জাপানের সামরিক  পুনরুত্থানে নেতৃত্ব দেবে কারা?

ঢাকা, সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯ | ৮ বৈশাখ ১৪২৬

জাপানের সামরিক  পুনরুত্থানে নেতৃত্ব দেবে কারা?

পরিবর্তন ডেস্ক ১:২৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৯

জাপানের সামরিক  পুনরুত্থানে নেতৃত্ব দেবে কারা?

ছবিঃ ‘মাঙ্গা’ কার্টুনকে জাপানি প্রতিরক্ষা দপ্তর রিক্রুটিং-এ ব্যবহার করছে। 

চীনের সামরিক শক্তির উত্থানের সাথে সাথে জাপানের নীতিনির্ধারকদের মাঝেও চিন্তার পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। শিনজো আবে সরকারপ্রধান হবার পর থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের রচনা করে দেয়া জাপানি সংবিধানকে পরিবর্তন করার লক্ষ্যে এগুচ্ছে জাপান। জাপানি সংবিধানের ‘আর্টিকেল-৯’ অনুযায়ী জাপান যুদ্ধকে বর্জন করে এবং নিজস্ব সামরিক বাহিনী না রাখার পণ করে। কিন্তু ২০১৯ সালের বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে রেকর্ড ৪৭ বিলিয়ন ডলার অনুমোদন করে জাপান তার প্রতিরক্ষানীতির পরিবর্তনের ধারাকে অব্যাহত রাখে।

জাপানের সামরিক বাহিনীকে ‘সেলফ-ডিফেন্স ফোর্স’ বলা হলেও তা প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর সবচাইতে উন্নত সমরাস্ত্রে সজ্জিত সামরিক বাহিনীর একটি। জাপানের নৌবাহিনী বিশ্বের সবচাইতে বড় নৌবাহিনীগুলির একটি। তবে এখন জাপানের প্রতিবেশী চীন বা বিশ্বযুদ্ধে জাপানের বিরুদ্ধে জয়ী দেশ যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং দেশটার নিজস্ব সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থাই তার সামরিক বাহিনীর আরও শক্তি অর্জন করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জাপানি সামরিক বাহিনী তাদের রিক্রুটমেন্ট টার্গেটে পৌঁছাতে পারছে না কিছুতেই। ২০১৮ সালের মার্চে সেদেশের সামরিক বাহিনীতে মোট ২ লক্ষ ৪৭ হাজার সদস্য রাখার টার্গেট ছিল। এর বিপরীতে প্রকৃত সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় ২ লক্ষ ২৭ হাজারের মতো; অর্থাৎ প্রায় ২০ হাজার কম। প্রতি বছর ১৪ হাজার সদস্য রিক্রুট করতে গিয়ে ৫ হাজার রিক্রুটারকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আর গত বছর রিক্রুটিং-এর বাজেট ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়িয়ে ২১ মিলিয়ন ডলার করা হয়। তবু রিক্রুট করা যাচ্ছে না!

জাপানের জনগোষ্ঠীর বয়স বেড়ে যাচ্ছে। গত বছর অক্টোবরে সামরিক সার্ভিসে ঢোকার সর্বোচ্চ বয়স ২৬ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩২ বছর করা হয়। কিন্তু এই বয়সের মানুষের সংখ্যাই তো জাপানে কমে যাচ্ছে। ১৯৯৪ সালে যেখানে ১৮ থেকে ৩২ বছর বয়সের মানুষের সংখ্যা ছিল ৯০ লক্ষ, সেখানে ২০১৮ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৫৬ লক্ষে। এর উপরে আরও বড় সমস্যা হলো, কেউ এখন সামরিক সার্ভিসে যেতেই ইচ্ছুক নয়। জাপানের অর্থনীতিতে মানুষের গড় আয় এতটাই বেড়ে গেছে যে, অপেক্ষাকৃত কম বেতন এবং কষ্টকর সার্ভিসের জন্যে কেউ এখন সামরিক বাহিনীতে যেতে ইচ্ছুক নয়। ‘মিলিটারি টাইমস’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জাপানি নৌবাহিনীতে অনেকেই যেতে চায় না; কারণ যুবকরা মনে করছেন যে, জাহাজে থাকলে প্রিয়জনদের সাথে সোশাল মিডিয়াতে যোগাযোগ রাখা যাবে না। ম্যারিটাইম দেশে নৌবাহিনীর জন্যে রিক্রুট না পাওয়াটা বিপদ সংকেতের মতো। তাই নৌবাহিনীও এখন চিন্তা করছে যে, যুদ্ধজাহাজে ওয়াই-ফাই সুবিধা দেয়া যায় কিনা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে জাপানে অনেকেই যুদ্ধ চায় না। জাপানি সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল ইয়োশিকি আডাচির মতে, মানুষকে দেশের জন্যে কাজ করার গুরুত্ব বোঝাতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, হাই-স্কুলে এই কথা বলা হলে কেউই কথা শুনতে রাজি হবে না। আডাচির কথার প্রমাণ পাওয়া যায় জাপানি প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের রিক্রুটমেন্ট কৌশলে। সরকার রিক্রুট করতে গিয়ে সার্ভিসের আকর্ষণীয় দিকগুলিকেই তুলে ধরার চেষ্টা করে। সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্ক, বিমান বাহিনীর ফাইটার বিমান বা হেলিকপ্টার –এগুলিকেই বেশি করে তুলে ধরা হয়। জাপানি প্রতিরক্ষা দপ্তরের পার্সোনেল এফেয়ার্স ডিভিশনের ডিরেক্টর রিতসুকো হিরোশি বলছেন যে, একটা সময় ছিল যখন শারীরিক দৃঢ়তাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হতো। কিন্তু এখন অভিজ্ঞতা এবং টেকনিক্যাল বিষয়ে দক্ষতা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

২০১৭ সাল থেকে জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সামরিক বাহিনীতে মহিলাদের সংখ্যা ৬ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০৩০ সাল নাগাদ ৯ শতাংশে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। অর্থাৎ বাহিনীতে পুরুষদের প্রতিস্থাপিত করা হবে মহিলাদের দ্বারা। জাপানের সাথে পশ্চিমা দেশগুলির তুলনা করলে দেখা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে মহিলা রয়েছে ১৫ শতাংশ এবং ব্রিটেনে ১০ শতাংশ। সেই দেশগুলিও রিক্রুটিং-এর টার্গেট ধরতে হিমশিম খাচ্ছে। জাপানে রিক্রুটিং-এর টার্গেট ধরতে যেসব কর্মকান্ড চলছে, তার মাঝে রয়েছে ‘মাঙ্গা’ এনিমেশন বা কার্টুনের চরিত্রগুলিকে ব্যবহার করা। তবে কার্টুনের সেই চরিত্রগুলি শত্রু দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং বহির্বিশ্বের আক্রমণকারী বা শক্তিশালী কোন রোবোটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে; যা কিনা বাস্তবতা-বিবর্জিত। তবে জাপানি সরকার আপাততঃ ‘মাঙ্গা’ কার্টুনেই তাদের সমাধান খুঁজছে। একইসাথে ভবিষ্যতে কতটুকু কাজ রোবোট বা ড্রোন-এর মাধ্যমে করে ফেলা সম্ভব, সেদিকেও তাদের লক্ষ্য রয়েছে।

২০১১ সালের ভূমিকম্প এবং সুনামির সময় জনগণের সহায়তায় কাজ করায় জাপানি সামরিক বাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, জনগণের ৯০ শতাংশ সামরিক বাহিনীকে ভালো চোখে দেখে। কিন্তু সমস্যা হলো, মাত্র ২৪ শতাংশ মানুষ নিজের সন্তান বা বন্ধুকে সামরিক সার্ভিস করার জন্যে অনুপ্রাণিত করতে চায়। কেউ কেউ আবার মনে করেন যে, জাপানি সমাজে যারা কিছুটা অভাবের মাঝে রয়েছে, তারা টেকনিক্যাল সার্ভিসে পড়াশোনা করার সুযোগ পেতে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেয়; ধনী পরিবারের কেউই সেখানে যাবার কথা চিন্তাও করে না।

জাপানের শান্তিবাদী সংবিধান যুক্তরাষ্ট্রই লিখে দিয়েছিল; যাতে জাপান আর কখনোই যুদ্ধে না জড়ায়। আর জাপানের প্রতিরক্ষার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র নিজে নিয়ে নেয়। কিন্তু চীনের সামরিক সক্ষমতা বাড়ার সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্রই এখন চাইছে জাপান তার নিজের নিরাপত্তার বেশিরভাগটা নিজেই বুঝে নিক। তবে সাত দশকের যুদ্ধবিরোধী মনোভাব এখন জাপানি জনগণকে ছেড়ে যাচ্ছে না। আবার অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে সামরিক সার্ভিসের আকর্ষণীয়তাও এখন কমে গেছে। তবে সবচাইতে বড় সমস্যা হলো পুরো রাষ্ট্রের জনশক্তিই তো বুড়িয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল হয়েই জাপানিরা সামরিক রিক্রুটমেন্টের দুর্বলতা কাটাতে চাইছে। প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে এগিয়ে থাকার কারণে যন্ত্র দিয়ে মানুষকে প্রতিস্থাপনে জাপানিরা হয়তো অনেকটাই সক্ষম হবে, কিন্তু যেখানে মানুষ ছাড়া হবে না, সেখানে সামরিক বাহিনীর বুড়িয়ে যাওয়া পুরুষ সদস্য এবং মহিলা রিক্রুটদের মাধ্যমেই হয়তো কাজ করিয়ে নিতে হবে তাদের।