উইঘুর নিয়ে তুরস্ক-চীন বিরোধ কোন দিকে যাচ্ছে?

ঢাকা, শনিবার, ২৩ মার্চ ২০১৯ | ৯ চৈত্র ১৪২৫

উইঘুর নিয়ে তুরস্ক-চীন বিরোধ কোন দিকে যাচ্ছে?

আহমেদ শরীফ ৮:৪৪ অপরাহ্ণ, মার্চ ১০, ২০১৯

উইঘুর নিয়ে তুরস্ক-চীন বিরোধ কোন দিকে যাচ্ছে?

চীনা সরকারি মাধ্যমে আব্দুরহিম হেইইত-এর নামে প্রচারিত ভিডিও

গত ৯ই ফেব্রুয়ারি তুরস্কের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে চীনের পশ্চিমের উইঘুর বা শিনজিয়াং প্রদেশের মুসলিমদের আটক রাখার বন্দী শিবিরগুলিকে বন্ধ করে দেবার অনুরোধ জানানো হয়। তুরস্ক কিছু মিডিয়ার বরাত দিয়ে বলে যে, উইঘুরের বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী আব্দুরহিম হেইইত চীনা সরকারের অধীনে আটক থাকা অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আব্দুরহিম হেইইত খুব সম্ভবতঃ আট বছরের কারাদণ্ডাদেশ ভোগ করছেন।

বিভিন্ন মিডিয়ার সংবাদে বলা হচ্ছে, উইঘুর-এ প্রায় দশ লাখ মুসলিমকে বন্দীশিবির বানিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র হামি আকসয়-এর এক বিবৃতিতে বলা হয়, এটা এখন আর কারুর অজানা নয় যে চীনা সরকার যত্রতত্র মুসলিম জনগণকে গ্রেপ্তার করে সেই বন্দীশিবিরগুলিতে চালান দিচ্ছে; তাদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে এবং তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে ‘মগজ-ধোলাই’ করা হচ্ছে। আর যাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি, তারাও প্রচণ্ড চাপের মাঝে রয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, একুশ শতকে পরিকল্পনামাফিক উইঘুর মুসলিমদের বন্দীশিবিরে চালান করার যে প্রক্রিয়া চীনা সরকার নিয়ে এসেছে, তা মানবজাতির জন্যে অবমাননাকর।

শিনজিয়াং-এ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারগুলি তুরস্কের জনগণের যথেষ্ট নাড়া দিয়েছে। উইঘুর নিয়ে তুরস্ক সরকারের এই বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্ককে কতটা প্রভাবিত করবে? আর ভূরাজনৈতিক দিক থেকেই বা এর গুরুত্ব কতটুকু?  

উইঘুরের ব্যাপারে মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলি মূলতঃ অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষার জন্যে চীনা সরকারের সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকছে। অনেক মুসলিম দেশেই চীনারা সবচাইতে বড় বিনিয়োগকারী। এ অবস্থায় চীনা সরকারের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে চাইছে না কেউ। তুরস্কের বিবৃতির প্রতিবাদে চীনের পররাষ্ট্র দপ্তর আঙ্কারায় তুরস্কের দূতাবাসের মাধ্যমে পেশ করা এক প্রতিবাদলিপিতে তুরস্কের অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে আখ্যা দেয়। সেখানে বলা হয় যে, তুরস্ক এবং চীন উভয়েই সন্ত্রাসবাদ দমনের চেষ্টা করছে। চীন এব্যাপারে ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ অনুসরণ করার বিরোধী। চীন চাইছে সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে তুরস্ক চীনের দৃষ্টিভঙ্গির সঠিক মূল্যায়ন করবে। বেইজিং-এর বক্তব্য অনুযায়ী উইঘুরের ক্যাম্পগুলি হলো ‘ভকেশনাল এডুকেশন সেন্টার’, যেখানে মানুষকে সন্ত্রাসবাদ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।   

আব্দুরহিম হেইইত-এর মৃত্যুর খবর প্রচার হবার পর মানবাধিকার সংস্থা ‘এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ও বিবৃতি দিয়েছে। হেইইত উইঘুরের ‘দুতার’ নামক এক সঙ্গীতযন্ত্রের বাদক; সেই সুবাদে তিনি পুরো চীন জুড়েই সমাদৃত একজন ব্যক্তি। ‘বিবিসি’র মতে, তার কিছু সঙ্গীতের ব্যাপারেই চীনা সরকার হয়তো নাখোশ হয়ে তাকে সন্ত্রাসী মনে করেছে। যেমন তার একটা গানের মাঝে “যুদ্ধে শহীদ” কথাটি রয়েছে। ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, তার একটা গানের নাম “নাছোড়বান্দা অতিথি”, যাতে কিনা উইঘুরে চীনা সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। আবার “বিবেকের জিজ্ঞাসা” নামক গানের মাঝে রয়েছে, “যখন আমার বিবেক আমাকে জিজ্ঞেস করছে যে তুমি কিসের জন্যে বেঁচে আছো, তখন আমি উত্তর দেবো – আমার জনগণের জন্যে; আমার জন্মভূমির জন্যে”।

