জিম্বাবুয়ে কি স্বাধীন হতে পেরেছে?  

ঢাকা, ২৪ মার্চ, ২০১৯ | 2 0 1

জিম্বাবুয়ে কি স্বাধীন হতে পেরেছে?  

আহমেদ শরীফ ৭:০৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২১, ২০১৯

জিম্বাবুয়ে কি স্বাধীন হতে পেরেছে?  

গত ১৭ই জানুয়ারি ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ দপ্তরের আফ্রিকা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হ্যারিয়েট বল্ডউইন ব্রিটেনে জিম্বাবুয়ের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠান। তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল জিম্বাবুয়ের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি। জ্বালানি তেলের মূল্যের ব্যাপক বৃদ্ধিতে সেদেশের মানুষ এখন রাস্তায়। ব্রিটিশ মন্ত্রী জিম্বাবুয়ের জনগণের প্রতিবাদে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, ভীতি প্রদর্থন এবং তাজা বুলেট ব্যবহারের ব্যাপারে তার সরকারের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে রাস্তায় মানুষের উপরে নিরাপত্তারক্ষীদের গোলাবর্ষণে কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনাকেও বল্ডউইন উল্লেখ করেন। তার কথায় জিম্বাবুয়ে সরকার জনগণের উপর অসমানুপাতিক হারে বলপ্রয়োগ করেছে। এমনকি অগ্নিসংযোগ এবং লুটতরাজের ঘটনা ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাবস্থা নেয়ারও সমালোচনা করেন বল্ডউইন। তিনি জিম্বাবুয়ের সরকারকে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষমতা কর্তন এবং সোশাল মিডিয়া উন্মুক্ত করে দেবার জন্যে আহ্বান করেন। জিম্বাবুয়ের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার যে এখনও দেশটার প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি ব্রিটেনের চিন্তার বিষয়, তা আবারও প্রমাণ হলো ব্রিটিনের এহেন হস্তক্ষেপে।

১৯৮০ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে আলোচনার মাধ্যমে স্বাধীনতা পায় জিম্বাবুয়ে। এরপর টানা ৩৭ বছর দেশটা রবার্ট মুগাবের অধীনে ছিল। এসময়ের মাঝে মুগাবে সরকারের সাথে ব্রিটিশ সরকারের সম্পর্কের অবনতি ঘটলেও ব্রিটেন মুগাবের সরকারকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে ১’শ মিলিয়ন পাউন্ডের সহায়তা দেয়। ২০১৭ সালের শেষের দিকে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রবার্ট মুগাবে ক্ষমতা হারান। এরপর ২০১৮-এর জুলাইয়ে এক নির্বাচনে মুগাবের সরকারেরই এক সদস্য এমারসন নানগাগাওয়া প্রেসিডেন্ট হন। ২০১৮-এর জানুয়ারিতে নানগাগাওয়া পশ্চিমাদের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের উপর জোর দেবার ব্যাপারটা পরিষ্কার করেন। একইসাথে ব্রিটেনের সাথে সম্পর্ক গভীর করা ব্যাপারেও তার লক্ষ্য ঠিক করেন।

নানগাগাওয়া গত নভেম্বরে ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এ এক লেখায় বলেন যে, বাকি বিশ্বের সহায়তা ছাড়া জিম্বাবুয়ে সফল হবে না। একইসাথে তিনি আরও বলেন যে, পরিবর্তনের জন্যে জিম্বাবুয়ের জনগণকে কষ্ট সহ্য করে সংস্কার মেনে নিতে হবে। তিনি তার অর্থমন্ত্রী মিথুলি নকুবের চেষ্টার কথা উল্লেখ করেন, যিনি এর আগে আফ্রিকা ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক-এ কাজ করতেন। তিনি বিশ্বব্যাঙ্ক এবং আইএমএফ-এর সাথে বৈঠক করে জিম্বাবুয়ের জন্যে আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। ২০০৯ সালে রবার্ট মুগাবে অস্বাভাবিক মুদ্রাস্ফীতি ঠেকাতে মার্কিন ডলারকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে অনুমতি দেন। সংস্কারের অংশ হিসেবে গত সেপ্টেম্বরে নানগাগাওয়া ঘোষণা দেন যে, তিনি মার্কিন ডলারকে নিজ দেশের মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করাকে সমর্থন করে যাবেন। তিনি আরও বলেন যে, মার্কিন ডলার হবে জিম্বাবুয়ের অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনার ভিত্তি। আর পশ্চিমা প্রেসক্রিপশনে চলার ঘোষণার পুরষ্কার হিসেবে নির্বাচিত হবার পরপরই নানগাগাওয়ার সরকার পশ্চিমা ঋণদাতাদের কাছ থেকে ৫’শ মিলিয়ন ডলারের লাইন-অব-ক্রেডিট নিশ্চিত করে।     

তবে বর্তমান সহিংসতার জন্ম ২০১৯-এর জানুয়ারিতে। ১৩ তারিখ নানগাগাওয়া ঘোষণা দেন যে, এক লিটার পেট্রোলের মূল্য ১ দশমিক ২৪ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৩১ ডলার এবং ডিজেলের মূল্য ১ দশমিক ৩৬ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ১১ ডলার করা হয়েছে। অর্থাৎ পেট্রোলের মূল্য ১’শ ৬৭ শতাংশ এবং ডিজেলের মূল্য ১’শ ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়! যুক্তি হিসেবে বলা হয় যে, তেলের বর্ধিত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং জিম্বাবুয়ে থেকে পার্শ্ববর্তী দেশে তেল পাচার রোধ করতেই এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এই ঘোষণা আসে এমন সময়ে যখন ২০১৮-এর অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত জিম্বাবুয়েতে জ্বালানি তেলের স্বল্পতা মারাত্মক আকার ধারণ করে। সরকার বলছে যে, জিম্বাবুয়েতে তেলের মূল্য প্রতিবেশী দেশ থেকে কম হওয়ায় এখান থেকে তেল পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার হয়ে যায়; যা কিনা তেলের স্বল্পতা তৈরিতে সহায়তা করেছে।  

জিম্বাবুয়ের অর্থনীতি বহুদিন ধরেই খুঁড়িয়ে চলছে। ‘ডয়েচে ভেলে’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, দেশটিতে এখন ৮০ শতাংশ মানুষ বেকার। ডিসেম্বরের শুরুতে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা মার্কিন ডলারে বেতন পাবার দাবিতে ৪০ দিনের জন্যে ধর্মঘটে যায়। আর তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর দেশের সবচাইতে বড় শ্রমিক ফেডারেশন ‘জিম্বাবুয়ে কংগ্রেস অব ট্রেড ইউনিয়নস’ তিন দিনের জন্যে ধর্মঘটে যায়। সরকারি মুখপাত্র নিক মাংওয়ানা বলেন যে, তেলের স্বল্পতা এবং মূল্যবৃদ্ধিকে উপজীব্য করে সুশীল গ্রুপগুলি এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি সরকারকে সরাবার চেষ্টা করছে।

আর্থিক সংকটে জিম্বাবুয়ের সরকার সরকারি কর্মচারীদের বেতন দিতে হিমসিম খাচ্ছে। একইসাথে পশ্চিমা প্রেসক্রিপশনে সরকারি কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি দমনের মতো কর্মকান্ড নিতে গিয়েও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে নানগাগাওয়ার সরকারকে। সরকারি খরচ কমাবার শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে জিম্বাবুয়ে পশ্চিমা ঋণদাতাদের কাছ থেকে অর্থ পাবে না; আর অর্থ না পেলে সরকারি কর্মচারীদের বেতনও সময়মত দিতে পারবে না। অথচ চরম মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে সরকারি কর্মচারীরা বর্তমান বেতন কাঠামোতে সংসার চালাচ্ছে খুব কষ্টে। রাষ্ট্রীয় খরচ কমাবার পদ্ধতি হিসেবেই জিম্বাবুয়ে সরকার জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমাতে চাইছে। কারণ জ্বালানি তেল আমদানিতে যে অর্থ লাগবে, তা-ও জিম্বাবুয়ের নেই; ঋণদাতাদের কাছ থেকে ঋণ নিতে হবে তার।

জিম্বাবুয়ের রাস্তায় সহিংসতার ব্যাপারে শুধু ব্রিটেন নয়, জিম্বাবুয়েতে মার্কিন দূতাবাসও কথা বলেছে। কিন্তু শক্তিশালী দেশগুলির সমালোচনা ছিল শুধুমাত্র জনগণের উপর আইনশৃংখলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের ব্যাপারে। জ্বালানি তেলের অযাচিত মূল্য-বৃদ্ধির ব্যাপারে নয়। কারণ তেলের মূল্যবৃদ্ধি যে আসলে পশ্চিমা প্রেসক্রিপশনেরই ফলস্বরূপ! ঔপনিবেশিক শক্তি ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাবার পর জিম্বাবুয়ে প্রায় চার দশকে কতটা স্বাধীন হতে পেরেছে, তা আজ জিম্বাবুয়ের সাধারণ মানুষের প্রশ্ন। গত এপ্রিলে ব্রিটেনের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের জন্যে জিম্বাবুয়ের মন্ত্রী সিবুসিসো ময়ো লন্ডন যান। তিনি বলেন যে, জিম্বাবুয়ের জাতীয় চিন্তাই দেশটাকে ব্রিটেনের কাছাকাছি নিয়ে যায়। যেকারণে জিম্বাবুয়ে আবারও কমনওয়েলথে ফেরত যাচ্ছে।

 

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: আরও পড়ুন

আরও