চীন-মার্কিন সম্পর্কে আগুন জ্বালানো কে এই মেং ওয়াংঝু?

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০১৯ | ৪ মাঘ ১৪২৫

চীন-মার্কিন সম্পর্কে আগুন জ্বালানো কে এই মেং ওয়াংঝু?

মোহাম্মদ মামুনূর রশিদ ৬:৪৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১১, ২০১৮

চীন-মার্কিন সম্পর্কে আগুন জ্বালানো কে এই মেং ওয়াংঝু?

সম্প্রতি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে চলে এসেছেন এক নারী। হুয়াওয়ের এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার গ্রেফতারকে ঘিরে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির দুই দেশের মধ্যে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ টেলিকম সংস্থা হুয়াওয়ের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মেং ওয়াংঝু সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতার বড় মেয়ে।

ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধ ভঙ্গের দায়ে গত সপ্তাহে তাকে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের এয়ারপোর্ট থেকে গ্রেফতার করা হয়।

চীন ও হুয়াওয়ে বলছে ওয়াংঝু কোনও আইন ভঙ্গ করেননি। কিন্তু তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রমাণিত হলে ৩০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেয়া হতে পারে।

মেং ওয়াংঝু সাব্রিনা মেং ও ক্যাথি মেং নামেও পরিচিত। ১৯৯৩ সালে রিসেপশনিস্ট হিসেবে হুয়াওয়েতে যোগদান করেন তিনি। হুয়াংঝং ইউনিভার্সিটি অফ সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে ১৯৯৯ সালে একাউন্টিংয়ে মাস্টার্স শেষ করার পর সংস্থাটির ফাইনান্স ডিপার্টমেন্টে যোগদান করেন তিনি। এরপর ধাপে ধাপে এর শীর্ষে উঠে আসেন ৪৬ বছর বয়সী এই নারী।

২০১১ সালে প্রধান অর্থ কর্মকর্তা নিযুক্ত হন মেং। গ্রেফতারের মাত্র কয়েক মাস আগে তাকে হুয়াওয়ের ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়।

২০১৮ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনে চীনের শীর্ষ নারী ব্যবসায়ীদের তালিকায় ১২তম ছিলেন মেং। আগের বছরের থেকে চার ধাপ পিছিয়ে তিনি ওই জায়গায় যান।

মেং যে চীনের ধনকুবের রেন ঝেংফাইয়ের মেয়ে সেটা জনসমক্ষে আসে মাত্র কয়েক বছর আগে।

১৬ বছর বয়সে চীনা প্রথার বিরল ব্যতিক্রম ঘটিয়ে মেং তার মায়ের নামের শেষ অংশ গ্রহণ করেন। তিনি রেনের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে।

চীনে আসার পথে ১ ডিসেম্বর ভ্যাঙ্কুভারে প্লেন পাল্টানোর সময় গ্রেফতার করা হয় মেংকে।

তার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি ব্যাংকগুলোকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ঠকানোর ষড়যন্ত্র করছিলেন। হুয়াওয়ের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে পৃথক সংস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করে মার্কিন অবরোধকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে ২০১৬ সাল থেকে। তারা মনে করে সহযোগী একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে হুয়াওয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি যন্ত্র ও কয়েক মিলিয়ন ডলার ইরানকে দিয়েছে।

মেংয়ের গ্রেফতারের ফলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ও কানাডার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

ব্রিটিশ কলম্বিয়ার আদালতে দাখিল করা নথিপত্র থেকে মেং জীবনের বিভিন্ন তথ্য জানা যায়।

তিনি থাইরয়েড ক্যান্সার থেকে আরোগ্য লাভ করেছেন। বর্তমানে তিনি উচ্চ রক্তচাপ ও ঘুমের অনিয়মে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী। তাকে প্রতিদিন নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। শক্ত খাবার খেতে পারেন না পারেন বলেও আদালতকে জানান মেং।

চার সন্তানের জননী মেংয়ের জামিনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তার আইনজীবী।

২০০৯ সাল পর্যন্ত কানাডাতেই ছিলেন মেং। এরপর তিনি চীনে ফিরে যান।

তবে ভ্যাঙ্কুভারে তার দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে ছয় বেডরুমের একটি বাড়িও কিনেছেন তিনি। সেখানে তিনি নিয়মিত তার সন্তানের সঙ্গে সময় কাটান। বর্তমানে বাড়িটির মূল্য ৪.২ মিলিয়ন ডলার।

২০১৬ সালে এই দম্পতি আরেকটি বিশাল বাড়ি কেনেন যার মূল্য ১৬.৩ মিলিয়ন কানাডীয় ডলার। এই দু’টি বাড়ির বিনিময়ে আদালতে জামিনের আবেদন করেছেন তিনি।

আদালতে দেয়া নথি থেকে মেংয়ের জীবনের অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন বিবিসির এশিয়া প্যাসিফিক এডিটর মাইকেল বিস্ট্রো।

‘ভ্যাঙ্কুভার বেশ কয়েক বছর ধরে চীনের ধনী ব্যক্তিদের কাছে আকর্ষণীয় জায়গা হয়ে উঠেছে। চীনের অনিশ্চিত জীবনের বিপরীতে এখানে থাকা, বাচ্চাদের স্কুল ও ইনস্যুরেন্স পলিসি তাদের কাছে আকর্ষণীয়।’ 

‘মানুষ জেনে আশ্চর্য হবে ভ্যাঙ্কুভারে মেংয়ের একটি নয়, দু’টি বাড়ি রয়েছে। মেংয়ের একই সঙ্গে সাতটি পাসপোর্ট কিভাবে পেলেন সেটা ভেবেও তারা অবাক হবেন,’ বলেন বিস্ট্রো।

সাতটি পাসপোর্টের বিষয়টি আরেক রহস্য। তার কাছে চীনের পাসপোর্টই চারটা, হংকংয়ের পাসপোর্ট তিনটা।

চীনের নিয়ম হচ্ছে অন্যদেশ বা অঞ্চলের পাসপোর্ট নিতে হলে আগে তাকে চীনের পাসপোর্ট অবশ্যই জমা দিতে হবে।

হংকংয়ের কর্মকর্তারা মেংয়ের মামলার বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মার্কিন কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী মেং ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৩৩ বার যাতায়াতের জন্য তিনটি হংকং পাসপোর্ট ব্যবহার করেন।

কানাডার পুলিশ জানিয়েছে, ২০১৭ সালে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয়টি জানার পর এর কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রকে এড়ানোর জন্য ‘সফরসুচির পরিকল্পনা পরিবর্তন করেছেন’।

এমআর/