তুরস্কের অভিযোগের দু’দিনের মাথায় চীনের সরকারি মিডিয়া ‘চায়না রেডিও ইন্টারন্যাশনাল’এর তুর্কী ভাষার সার্ভিস ২৫ সেকেন্ডের একটা ভিডিও প্রকাশ করে। ভিডিওতে আব্দুরহিম হেইইত-এর মতো একজন ব্যক্তিকে দেখা যায়। তিনি বলছেন যে তিনি ১০ই ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে এই বার্তা দিচ্ছেন যে, তিনি বেঁচে আছেন এবং সুস্থ্য আছেন; তাঁর উপরে কোন অত্যাচার হয়নি। ভিডিওতে তিনি বলছেন যে, নিয়ম ভঙ্গের জন্যে চীনা সরকার তাঁর ব্যাপারে তদন্ত করছে। এই ভিডিও যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে এটা হলো দুই বছরের মাঝে হেইইত-এর প্রথম জনসম্যক্ষে আসা। তাঁর প্রাক্তন সহকর্মীদের মতে, খুব সম্ভবতঃ ২০১৭ সালের এপ্রিলে চীনা সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীনের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সাথে জড়িত কোন ব্যক্তির বিষয়ে অন্য দেশের সমালোচনার জবাব চীনা সরকার সাধারণতঃ দেয় না। চীন এক্ষেত্রে নিজেদের নিয়মের ব্যতিক্রম করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী এলিস এন্ডারসন মন্তব্য করেন যে, জনমতের চাপে চীনকে উত্তর দিতে বাধ্য করা সম্ভব। এই ভিডিও যতটা না উত্তর দিচ্ছে, তার চাইতে বেশি প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে; কারণ সরকারি টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে জোরপূর্বক জবানবন্দি আদায় করাটা চীনে নতুন কিছু নয়। এর আগে যেখানে বলা হয়েছিল যে, হেইইত কারাদন্ডাদেশ ভোগ করছেন, সেখানে এবারের ভিডিওতে তিনি বলছেন যে, তার ব্যাপারে ‘তদন্ত’ করছে চীনা সরকার। অথত বহুদিন ধরেই তাঁর কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। চীনা পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র হুয়া চুনইং বলেন যে, জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার জন্যে হেইইত-এর ব্যাপারে ‘তদন্ত’ চলছে।

চীনা মিডিয়াতে হেইইত-এর ভিডিও প্রচারের পর ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন করা হচ্ছে যে, তুর্কী প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান বড় কোন কৌশলগত ভুল করলেন কিনা। কারণ এর আগেই এরদোগানের সমালোচকেরা বলেছেন যে, বিশ্বের মুসলিমদের নেতৃত্ব দেবার যে ইচ্ছে এরদোগান এতকাল দেখিয়েছেন, উইঘুরের ব্যাপারে বহুকাল চুপ থেকে সেই নেতৃত্বই এরদোগান পায়ে ঠেলেছেন। উইঘুরের ব্যাপারে তুরস্কের জনগণের মাঝে অসন্তোষই হয়তো হেইইত-এর ব্যাপারে তুরস্ককে বিবৃতি দিতে বাধ্য করেছে। তবে তুরস্কের বিবৃতির দশ দিনের মাথায় সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন-সালমান চীন সফরের সময় চীনা সরকারের উইঘুর নীতির পক্ষে কথা বলে এরদোগানের সুবিধা করে দেন। অন্যদিকে চীন যদিও বলছে যে, এই ভিডিও প্রমাণ করে যে তুরস্কের সরকার মিথ্যে অভিযোগ করেছে, তথাপি এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে চীন তুরস্ককে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে। এটা চীনের অজানা নয় যে, মধ্য এশিয়ায় অর্থনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তার করাটা চীনের জন্যে অপেক্ষাকৃত সহজ হলেও অত্র অঞ্চলের তুর্কী মুসলিমদের নেতৃত্ব নেয়া চীনের পক্ষে মোটেই সহজ নয়। উপরন্তু, চীনা সরকারের উইঘুর নীতি মুসলিমদের মাঝে চীনাদের ব্যাপারে সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

লেখক: ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক