারা রুশ প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত হয়। চীনারা নিজেদের উপরে নির্ভরশীলতা বৃদ্ধিতে আগ্রহী হয় সেসময় থেকেই। ১৯৮০-এর দশক থেকে পশ্চিমারা চীনকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে থাকে।

১৯৯০-এর দশকের পর থেকে ব্যাপক বিদেশি বিনিয়োগ এবং পশ্চিমা বিশ্বের সাথে বাণিজ্যের প্রসারের সুবাদে চীনের শিল্প এবং অর্থনৈতিক বিপ্লব নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দেয়। রাশিয়ার সাথে দীর্ঘ শান্তিকালীন সময় অতিবাহিত হবার কারণে প্রথমবারের মতো চীন তার সামরিক শক্তিকে মধ্য এশিয়ার স্থলসীমানা রক্ষার বদলে সমুদ্রসীমা রক্ষায় নিয়োজিত করতে পারে। সমুদ্রে স্বার্থরক্ষা করতে গিয়েই চীন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য দেশের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।

তবে ঠিক একই কারণে চীন তার ভারত মহাসাগরের জ্বালানি সরবরাহ লাইনের নিরাপত্তার ব্যাপারে অনিশ্চয়তায় পড়ে। সমুদ্রশক্তিতে পশ্চিমা শক্তিগুলি এবং তাদের বন্ধুদের উপরে স্থান করে নিতে না পারার কারণে মধ্য এশিয়ার বিশাল স্থলভাগকে কাজে লাগিয়ে মধ্যযুগের ‘সিল্ক-রুট’এর মতো বিকল্প একটা পথ তৈরিতে উদ্যত হয় চীন। মধ্য এশিয়া থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি চীনের সমুদ্রতীরের শিল্পাঞ্চলগুলিতে পৌঁছে যাচ্ছে এখন। একইসাথে পাকিস্তানের মাঝ দিয়ে অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির মাধ্যমে চীন ভারতীয় নৌবাহিনীকে এড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পেতে চাইছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আর্কটিক মহাসমুদ্রে বরফ গলে যাবার কারণে রাশিয়ার আর্কটিকের ‘ইয়ামাল’ গ্যাসক্ষেত্র থেকেও চীন এখন তরলীকৃত গ্যাস পাওয়া শুরু করেছে। অর্থাৎ চীনের বিশাল শিল্প-ভিত্তিক অর্থনীতির ব্যাপক জ্বালানি চাহিদা মেটাতে একদিকে চীনারা যেমন প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরে পশ্চিমা ও তাদের বন্ধু দেশগুলির সাথে নৌ-প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে, ঠিক একই কারণে মধ্য এশিয়া এবং আর্কটিকের সম্পদ আহরণে রাশিয়ার সাথে তার সখ্যতা বাড়িয়েছে।

চীনাদের কাছে মধ্য এশিয়ার জ্বালানি রুটের নিরাপত্তা এখন অতি গুরুত্বপূর্ণ। এই রুটের উপরে অবস্থিত বেশিরভাগটাই মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চল। চীনের মধ্য-এশিয়ার প্রদেশ শিনজিয়াং বা উইঘুরে চীনা সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকল্পে মুসলিম জনগোষ্ঠির উপর জোরজবরদস্তির খবর এখন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই খবরগুলি মধ্য এশিয়ার অন্যান্য মুসলিম এলাকার মানুষদেরকে যেমন চীন-বিরোধী করে তুলছে, তেমনি রাশিয়ার দক্ষিণ সীমানার নিরাপত্তাহীনতাকেও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

মধ্য এশিয়ার কাজাখস্থান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্থান, তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান ছাড়াও পাকিস্তান ও ককেশাসের মুসলিম অঞ্চলগুলির জনমত এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ২০১৬ সালে জিহাদি গ্রুপগুলি কিরগিজস্তানে চীনা দূতাবাসে আত্মঘাতী হামলা করে, যা কিনা মধ্য এশিয়াতে চীনাদের নিরাপত্তা স্থাপনা তৈরিতে অনুপ্রাণিত করেছে।

থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘গ্লোবাল রিস্ক ইনসাইটস’এর এক লেখায় ইউএস আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের পল ওয়াসারম্যান এবং সুফান গ্রুপের ইন্টেলিজেন্স এনালিস্ট মলি সালজকোগ মধ্য এশিয়ায় রাশিয়া এবং চীনের একত্রে কাজ করার উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা বলছেন যে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মার্কিন প্রভাব কমাবার তাগিদই রুশ-চীনা বন্ধুত্বের কারণ। এক্ষেত্রে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদ’ দমনে দুই দেশ একত্রে কাজ করতে ইচ্ছুক হওয়াতেই তারা কাছাকাছি এসেছে। তবে দুই দেশের পররাষ্ট্র নীতির লক্ষ্য এক নয়। তাই ‘সন্ত্রাসবাদ’ দমনে দুই দেশের মাঝে পদ্ধতিগত পার্থক্য রয়েছে। আর এই পার্থক্যের কারণেই মধ্য এশিয়াতে দুই দেশের ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য একত্রে মিলিত হচ্ছে না। কাজেই স্বল্পমেয়াদে রাশিয়া এবং চীন মধ্য এশিয়াতে একত্রে কাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদে তারা মধ্য এশিয়াতে একে অপরের প্রভাবকে কমাবার চেষ্টাই করবে।

লেখক: ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক