আরাকান আর্মি: তাতমাদোর জন্য শক্তিশালী এক নতুন হুমকি

ঢাকা, সোমবার, ২৫ মার্চ ২০১৯ | ১১ চৈত্র ১৪২৫

আরাকান আর্মি: তাতমাদোর জন্য শক্তিশালী এক নতুন হুমকি

পরিবর্তন ডেস্ক ৪:১১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০৯, ২০১৯

আরাকান আর্মি: তাতমাদোর জন্য শক্তিশালী এক নতুন হুমকি

আরাকান আর্মির চিফ মেজর জেনারেল তন ম্রাট নাইং (ডান থেকে দ্বিতীয়) ২০১৬ সালে স্থানীয় একটি শান্তি সম্মেলনে যোগ দেন।  

মাত্র নয় বছর আগে ২৬ জন আরাকানি (রাখাইন) যুবক নিয়ে গঠিত হয়েছিল আরাকান আর্মি (এএ)। অথচ নয় বছরের ব্যবধানে ভয়ংকর এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজারে। যারা এখন তাদের জন্মভূমি রাখাইনে ঘাঁটি স্থাপনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

সম্প্রতি মিয়ানমারের বুথিডংয়ে দেশটির সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর চারটি চেকপোস্টে সুসমন্বিত হামলা চালায় আরাকান আর্মির কয়েক শ সদস্য। হামলায় সীমান্ত পুলিশের ১৩ সদস্য নিহত হয়। এ ছাড়া পুলিশের ১৮ সদস্য ও তাদের পরিবারকে অপহরণ করে আরাকান আর্মি। যদিও পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া মিয়ানমার আর্মি (তাতমাদো) শক্তি বৃদ্ধি করে অভিযান শুরু করার পরই পিছু হটে এএ সদস্যরা।

রাখাইনের রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার যখন আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে, তখন আরাকান আর্মির এ হামলার ঘটনা ঘটলো। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর অভিযান চালায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। ভয়ংকর ওই অভিযানের শিকার হয়ে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।

প্রশিক্ষণ শেষে আরাকান আর্মির ক্যাডেটদের র‌্যাঙ্কিং ব্যাজ পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে কাচিন প্রদেশের লাইজায় প্রতিষ্ঠা করা আরাকান আর্মি। যদিও তাদের জন্মস্থান রাখাইন রাজ্যে। এএ প্রতিষ্ঠায় পূর্ণ সমর্থন ছিল কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মির (কেআইএ)। আর ২০১৪ সালে এএ তাদের জন্মভূমি রাখাইনে ফেরার লক্ষ্য প্রকাশ করে।

মিয়ানমারভিত্তিক গণমাধ্যম দ্য ইরাওয়াদ্দি ডটকম তাদের এ বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে- সর্বশেষ অবস্থা থেকে মনে হচ্ছে, এএ তাদের সেই লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

নৃগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করেন এমন বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, রাখাইন রাজ্যের কিয়াওকতো, বুথিডং, রাথেডং ও পোনাংউন এবং চিন রাজ্যের পালেটওয়া অঞ্চলে আরাকান আর্মির প্রায় তিন হাজার সদস্য প্রবেশ করেছে।

মেন্টর (পরামর্শদাতা) গ্রুপ কেআইএ এবং মিত্র সংগঠন ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি (ইউডব্লিউএসএ) থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে আরাকান আর্মি। এ ছাড়া থাই-মিয়ানমার সীমান্তের কালোবাজার থেকেও তারা অস্ত্র কেনে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, মিয়ানমার-ভারত সীমান্তের কুকি বিদ্রোহীদের কাছ থেকে অস্ত্র কিনে থাকে আরাকান আর্মি।

কাচিন রাজ্যের লাইজার ন্যান সাম র‌্যান ক্রিকে আরাকান আর্মির ট্রেনিং স্কুলের সামনে বাহিনীর সদস্যরা। ছবিটি ২০১৪ সালে তোলা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদিও এটা অনেকটাই সত্য যে, আরাকান আর্মিকে তাদের আরাকানি সমর্থকরা অর্থায়ন করে থাকে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার ও দেশটির সেনাবাহিনীর অভিযোগ, এএ মাদকপাচারের অর্থ দিয়ে বাহিনীকে শক্তিশালী করছে।

মাত্র নয় বছরের মধ্যে মিয়ানমারের কোনো নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী এ রকম শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে সেটা খুবই বিরল। এর পেছনে কারণ হলো-

কর্মস্থানের খোঁজে এবং রাখাইনের দুর্দশাগ্রস্ত অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে বাঁচতে দীর্ঘ বছর ধরে আরাকানিরা অভিবাসন করতে থাকে। বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা এসব আরাকানি প্রত্যেক মাসেই (নিয়মিতভিত্তিতে) আরাকান আর্মিকে সহায়তা করছে। এমনকি প্রভাবশালী আরাকানিরা সংগঠনটিকে নিয়মিতভিত্তিতে বড় ধরনের সহযোগিতা করছে।

আরাকান আর্মির চিফ মেজর জেনারেল তন ম্রাট নাইং ইরাওয়াদ্দিকে এক সময় বলেছেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ২০১৭ সালে চিন রাজ্যের পালেটওয়ায় তাদের ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায়। এরপর ধনী আরাকানিরা তাদের বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে পর্যন্ত সাহায্য করেছে।

আরাকান আর্মির প্রতি আরাকানিদের সমর্থন এতটাই বেশি যে, সোমবার মিয়ানমার প্রেসিডেন্টের অফিসের মুখপাত্র ইউ জো হতয় এএ-কে সমর্থন বন্ধের আহ্বান জানাতে বাধ্য হয়েছেন।

তবে আরাকান আর্মির তথ্য অফিসার খিন থু খ মাদক পাচার সংক্রান্ত সরকার ও সেনাবাহিনীর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু ২০১৭ জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটি যে রিপোর্ট দেয়, তাতে বলা হয়, মাদকের ডিলারদের সঙ্গে আরাকান আর্মির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

১৯৬২ সাল থেকেই আরাকানিদের কিছু সংগঠন অধিকার তথা অধিকতর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন করতে থাকে। যেমন- দ্য আরাকান লিবারেশন পার্টি এবং এর সশন্ত্র শাখা দ্য আরাকান লিবারেশন আর্মি। কিন্তু তারা ব্যাপকভাবে আরাকানিদের মন জয় করতে পারেনি, যেটা পেরেছে আরাকান আর্মি।

এর অন্যতম কারণ হলো- আরাকান আর্মি জনগণের মাঝে তাদের দেশপ্রেমিক তথা জাতীয়তাবাদী হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। সেইসঙ্গে আরাকান রাজত্বের হৃত গৌরব তথা তাদের সেই স্বর্ণযুগ পুনরুদ্ধারের স্বপ্নও তারা মানুষের মাঝে তৈরি করতে পেরেছে।

আরপি

আরও পড়ুন...
রাখাইনে পুলিশ পোস্টে আরাকান আর্মির হামলার ভিডিও
রাখাইনে বৌদ্ধ বিদ্রোহীদের হামলা, ১৩ পুলিশ নিহত
১৪ পুলিশ, ৪ নারীকে ছেড়ে দিল আরাকান আর্মি