বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে আরাকান আর্মির হামলা ও সম্ভাব্য প্রভাব

ঢাকা, রবিবার, ২০ জানুয়ারি ২০১৯ | ৬ মাঘ ১৪২৫

বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে আরাকান আর্মির হামলা ও সম্ভাব্য প্রভাব

পরিবর্তন ডেস্ক ৩:৫৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০১৯

বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে আরাকান আর্মির হামলা ও সম্ভাব্য প্রভাব

গত ৪ জানুয়ারি মিয়ানমারের আলোচিত রাখাইন রাজ্যের চারটি পুলিশ চেক পোস্টে হামলা চালায় দেশটির বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মির (এএ) যোদ্ধারা। দেশটির ৭১তম স্বাধীনতা দিবসে চালানো ওই হামলায় ১৩ পুলিশ সদস্য নিহত হয়। এ ছাড়া অন্তত ১৮ পুলিশ সদস্যকে অপহরণও করে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াই করা আরাকান আর্মির সদস্যরা।

বিষয়টি নিয়ে মিয়ানমারের প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য ইরাওয়াদ্দি ডটকম তাদের ‘ডেটলাইন’ প্রগ্রামে কথা বলে দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইউ মং মং সোয়ের সঙ্গে। প্রগ্রামে সোয়ের দেওয়া বক্তব্যের সারসংক্ষেপ পরিবর্তন ডটকমের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

মিয়ানমার-চীন সীমান্তে ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আরাকান আর্মি। সম্ভবত, এএ আরাকানের পূর্ববর্তী সংগঠন যেমন- এআইএ (আরাকান ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি) এবং এএলপি (আরাকান লিবারেশন পার্টি) থেকে শিক্ষা নিয়েছে। ১৯৬৮ সালে সংগঠন দুটি আত্মপ্রকাশ করেছিল। ওই সময় কারেন রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এএলপি। ১৯৭৫ সালের দিকে কয়েক শ সদস্য সংগ্রহ করে এটি কারেন থেকে শান রাজ্যে যায়। পরে নাগা পার্বত্য অঞ্চল হয়ে কাচিন ও পরে চিন রাজ্যে চলে যায়। সেখানেই তাতমাদো (মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নাম) সদস্যদের হাতে নিশ্চিহ্ন হয় তারা।

একইভাবে কেআইএ (কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি) এর সহায়তায় ইউ স্যান কিয়াও কিয়াও তুনের নেতৃত্বে গড়ে উঠে এআইএ। পরে তারাও কাচিন থেকে চিন রাজ্যে অগ্রসর হওয়ার সময় সেনাবাহিনীর হাতে নির্মূল হয়ে যায়।

মনে হয়, ওইসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এএ মিয়ানমার-চীন সীমান্তে একটি শক্তিশালী বাহিনী গঠন করতে বেশ সময় নেয়।

মং মং বলেন, আরাকান আর্মি তাদের যোদ্ধাদের নিয়ে একত্রে অগ্রসর হওয়ার চেয়ে রাখাইনে অনুপ্রবেশ করার কৌশল নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। সেইসঙ্গে তারা রাখাইন রাজ্যের উত্তরের দিকে চিন রাজ্যের গভীর অরন্যে ঘাঁটি স্থাপন করেছে।

২০১৪ ও ২০১৫ সালের দিকে এএ ও অন্যান্য সংগঠনগুলো শান্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া শুরু করে। কিন্তু পরে মিয়ানমারের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউ থেইন সেইন শান্তি প্রক্রিয়ার নেতাদের সঙ্গে দেখা করলে সে প্রক্রিয়া ভেস্তে যায়। এর পর ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন হামলা এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে এএ যোদ্ধাদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

এর পর এএ যোদ্ধারা ধীরে ধীরে রাখাইন ও পালেটওয়ায় অনুপ্রবেশ করতে থাকে এবং ২০১৮ সালের শেষ দিকে তারা বুথিডং, রাথেডং, পোন্নাগিউন ও কিয়াওটাও উপশহরগুলোর কাছাকাছি চলে আসে। এরপরও বনাঞ্চলে সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এমনকি সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের দমনে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ২১ ডিসেম্বর চীন-মিয়ানমার সীমান্তে সেনাবহিনী কাচিন ও শান রাজ্যের পাঁচটি সামরিক জোনে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। কিন্তু এর অন্তভুক্ত ছিল না আরাকান আর্মি। তবে পশ্চিমাঞ্চলীয় কমান্ডের বাইরে কার্যকর হয়নি এই যুদ্ধবিরতি।

তাতমাদো বলছে, আরসার (আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি) কারণে সেখানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

কিন্তু আমার মত, বলেন মং মং, হলো- উত্তর রাখাইনে এএ সেনাদের (যোদ্ধা) অনুপ্রবেশের কারণেই এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। সেখানে যদি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হতো, তাহলে আরাকান আর্মির অস্তিত্ব স্বীকার করা হতো।

ইতোমধ্যে সেনাবাহিনী এএ-এর সঙ্গে আলোচনার পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু এ ধরনের আলোচনার মাধ্যমে সেখানে অভিযান বন্ধ করা সেনাবাহিনীর জন্য কঠিন হবে। এ কারণে আমি আশা করব, সেনাবাহিনী বরং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেবে।

কিন্তু সেটা বাস্তবে ঘটবে না। কারণ এএ জানে যে, তাতমাদো কাচিন, উত্তর শান ও রাখাইনে সেনা সমাবেশ করবে এবং তাদের বিরদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালাবে। ফলে আবার সংঘর্ষ বাঁধবে এবং অব্যাহত থাকবে।

২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম এএ পুলিশের চেকপোস্টে এ ধরনের হামলা চালালো। আমার মনে হয়, পালেটওয়া ও উত্তর রাখাইন রাজ্যে তারা ঘাঁটি স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর সেনাবাহিনী যদি সেটা মেনে না নেয় তাহলে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটবে।

এরই মধ্যে মিয়ানমার সরকার আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে সেনাবাহিনীকে অনুমতি দিয়েছে। মং মং সোয়ে বলছেন, অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন এনএলডি সরকার প্রথমবারের মতো এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। সুতরাং, দেখার বিষয় তারা কীভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করে। আগে সেনাবাহিনী সংবিধান অনুযায়ী কোনো বিদ্রোহী সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযানে যেত। কিন্তু এবার অনুমতি দিয়েছে রাজনৈতিক সরকার। তাই সরকারের এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অন্যান্য সংগঠনগুলো কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটাও দেখার বিষয়। সেইসঙ্গে চীনকেও এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে হবে।

আমি আবারো বলছি, উত্তর রাখাইন রাজ্যে এএ সেনাদের উপস্থিতি সেনাবাহিনী স্বীকার করুক আর না করুক, তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।

মং মং সোয়ে বলেন, মিয়ানমার সরকার বলছে, বাংলাদেশে আরাকান আর্মির ঘাঁটি আছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার সেটা প্রত্যাখ্যান করেছে। অভিযোগ রয়েছে, বেইজিং তাদের স্বার্থেই এএ-কে সমর্থন দিচ্ছে। অন্যদিকে, ভারত এই ইস্যুতে এখনও কোনো কথা বলেনি। বরং তারা মিয়ানমারে চীনের প্রভাবের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। আবার এমন অভিযোগও রয়েছে যে, মিয়ানমারে কুকি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ঘাঁটি রয়েছে, যারা প্রায়ই ভারতের মনিপুর রাজ্যে হামলা চালায়। এ ছাড়া নাগা বিদ্রোহীদের ঘাঁটিও মিয়ানমারে রয়েছেই। সুতরাং ভারত এই ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমি মনে করি।

অন্যদিকে, মিয়ানমার সরকারের দাবি, আরসার সঙ্গে আরাকান আর্মির যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু এর মাধ্যমে সরকার দুটো সমস্যাকে একত্র করছে, যা মোকাবিলা সরকারের জন্য কঠিন। বরং দুটো সমস্যাকে আলাদাভাবে দেখলেই সমাধান করা সহজ হবে।

আরপি