ইয়েমেনে যুদ্ধের পরিস্থিতি পাল্টে যাচ্ছে?

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

ইয়েমেনে যুদ্ধের পরিস্থিতি পাল্টে যাচ্ছে?

পরিবর্তন ডেস্ক ৪:৫৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৩, ২০১৮

ইয়েমেনে যুদ্ধের পরিস্থিতি পাল্টে যাচ্ছে?

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে সফরে যাওয়ার আগে সোমবার ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট ইয়েমেনে যুদ্ধরত দুই পক্ষকে অস্ত্রবিরতির দাবী জানিয়েছেন। ইয়েমেনের হাদি সরকারের সমর্থনে সৌদি ও আরব আমিরাত জোট এবং ইরান সমর্থিত হুথি জোট লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছে।

‘ইয়েমেনের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অপরিমেয়। এতে লাখ লাখ মানুষ আশ্রয়হী হয়ে দুর্ভিক্ষ ও অসুখে ভুগছে। বছরের বছরের পর ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের একমাত্র সমাধান হচ্ছে অস্ত্র নামিয়ে রেখে শান্তির উপায় খোঁজার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত,’ মন্তব্য করেন হান্ট। তিনি আরও জানান তার সরকার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই যুদ্ধ বন্ধে একটি প্রস্তাবনা বা রেজোল্যুশন আনার তৎপরতা চালাচ্ছে।

এদিকে, গত সপ্তাহের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটদের বিজয়ে সৌদির জন্য ট্রাম্পের কঠিন সমর্থনের বিরোধীরা ওয়াশিংটনে আরও শক্তিশালী হয়েছেন। জানুয়ারি মাসে ডেমোক্রেটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিলে তারা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে এই যুদ্ধে হস্তক্ষেপের বিষয়টিকে আরও গভীরভাবে তদারকি করবে।

এখন এসব কী ইয়েমেনের যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারবে? এখন এটা সম্ভব মনে হচ্ছে। সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগির হত্যাকাণ্ডের পর রিয়াদের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হয়েছে। রাজত্বটির পশ্চিমা সহযোগীরা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদির হস্তক্ষেপের বিষয়টিকে পুনর্মুল্যায়ন করতে পারে। এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধে ১০ হাজার মানুষ মারা গেছে এবং দেশটির অর্ধেক মানুষ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

সিনেটর জিন শাহিন ও সিনেটর টড সি ইয়ং শুক্রবার এক যৌথ বিবৃতিতে রিয়াদকে কঠোর বার্তা দেয়ার আহ্বান জানান। ‘রিয়াদকে অবশ্যই বুঝতে হবে, যে আমরা বেসামরিক লোক ও স্থাপনার ওপর নির্বিচারে বিমান হামলা সহ্য করব না।’

গত সপ্তাহের শেষে ওবামার প্রশাসনের ৩০ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই যুদ্ধে আমেরিকার ভূমিকা পালন বন্ধ করতে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। তারাই এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা শুরুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের সময়ে এই অবস্থার অবনতি হয়েছে বলে দাবী করেন তারা। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের কৌশল মূলত ইরানের মোকাবেলা এবং রিয়াদ ও আবুধাবির সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরিকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে।

‘আমরা জোট বাহিনীর জন্য মার্কিন সমর্থনের কোনও ব্ল্যাংক চেক দিতে চাইনি। কিন্তু এখন, সেখানে বেসামরিক মানুষদের হতাহতের ঘটনা বেড়েই চলেছে এবং যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই। এ থেকে এটা পরিষ্কার যে সৌদিকে আমরা যা খুশি তাই করার স্বাধীনতাই দিচ্ছি’ বলেন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। এদের মধ্যে প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান ই রাইস এবং সিআইএ’র পরিচালক জন ব্রেনানও রয়েছেন।

‘তবে আমাদের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয়ার পরিবর্তে, ট্রাম্পের প্রশাসন যুদ্ধে সৌদি সরকারকে সমর্থন দেয়া বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে আমরা যে বিধি-নিষেধগুলো দিয়ে রেখেছিলাম সেগুলোও সরিয়ে দিয়েছে। ইয়েমেনের এই সর্বনাশা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন দেয়া বন্ধ করার সময় অনেক আগেই হয়ে গেছে,’ বলা হয় তাদের বিবৃতিতে।

মার্কিন কৌশলের বস্তুগত পরিবর্তনের লক্ষণ প্রথম দেখা যায় শুক্রবার। যুক্তরাষ্ট্র সৌদি জোটের বিমানে উড়ন্ত অবস্থায় আর জ্বালানি সরবরাহ করবে না বলে জানায় এদিন। এসব বিমান ইয়েমেনে হাজার হাজার হামলা চালিয়েছে।

ওয়াশিংটনের পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘জোটবাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সরবরাহ অনেক দিন ধরেই সমালোচিত হচ্ছিল। কারণ, এসব বিমান হামলায় বহু বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে।

হাসপাতাল, ক্লিনিক, বিয়ের অনুষ্ঠান, শেষকৃত্য, কারখানা, ও অন্যান্য বেসামরিক স্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে জোট বাহিনী। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া যুদ্ধের সরঞ্জাম দিয়ে হামলা চালানো বহু জায়গার সামান্য কয়েকটি দেখতে পেরেছে।’

মার্কিন প্রশাসন এখনও সৌদি জোটকে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যসহ অন্যান্য অনেক কিছু দিয়ে সহায়তা করছে। ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে অভিযান পরিচালনা করছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। তারপরও কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এই ঘোষণাকে ওয়াশিংটনের হাওয়া বদলের লক্ষণ বলেই মনে করছেন।

‘সৌদির যুদ্ধ তৎপরতা বন্ধে এবারই প্রথম কোনও বাস্তব পদক্ষেপ নিল যুক্তরাষ্ট্র। দু’টি প্রশাসন সৌদিকে যা খুশি তাই করার স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছিল। এখন ইয়েমেনের ভিতরের এলাকাগুলোতে বিমান হামলা চালানো সৌদির জন্য কঠিন হবে,’ বলেন ব্রুস রিডেল। সিআইএ’র এই সাবেক কর্মকর্তা এখন ব্রুকিংস ইন্সটিটিউটের একজন গবেষক।

তবে অন্যরা যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের বিষয়ে তেমন আশাবাদী নন। ‘জোটের বিমানে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করাটা গুরুত্বপূর্ণ। এলোপাথাড়ি বিমান হামলায় বেসামরিক মানুষের ভয়াবহ ক্ষতির দায় থেকে তারা মুক্ত থাকতে চায় এটা বুঝাতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এতে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতির কোনও বদল হবে না,’ বলেন এলিজাবেথ কেন্ডাল। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইয়েমেন বিষয়ক পণ্ডিত।

আন্তর্জাতিক মহল এখন বন্দর শহর হুদাইদায় চলমান যুদ্ধের ওপর নজর রাখছে। দেশটির ৮০ শতাংশ মানুষের কাছে খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছায় এই বন্দরের মাধ্যমে। জোটবাহিনী মনে করছে হুদাইদা দখল করতে পারলে হুথি বিদ্রোহীরা একেবারে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে।

সৌদি জোট শহরের হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে হামলার প্রচণ্ডতা বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে সেখানে বেসামরিক মানুষদের হতাহতের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছে পর্যবেক্ষকরা।

এবছরের শুরুতে জাতিসংঘের উদ্যোগে ইয়েমেনে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ সফল হয়নি। হুথি বিদ্রোহীরা তাদের বিশ্বাস করে আলোচনায় বসতে চাইছে না বলে অভিযোগ করে সৌদি ও আমিরাতের কর্মকর্তারা। অন্য দিকে হুথিরাও সৌদি জোটের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ করে।

‘সৌদি নেতারা বেপরোয়া এবং তারা কূটনীতিতে বিশ্বাস করে না,’ মন্তব্য করেন বিদ্রোহী দলের নেতা মোহাম্মদ আলি হুথি। ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত বিরল একটি সম্পাদকীয়তে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এই যুদ্ধ বন্ধ করতে পারে, কিন্তু তারা দুর্নীতিগ্রস্ত জোটকে সমর্থন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

দুই পক্ষের লড়াইয়ের ফলে ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। ‘ইয়েমেনে এখন মানবিক সহায়তা দরকার,’ বলেন মধ্যপ্রাচ্যে জাতিসঘের শরণার্থী সংস্থার কার্যক্রম পরিচালক আমিন আওয়াদ।

গত সপ্তাহে তিনি জানান, ‘সেখানে কোনও খাবার নেই, কলেরা ছড়িয়ে পড়ছে এবং শিশুরা মারা যাচ্ছে। আমরা এই মানুষদের আমাদের উভয়কেই হতাশ করছি।’

[দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত ইশান থারুরের বিশ্লেষণ, ‘Is this the turning point for the war in Yemen?’

অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ মামুনূর রশিদ। ইশান থারুর টাইম ম্যাগাজিনের সাবেক সিনিওর এডিটর।]

এমআর/এএসটি