‘জোকার’ বনে যাওয়া ট্রাম্পকে রুখতে হবে এশিয়াকেই

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৬ আশ্বিন ১৪২৫

‘জোকার’ বনে যাওয়া ট্রাম্পকে রুখতে হবে এশিয়াকেই

পরিবর্তন ডেস্ক ৫:৪৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৮

‘জোকার’ বনে যাওয়া ট্রাম্পকে রুখতে হবে এশিয়াকেই

বর্তমান সংস্কৃতির যে চরিত্রটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধকে ব্যাখ্যা করতে পারে সেটি হলো হিথ লেজার অভিনীত ‘দ্য ডার্ক নাইট’ সিনেমার জোকার।

২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া ব্যাটম্যান সিরিজের ব্লকবাস্টার সিনেমাটিতে জোকারের বর্ণনা করতে গিয়ে একটি চরিত্র বলে, ‘কিছু মানুষ থাকে, যারা যুক্তিযুক্ত কোনো কিছু, যেমন টাকা, খোঁজে না। এদেরকে কেনা যায় না, ভয় দেখানো যায় না, বুঝানো যায় না বা এদের সঙ্গে আলোচনা করা যায় না। এমন কিছু মানুষ থাকে যারা পৃথিবী পুড়তে দেখতে পছন্দ করে।’

এই বক্তব্যের বেশিরভাগ কথাই ‘আমেরিকা প্রথম’ শ্লোগান দেয়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে হোয়াইট হাউজকে তিনি তার পরিবারের এটিএম মেশিনে পরিণত করায়, ট্রাম্প ‘টাকা’ চান না এটা বলা যাবে না। কিন্তু পররাষ্ট্র নীতি, ও অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে পৃথিবী জ্বালিয়ে দেয়ায় ট্রাম্পের গভীর আসক্তি ঠিক জোকারের মতোই।

শুক্রবার ট্রাম্প চীনের ওপর সার্বিক শুল্ক আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা একটি জ্বলন্ত আগুনকে আরও উস্কে দিচ্ছে। এটা বেশ আশঙ্কাজনকও। কেউ কেউ বলছেন ‘আমেরিকাকে আবার মহান’ করে তুলতে ট্রাম্পের কৌশল অন্যান্য দেশের অর্থনীতিকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, যা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ ঘটনা ঘটার সময়টাও কাকতালীয় নয়। ডিফেন্স রেডিনেস কন্ডিশন (ডেফকন) অর্থাৎ দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সতর্ক অবস্থার প্রাথমিক ধাপের দিকে ট্রাম্প এমন সময়ে উপনীত হতে যাচ্ছেন যখন তার শাসনকাল নিয়ে লেখা বব উডওয়ার্ডের বই বেস্ট সেলারের তালিকায় হৈচৈ ফেলে দিয়েছে। ‘ফিয়ার’ নামের বইটিতে দেখানো হয়েছে নিয়ন্ত্রনহীণ একটি প্রশাসন অকারণ ভীতি এবং প্রতিশোধস্পৃহা দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, কোনো সুস্থির পরিকল্পনা দ্বারা নয়।

আমেরিকার সবচেয়ে সম্মানিত অনুসন্ধানী সাংবাদিক উডওয়ার্ড কার্যত ট্রাম্পকে ভণ্ড বলে অভিহিত করায় তিনি গত সপ্তাহে ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। একই সঙ্গে গত সপ্তাহে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার সম্পাদকীয় কলামে হোয়াইট হাউজের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বেনামে একই রকম মতামত পোষণ করেন। শুক্রবার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক বক্তব্যে ‘বিপদজনক সময়’ তৈরির জন্য ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

তর্কের খাতিরে বলা যায়, ওবামা ব্যাটম্যানের মতো উড়ে এসে বিশ্ব ব্যবস্থার ওপর ট্রাম্পের আক্রমণকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। কিন্তু এশিয়ার কি এতে সহায়তা দেয়ার সময় আসে নি?

ওয়াশিংটনের রিপাবলিকান নেতাদের মতোই এশিয়ার নেতারাও টুইটারে ঝড় তোলা ট্রাম্পের সঙ্গে লড়াইয়ে বিতৃষ্ণা বোধ করেন। তাদের একটা ভয়, ট্রাম্প হয়ত সকাল সকাল টুইটারে তাদের বকতে শুরু করবেন। আরেকটা ভয় হচ্ছে, ট্রাম্প হয়ত তাদেরকে চীনের মতোই প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে শুল্ক আরোপ করবেন।

কিন্তু এতে করে ওই অঞ্চলের অবস্থাটা কী দাঁড়িয়েছে? জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ২০১৬ সালের নভেম্বরে আগাম নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তড়িঘড়ি নিউইয়র্কে ট্রাম্প টাওয়ারে গিয়ে তাকে সম্মান প্রদর্শন করে এসেছেন। ওই দিন আবে ট্রাম্পকে একজন ‘বিশ্বস্ত নেতা’ হিসেবে অভিহিত করে তাকে সাধারনের কাতারে নিয়ে আসেন।

কিন্তু জাপানের অর্থনীতির প্রধান ব্যক্তিরা এখন হয়ত ট্রাম্পকে ‘বিশ্বস্ত’ বলে আখ্যায়িত করবে না। ট্রাম্প জানিয়েছেন তিনি চীনের আমদানি পণ্যের ওপর ২০০ বিলিয়ন ডলারের শুল্ক আরোপ করবেন। অচিরেই এই সংখ্যা ৫০৫ বিলিয়নে গিয়ে ঠেকতে পারে। ২০১৭ সালে চীন থেকে ওই মুল্যমানের পণ্য আমেরিকায় গিয়েছিল। এটা ‘আবেনমিকস’ বা চিরতরে মূল্যস্ফীতি বন্ধে টোকিওর পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার জন্য একটা বড় ধাক্কা।

দক্ষিণ কোরিয়ার মুন জায়ে ইনও একই রকম দুঃখের গল্প শুনাতে পারেন। ২০১২ সালে স্বাক্ষরিত একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তির শর্ত ফের আলোচনার জন্য ট্রাম্প চাপ দিলে তিনি তা মেনে নেন। মুন ট্রাম্পকে বিশ্বাস করে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বৈরিতার অবসানে নেয়া পরিকল্পনায় তাকে অন্তর্ভুক্ত করেন। কিন্তু এসব কিছু ভেস্তে যেতে পারে, কারণ ট্রাম্প শুল্ক আরোপ বাড়িয়েই চলেছেন এবং হোয়াইট হাউজ পিয়ঙইয়ংয়ের সঙ্গে নতুন করে বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে।
এসবের ফলে সিঙ্গাপুর থেকে ফিলিপাইন থেকে তাইওয়ান হয়ে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা ট্রাম্পের মিত্ররা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়েছে। এটা ওই অঞ্চলের সব দেশগুলোকে সংঘবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করার কারণ হয়ে উঠতে পারে। নভেম্বর মাসে অ্যাসোসিয়েশন অফ সাউথ-ইস্ট এশিয়ান নেশনস ও এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কোঅপারেশন ফোরামের বৈঠক রয়েছে। এশিয়া নভেম্বর মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে। ট্রাম্প ওইসব সম্মেলনের কোনটাতেই থাকবেন না। তবে এসব সম্মেলন যত দ্রুত হয় ততই ভালো।

কিন্তু, এশিয়া অঞ্চলের নেতারা বা অর্থমন্ত্রীরা কেন জরুরী বৈঠক ডাকছেন না বা কনফারেন্স কল-এ বসছেন না? ট্রাম্পের নাম ধরে সমালোচনা করতে না চাইলেও, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একটি যৌথ বিবৃতিতে দ্ব্যর্থহীনভাবে ওয়াশিংটনের নির্লজ্জ বেনিয়া মনোভাবের সমালোচনা করতে পারেন। আবে, মুন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়েরও এতে স্বাক্ষর করা উচিৎ।

হোয়াইট হাউজের ‘জোকার’-এর জানা উচিৎ, তিনি বিশ্বায়নের যে প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিতে চাইছেন, এশিয়া ওই বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার শক্তি যোগাচ্ছে। এই বিষয়টি এড়ানোর চেষ্টা করলে চলবে না। বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ভস্মীভূত হয়ে যেতে না দেখে এখন ওই আগুন নেভাতে এশিয়ার এগিয়ে আসার সময় হয়েছে।

[এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত উলিয়াম পেসেকের ‘As Trump goes full Joker, Asia must fight back’ শিরোনামের কলামটি অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ মামুনূর রশিদ। পেসেক একজন টোকিওভিত্তিক সাংবাদিক ও লেখক। তিনি এশিয়ার বাণিজ্য, অর্থনীতি, বাজার, ও রাজনীতি বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ।]

এমআর/এএসটি