আজভ সাগর: যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া দ্বন্দ্বের নতুন ক্ষেত্র?

ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৫ পৌষ ১৪২৫

আজভ সাগর: যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া দ্বন্দ্বের নতুন ক্ষেত্র?

আহমেদ শরীফ ১২:৩৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৮

আজভ সাগর: যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া দ্বন্দ্বের নতুন ক্ষেত্র?

গত ২৩শে সেপ্টেম্বর ইউক্রেনের দক্ষিণে অবস্থিত রুশ অধিকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপ এবং রাশিয়ার মাঝে অবস্থিত আজভ সাগরে ইউক্রেনের নৌবাহিনী দু’টা জাহাজ পাঠিয়েছে। রুশ নৌবাহিনীর জাহাজগুলি ইউক্রেনের জাহাজগুলিকে ছায়ার মতো অনুসরণ করে। ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন যে তারা রুশ আগ্রাসন ঠেকাতে আজভ সাগরে নতুন নৌঘাঁটি করতে যাচ্ছেন। কমান্ড শিপ ‘ডনবাস’ এবং টাগবোট ‘কোরেতস’-কে সেই নৌঘাঁটি তৈরির লক্ষ্যেই সেখানে পাঠানো হয়েছে। সামনের দিনগুলিতে আরও যুদ্ধজাহাজ সেখানে পাঠানো হবে।

ইউক্রেনের নৌবাহিনীর জাহাজের সংখ্যা অতি নগন্য এবং সবই সোভিয়েত আমলে তৈরি। তারপরেও সরু কার্শ প্রণালী পার হয়ে আজভ সাগরে ঢোকার সময় জাহাজগুলি আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে বেশ সাড়া ফেলে। বিশ্লেষকরা বলছেন যে, এই অঞ্চলের সমুদ্রে উত্তেজনা তৈরি হলে এর অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সামরিক ফলাফল সুদূরপ্রসারী হতে পারে। ইউক্রেনের যুদ্ধজাহাজগুলি রাশিয়ার কৃষ্ণ সাগরের নৌবহরের কাছে তুচ্ছ হওয়া সত্ত্বেও কেন এই ছোট্ট জাহাজগুলিকে রাশিয়া এড়িয়ে চলতে পারছে না, তার উত্তর রয়েছে রাশিয়ার কৃষ্ণ সাগরে পৌঁছাবার ইতিহাসের মাঝে। 

রাশিয়া আর কৃষ্ণ সাগরের মাঝে বহুকাল দাঁড়িয়ে ছিল ক্রিমিয়ার খানাতে, যারা কিনা চেঙ্গিস খানের বংশধর। ১৪৭৫ সালে উসমানি খিলাফতের অধীনে ক্রিমিয়ার খানাতের উত্থান হয়। এই খানাতের অধীনে ছিল বর্তমানের ইউক্রেন, ক্রিমিয়া এবং মলদোভা। এই সাম্রাজ্যের উত্তরে থাকা রুশ কসাকদের আক্রমণ ঠেকাতে অত্র এলাকায় উসমানিরা বেশকিছু বড় দুর্গ তৈরি করেছিল। এই আক্রমণের একটা অংশ আসতো ডন নদী বেয়ে নদীপথে। ডন এবং নীপার নদী কৃষ্ণ সাগরে পতিত হয়ে মাসকোভি সাম্রাজ্য বা পরবর্তীতে গঠিত রুশ সাম্রাজ্যের সাথে কৃষ্ণ সাগরের সংযোগ স্থাপন করে। অর্থাৎ ডন এবং নীপার নদীই ছিল রাশিয়ার জন্যে কৃষ্ণ সাগরে পৌঁছানোর সবচেয়ে সহজ উপায়। একারণেই ডন নদীর মুখে ১৪৭৫ সালে উসমানিরা আজভ নামক স্থানে ২’শ কামানের সমন্বয়ে একটা বিরাট দূর্গ তৈরি করে, যাতে রুশরা কৃষ্ণ সাগরে পৌঁছাতে সক্ষম না হয়।

এই দুর্গের উপরে ৩’শ বছরে বহুবার হামলা হয়। অবশেষে ১৭৭৪ সালে যুদ্ধে পরাজয়ের পর উসমানিরা রুশদের হাতে এই দুর্গ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এই দুর্গের সাথে সাথে কার্শ দুর্গও চলে যায় রুশদের হাতে। কার্শ প্রণালী কৃষ্ণ সাগরের সাথে আজভ সাগরের যোগাযোগ স্থাপন করেছে। আজভ সাগর হলো চারিদিকে ঘেরা একটা অগভীর সাগর। ডন নদী দিয়ে আসা জাহাজ প্রথমে আজভ সাগরে ঢোকে; এরপর কার্শ প্রণালী দিয়ে কৃষ্ণ সাগরে বের হয়। অর্থাৎ ডনের মুখে আজভ দুর্গ রুশদের হাতে থাকলেও কার্শ দুর্গ বা কার্শ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে না যাওয়া পর্যন্ত রুশ জাহাজ কৃষ্ণ সাগরে বের হতে সক্ষম হবে না। কার্শ দুর্গ হলো ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সর্ব-পূর্বে। ক্রিমিয়া উপদ্বীপ আবার অতি সরু স্থলপথের মাধ্যমে ইউক্রেনের মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত। ভৌগোলিক বাস্তবতায় ক্রিমিয়া উপদ্বীপ কৌশলগত কারণেই এই এলাকার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ স্থলভাগ। এই উপদ্বীপ যার হাতে থাকবে, সে-ই কৃষ্ণ সাগরের উত্তর উপকূলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ১৭৭৪ সালে ক্রিমিয়ার খানাতেকে স্বাধীন ঘোষণা করিয়ে রুশরা একে নিজেদের প্রভাবে নিয়ে নেয়। ১৭৮৩ সালে রুশরা ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখলে নিয়ে নেয় এবং প্রথমবারের মতো কৃষ্ণ সাগরে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করে। ১৭৮৮ সালে রুশরা ইউক্রেনে প্রথম যুদ্ধজাহাজ তৈরি শুরু করে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ইউক্রেন রাশিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাবার পর ক্রিমিয়া উপদ্বীপও ইউক্রেনের অংশ হয়ে যায়। সাথে সাথে কৃষ্ণ সাগরে নিজেদের অবস্থান নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে রাশিয়া। ইউক্রেন হাতছাড়া হবার পর ইউক্রেনের শিপইয়ার্ডগুলিও হারায় রাশিয়া। এরপর থেকে ভলগা নদীতে রুশ যুদ্ধজাহাজ তৈরি হয়ে ডন-ভলগা খাল হয়ে ডন নদী-আজভ সাগর-কার্শ প্রণালী পাড়ি দিয়ে কৃষ্ণ সাগরে পৌঁছাচ্ছে। রুশরা সোভিয়েত কৃষ্ণ সাগর নৌবহরের প্রায় পুরোটাই পেলেও এই নৌবহরের মূল ঘাঁটি সেবাস্তোপোল ক্রিমিয়া উপদ্বীপে অবস্থিত হওয়ায় রাশিয়া নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে। রাশিয়া থেকে ক্রিমিয়া উপদ্বীপে যাওয়া যেত কার্শ প্রণালীতে ফেরির মাধ্যমে। ২০১০ সালের নভেম্বরে ইউক্রেনের রুশ-সমর্থিত প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের সরকার রুশ সহায়তায় কার্শ প্রণালীর উপর দিয়ে একটা সেতু তৈরি করে ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার সাথে স্থলপথে যুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। কিন্তু ২০১৪ সালে ইউক্রেনে মার্কিন-সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় আসায় এবং ইউক্রেনের পূর্বে রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ শুরু হবার পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ক্রিমিয়াকে জোরপূর্বক অধিকার করে এই সেতু বানাবার প্রকল্প নেন। এবছরের মে মাসে রাশিয়ার দীর্ঘতম ১৮ কিঃমিঃ-এর বেশি দীর্ঘ এই সড়ক-সেতুর উদ্বোধন করেন পুতিন। এর সমান্তরালে রেল সেতুর নির্মাণকাজ এখনও চলমান। এই সেতু তৈরির পর থেকে এর নিচ নিয়ে ৩৫ মিটারের বেশি উঁচু জাহাজ যেতে পারে না। এই সেতুর নিরাপত্তা দেবার জন্যে রাশিয়া কিছু সামরিক ইউনিট মোতায়েন করেছে। একইসাথে এই সেতু উদ্ভোধনের পর থেকে রুশরা কঠোরভাবে কার্শ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেয়। ইউক্রেনের বেশিরভাগ পরিবহণ জাহাজকেই রুশরা আটকে রাখে।   

রাশিয়া বিশাল রাষ্ট্র এবং এর সমুদ্র উপকূলও বিশাল। তবে দেশটার বেশিরভাগ সমুদ্রতটই উত্তরের বরফাবৃত অঞ্চলে, যেখানকার বন্দরগুলি বছরের অনেকটা সময় বরফ থেকে মুক্ত নয়। বাল্টিক সাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরের বন্দরগুলিতেও বরফ থাকে। তাই বরফমুক্ত সমুদ্রবন্দর রাশিয়ার জন্যে সর্বকালের আকাঙ্খা। কৃষ্ণসাগর রাশিয়াকে তেমনই বরফমুক্ত বন্দরের আশা যুগিয়েছে গত দু’শ বছরের বেশি সময় ধরে। কিন্তু ইউক্রেন আলাদা হবার পর থেকে, এবং ২০১৪ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কৃষ্ণ সাগরের অবস্থান হারাবার সেই পুরোনো ভয় পেয়ে বসেছে রাশিয়াকে। তাই ইউক্রেন নৌবাহিনীর দু’টা পুরোনো জাহাজও রাশিয়াকে বিচলিত করতে সক্ষম হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ইউক্রেনের সমর্থনে রাশিয়াকে কার্শ প্রণালীর সমুদ্রপথে বাধা সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়েছে। একইসাথে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে আজভ সাগরে শক্তি বৃদ্ধি করতে সামরিক সহায়তা দেয়ার আভাস দিয়েছে। তবে ভূরাজনৈতিক গবেষণা সংস্থা ‘স্ট্রাটফর’ বলছে যে, স্বল্পমেয়াদে অত্র অঞ্চলের নৌ-শক্তির ব্যালান্স পরিবর্তন করতে পারাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে সম্ভব হবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা বন্ধুরা কার্শ প্রণালীর মাঝ দিয়ে ‘ফ্রিডম অব ন্যাভিগেশন অপারেশন’ চালনা করতে উদ্যত হলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। এমনটা ঘটলে রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব নতুন মোড় নেবে।          

লেখক: ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক