পূর্ব আফ্রিকায় সমুদ্র সম্পদ নিয়ে ভূরাজনৈতিক খেলা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯ | ১২ বৈশাখ ১৪২৬

পূর্ব আফ্রিকায় সমুদ্র সম্পদ নিয়ে ভূরাজনৈতিক খেলা

আহমেদ শরীফ ১:১৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ০৭, ২০১৯

পূর্ব আফ্রিকায় সমুদ্র সম্পদ নিয়ে ভূরাজনৈতিক খেলা

কেনিয়া কোস্ট গার্ডের জন্যে বাংলাদেশে নির্মিত যুদ্ধজাহাজ ‘ডোরিয়া’

গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি পূর্ব আফ্রিকার দেশ কেনিয়া তার উত্তরের প্রতিবেশী দেশ সোমালিয়ার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। কেনিয়া সরকারের বক্তব্য হলো, ভৌগোলিকভাবে কেনিয়ার অংশ, এমন কিছু অঞ্চল বিদেশী তেল-গ্যাস কোম্পানির কাছে বিক্রি করছে সোমালি সরকার। কেনিয়ার মিডিয়ার ভাষ্যমতে, ৭ই ফেব্রুয়ারি সোমালিয়ার সরকার লন্ডনে একটা অনুষ্ঠান আয়োজন করে, যেখানে সোমালিয়ার উপকূলে তেল-গ্যাস আহরণের উদ্দেশ্যে ব্লক ইজারা দেবার জন্যে আলোচনা চলে। এই আলোচনায় এমন কিছু সমুদ্রাঞ্চল স্থান পায়, যা কিনা ভৌগোলিকভাবে কেনিয়ার অংশ।

কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পরদিন কেনিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি মাচারিয়া কামাসু সংবাদ সন্মেলন করে ঘোষণা দেন যে, সোমালিয়া সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত কেনিয়ার তিন দফা দাবি মেনে না নেবে, ততক্ষণ কেনিয়ার সাথে সোমালিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নই থাকবে। এই তিন দফার প্রথম দফা হলো, সোমালিয়া আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের সমুদ্রসীমার যে মানচিত্র দেখাচ্ছে, তা দেখানো বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়তঃ, সোমালিয়া যেসব কোম্পানিকে তেল-গ্যাস আহরণের জন্যে ডেকেছিল, তাদেরকে আবারও ডেকে বলে দিতে হবে যে, সমুদ্রের ওই জায়গা সোমালিয়ার মালিকানায় নেই। তৃতীয়তঃ, কেনিয়া চাইছে যে, দুই দেশের মাঝে সমুদ্রসীমা নিয়ে যে বিরোধ রয়েছে, তা সমাধানে আন্তর্জাতিক আদালতে না গিয়ে দ্বিপাক্ষিকভাবে সমাধান করা।

কেনিয়ার জবাবে ওই একই দিন সোমালিয়া সরকারের এক লিখিত বিবৃতিতে বলা হয় যে, সমুদ্রে কোনো ব্লকই সোমালিয়া কাউকে দেয়নি, বা দেবার পরিকল্পনাও করেনি। সোমালিয়া সরকার অপেক্ষা করছে আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্তের উপর। সেই সিদ্ধান্তের পরই সোমালিয়ার সরকার এ ব্যাপারে চিন্তা করবে।

২০১৯ সালের কোনো এক সময় আন্তর্জাতিক আদালতে সোমালিয়া-কেনিয়ার সমুদ্রসীমার রায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশ দুটো  সম্পদের দিক থেকে বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে না হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। তাই এদের মাঝে কূটনৈতিক সঙ্কট গভীর অর্থ বহন করে।

লন্ডনে সোমালি সরকারের অনুষ্ঠানের পর সোমালিয়ার পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী আব্দিরাশিদ মোহামেদ আহমেদ বলেন, লন্ডনে সোমালিয়ার উপকূলে ‘টু-ডি’ সার্ভের ফলাফল উপস্থাপন করা হয়েছিল মাত্র। এখানে কোনো সমুদ্রের ব্লকের জন্যে কোনো লাইসেন্স বা অকশন হয়নি। অনুষ্ঠানটির আয়োজক ছিল ‘স্পেকট্রাম’ নামের একটা সংস্থা, যাদের কাজ হচ্ছে ভৌগোলিক সার্ভের উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করা। তবে এর আগে ২০১৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে সোমালি সরকার ঘোষণা দেয় যে, শিগগিরই সোমালিয়ার দক্ষিণে কেনিয়ার কাছাকাছি ২’শ ৬ খানা ব্লকের অকশন ডাকা হবে।

তবে বর্তমানে অকশন ডাকা হোক বা না হোক, কেনিয়ার ‘দ্য স্ট্যানডার্ড’ পত্রিকা জানাচ্ছে, সোমালিয়াতে কেনিয়ার রাষ্ট্রদূত অবসরপ্রাপ্ত লেঃ জেনারেল লুকাস টুম্বো দেশে ফেরত এসেছেন; আর কেনিয়াতে সোমালি রাষ্ট্রদূত মোহামেদ নূর-ও দেশে ফেরত গিয়েছেন।

কেনিয়ার মন্ত্রী মাচিরা কামাসুকে সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেন যে, সোমালিয়ার অভ্যন্তরে আল-শাবাব সদস্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার লক্ষ্যে কেনিয়া সরকার যে সেনাবাহিনী পাঠিয়েছে, তারা কি সোমালিয়াতেই অবস্থান করবে কিনা। মন্ত্রী বলেন যে, সোমালিয়াতে অবস্থানরত সেনারা আফ্রিকান ইউনিয়নের অধীনে রয়েছে; কাজেই সেনা প্রত্যাহারের কোনো সিদ্ধান্ত এখনই আসছে না। তবে খোদ সোমালিয়া থেকেই অন্য সুরের কথাও আসছে। সোমালিয়ার বিরোধী দলীয় নেতা ইলিয়াস আলী হাসান বলেন, দুই দেশের এই সমস্যা তেমন কোনো ইস্যু তৈরি করবে না। সরকার লন্ডনে তেল-গ্যাসের ব্লক অকশন করার আগে পার্লামেন্টের অনুমতি চায়নি।

কেনিয়ার ‘ইউনাইটেড স্টেটস ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’র ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর মাচারিয়া মুনেনে বলছেন, সোমালিয়া-কেনিয়ার বর্তমান কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের পেছনে রয়েছে ইউরোপিয়ান প্রভাব। তার মতে, সোমালিয়ার উপকূলে ইউরোপিয়রা তেল-গ্যাসের ব্লকের ইজারা পেতেই এই কাজ করছে।

সমুদ্রে আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব উভয় দেশের জন্যেই নতুন। বিশ্বের অতি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের একটা গিয়েছে সোমালিয়ার উত্তরে বাব-এল মান্ডেব প্রণালীর মাঝ দিয়ে। সমুদ্রপথে এশিয়া-ইউরোপের মাঝে যোগসূত্রই এটি। এত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের পাশে থেকে সোমালিয়া এবং কেনিয়া উভয় দেশই স্থলভাগ নিয়ে ব্যস্ত ছিল এতকাল। এখন সমুদ্রভাগে সম্পদ আহরণের হাতছানি দেশ দুটোকে সমুদ্র নিয়ে চিন্তায় ফেলেছে।

প্রফেসর মুনেনে-এর মতে, কেনিয়ার উচিত তার সমুদ্র সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিজেদের নৌ-শক্তি বৃদ্ধি করা। প্রফেসর মুনেনে-এর চিন্তা ইতোমধ্যেই কেনিয়ার সামরিক বাহিনীর উন্নয়ন প্রকল্পগুলির মাঝে প্রতিফলিত।

২০১২ সালে কেনিয়ার সামরিক বাহিনী দক্ষিণ সোমালিয়ার কিসমায়ু শহরে বড় ধরনের সামরিক অপারেশন চালায়। কেনিয়া নৌবাহিনীর পাঁচটা যুদ্ধজাহাজ সেখানে উভচর অপারেশনে অংশ নেয়, যা কিনা ইতিহাসে প্রথম উদাহরণ ছিল। বাজেট সঙ্কুলানের সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কেনিয়া সরকার তার নৌবাহিনীর জন্যে কয়েকটা জাহাজ যোগাড় করে, যার ফলশ্রুতিতে পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে কেনিয়া সবচাইতে শক্তিশালী নৌবাহিনী হিসেবে অবির্ভূত হয়। ‘জাসিরি’ নামের ৮৫ মিটার লম্বা একটা জাহাজ কেনিয়া ২০১২ সালে স্পেন থেকে যোগাড় করে, যা কিনা পূর্ব আফ্রিকার সবচাইতে বড় যুদ্ধজাহাজ। ফরাসী নৌবাহিনীর একটা জাহাজ পায় কেনিয়া; একইসাথে আরও চারটা জাহাজ হল্যান্ড ও ইতালিতে মেরামত করিয়ে কার্যক্ষম করে তোলে তারা।

২০১৮ সালের নভেম্বরে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনইয়াট্টা নতুন কোস্ট গার্ড বাহিনী উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডে নির্মিত একটা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাহিনীর অন্তর্গত করা হয়।

সোমালিয়ার জলদস্যুদের টার্গেট করে কেনিয়ার এই নৌবাহিনী তৈরি করা হলেও সেটা এখন আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারেই ব্যবহার করা হতে পারে।

প্রফেসর মুনেনে-এর মতে, কেনিয়ার উচিত দেশটার দক্ষিণে তৃতীয় একটা নৌঘাঁটি তৈরি করা। কিন্তু যে ব্যাপারটা তিনি এড়িয়ে গেছেন তা হলো, কেনিয়ার দক্ষিণের প্রতিবেশী দেশ তাঞ্জানিয়া কেনিয়ার নৌ-শক্তি বৃদ্ধিকে কিভাবে দেখবে? কেনিয়ার সাথে তাঞ্জানিয়ার আঞ্চলিক প্রতিযোগিতাও কিন্তু নতুন নয়। ২০১৫ সালে তাঞ্জানিয়া সরকার চীন থেকে দু’টা শক্তিশালী গানবোট পায়। আরও যুদ্ধজাহাজ ক্রয়ের পরিকল্পনাও আছে বলে বলেছিলেন তাঞ্জানিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জাকায়া কিকওয়েতে।

তাঞ্জানিয়া এবং কেনিয়ার পশ্চিমের স্থলবেষ্টিত দেশ উগান্ডা থেকে ১ হাজার ৪’শ কিঃমিঃ পাইপলাইনের মধ্যমে অপরিশোধিত তেল তাঞ্জানিয়ার সমুদ্রবন্দর টাঙ্গা পোর্টে আনার জন্যে প্রকল্প চলমান। সেখানে বিনিয়োগ করছে ফরাসী কোম্পানি টোটাল, ব্রিটিশ কোম্পানি টাল্লো, আর চীনা কোম্পানি সিএনওওসি। একইসাথে তাঞ্জানিয়ার দক্ষিণ উপকূলে ৫৭ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিটের বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি থেকে গ্যাস উত্তোলন করে এলএনজি হিসেবে জাহাজে করে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির চেষ্টা চলছে।

কেনিয়া-সোমালিয়ার সমুদ্র সম্পদ নিয়ে বিরোধ তাঞ্জানিয়াকেও সমুদ্র নিরাপত্তার ব্যাপারে নিরাপত্তাহীনতায় ফেলতে পারে। তাঞ্জানিয়ার দক্ষিণের প্রতিবেশী দেশ মোজাম্বিকও তার সমুদ্রসীমায় গ্যাসের খনি এবং মৎস্য আহরণের নিরাপত্তা দিতে ফ্রান্স এবং আমিরাত থেকে ডজনখানেকের বেশি অত্যাধুনিক প্যাট্রোল বোট কিনেছে।

মোজাম্বিকে পাওয়া গেছে তাঞ্জানিয়ার তিনগুণ গ্যাস। এই অঞ্চলের উত্তরে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বাব-এল মান্ডেব প্রণালী এবং সুয়েজ খাল; আর দক্ষিণে রয়েছে মোজাম্বিক চ্যানেল। বেশিরভাগ জাহাজ এখনও সুয়েজ খাল হয়ে চলাচল করলেও মোজাম্বিক চ্যানেলের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে এশিয়ার ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার কারণে। গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক নৌরুটের কাছে অবস্থানের কারণে পূর্ব আফ্রিকার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। এখানকার দেশগুলির মাঝে সমুদ্র সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতা নতুন এক ভূরাজনৈতিক খেলার জন্ম দিতে পারে, যেখানে শক্তিশালী দেশগুলি বিভিন্ন পক্ষ সমর্থন করে সংঘাতে জড়াবে। ইতোমধ্যেই এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে ইউরোপিয়রা ছাড়াও চীনা এবং ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ নিয়মিতই পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলিতে ভ্রমণ করছে।

লেখক: ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক