কানাডাকে বকে কাকে শাসাচ্ছে সৌদি আরব?

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

কানাডাকে বকে কাকে শাসাচ্ছে সৌদি আরব?

মোহাম্মদ মামুনূর রশিদ ৬:২৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৯, ২০১৮

কানাডাকে বকে কাকে শাসাচ্ছে সৌদি আরব?

সৌদি আরব ও কানাডার মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েনের চূড়ান্ত রূপ দেখা গেছে চলতি সপ্তাহে। সৌদি আরব তার দেশে নিযুক্ত কানাডার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করে। এরপর কানাডাতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের দেশে ফিরিয়ে আনে। দেশটির সঙ্গে সব ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।

তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরবের এমন সিদ্ধান্তে বিশ্লেষকরাও চমকে গেছেন। তারা বলছেন, কেন হঠাৎ করেই সৌদি বাদশা এমন চটে গেলেন? সত্যি সত্যি সম্পর্কের টানাপোড়েন নাকি উত্তর আমেরিকার দেশটিকে বকে দিয়ে গোটা বিশ্বকে শেখানোর চেষ্টা করছে তারা?

একসারি টুইটে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি আরবে বন্দি মানবাধিকার কর্মীদের মুক্তির আহ্বান জানানোয় তাদের মধ্যে কূটনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে।

কিন্তু, কাতারের সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এটা কানাডার বিবৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বরং অন্য কোনো দেশ সৌদির মানবাধিকার নিয়ে মন্তব্য করলে তার ফল কি হতে পারে, তার নমুনা দেখাতেই কানাডার বিরুদ্ধে এসব পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটি।

জোসেফ  করবেল স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক নাদের হাসেমিও এমনটিই মনে করেন।

তিনি বলেন, ‘এটা বেশ স্পষ্ট যে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কানাডাকে ব্যবহার করে বাকি দুনিয়ার কাছে এই বার্তাই পাঠাচ্ছে, সৌদি আরবের সঙ্গে ব্যবসা করতে চাইলে মানবাধিকার নিয়ে কথা বলা বন্ধ রাখ।’

কানাডার সঙ্গে কূটনৈতিক সংকটের মূল কারণ সালমান নিজে, এমনও মন্তব্য করেন নাদের হাসেমি।

তিনি আরও বলেন, ‘এমবিএস হিসেবে পরিচিত সৌদি যুবরাজ নিজের ক্ষমতার প্রভাবে মত্ত, দাম্ভিক ও তারুণ্যের সরলতায় ভুগছেন। তিনি মনে করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার আয়ত্ত্বে রয়েছেন এবং তিনি যা খুশি তাই করতে পারবেন।’

২০১৫ সালে ক্রাউন প্রিন্স হওয়ার পর থেকেই মোহাম্মদ বিন সালমান দেশে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি তার বিদেশনীতিকে আরও আক্রমণাত্মক করে তুলেছেন।

ইয়েমেনের ভয়াবহ যুদ্ধ, কাতারের ওপর অবরোধ, সৌদি রাজপরিবারের কয়েক ডজন সদস্যকে আটক এবং লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে পদত্যাগে বাধ্য করানোর ‘প্রধান পরিকল্পনাকারী’ মনে করা হয় বিন সালমানকে।

বিভিন্ন দেশ সৌদি আরবের সঙ্গে কী রকম আচরণ করবে, তার নতুন নিয়ম চালু করতেই তা বুঝিয়ে দিতেই কানাডার সঙ্গে দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করছেন বিন সালমান, মন্তব্য করেন হাসেমি।

সৌদি আরবে বন্দি মানবাধিকারকর্মী সামার বাদাউইসহ অন্যান্যদের মুক্তির আহ্বান জানিয়ে সম্প্রতি কানাডা একটি বিবৃতি দেয়।

 

এর প্রতিক্রিয়ায় গত সোমবার সৌদি আরব অভিযোগ করে, কানাডা তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘অশোভন হস্তক্ষেপ’ করছে।

তবে কানাডার মন্তব্যকে অস্বাভাবিক কিছু বলে মনে করেন না থমাস ইউনিভার্সিটি অফ অটোয়ার সহকারী অধ্যাপক থমাস জুনো। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ।

থমাস জুনো মনে করেন, কানাডার এই মন্তব্যের কারণে দেশটির বিরুদ্ধে পুষে রাখা ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ পেয়েছে সৌদি আরব।

এই ক্ষোভের মূল কারণ, কানাডার সঙ্গে সৌদির ১১ বিলিয়ন ডলারের (৯৩ হাজার কোটি টাকা) অস্ত্র চুক্তি। কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এ পরিকল্পনা করেন এবং অনুমোদন দেন। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বেশ চুপিসারে এতে স্বাক্ষর করেন।

এরপর থেকেই কানাডার মানবাধিকারকর্মীদের তোপের মুখে রয়েছেন ট্রুডো। এই চুক্তির সমর্থনে বিবৃতি দিতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি। কানাডার সরবরাহ করা অস্ত্র সৌদি আরব কিভাবে ব্যবহার করবে মিডিয়া ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো সে সম্পর্কে জানতে খুবই উৎসুক।

জুনো মনে করেন, এই নেতিবাচক প্রচারণার ফলে এবং কানাডার সরকার সৌদিকে বাঁচানোর জন্য কিছু না করায়   গত দুই বছরে সৌদি আরবের মধ্যে হতাশা ও বিরক্তি তৈরি হয়েছে।

‘তারা আশা করেছিল, কানাডার সরকার সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা ও দৃঢ় করতে আরও উদ্যোগী হবে। কিন্তু, মোটেও সে রকম কিছু ঘটেনি,’ যোগ করেন তিনি।

একইসঙ্গে, কানাডায় অবস্থানরত সৌদি শিক্ষার্থীদের এক মাসের মধ্যে দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে সৌদি আরব। কর্তৃপক্ষ তাদের অন্য কোনো দেশে পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সৌদি আরব থেকে ২০১৫ সালে ১১ হাজার ৬৫০ জন দীর্ঘ মেয়াদে পড়াশোনার জন্য কানাডার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। একই বছর ৫ হাজার ৬২২ জন্য স্বল্প মেয়াদে পড়ালেখার জন্য কানাডা যান।

কানাডার হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন সৌদি আরবের রোগীদের অন্য দেশে স্থানান্তরের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে দেশটি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, কানাডা সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যস্থতায় সৌদির সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাইছিল। কিন্তু, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবাইর প্রকাশ্যেই এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।

রিয়াদে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘এখানে মধ্যস্থতার কিছু নেই। একটা ভুল হয়ে গেছে এবং ওই ভুল সংশোধন করতে হবে।’

গতকাল বুধবার কানাডার সৌদি দূতাবাস এক টুইটে জানায়, সৌদি সরকার কানাডার বিরুদ্ধে আরও পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবছে।

কানাডা এই পরিস্থিতি কিভাবে সামাল দিবে তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জুনো মনে করেন, বিন সালমান খুব তাড়াতাড়ি এই পদক্ষেপ প্রত্যাহার করবেন না।

তিনি আরো বলেন, ‘পরিস্থিতি শিগগিরই পাল্টে যাওয়ার বিষয়ে আমি আশাবাদী হতে পারছি না। কারণ, এমবিএস ইয়েমেন বা কাতার বা অন্য কোনো বিষয়ে তার আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকে একটুও সরেনি।’

একইভাবে অধ্যাপক হাসেমি মনে করেন, কেবলমাত্র কানাডা বা সৌদি আরব তাদের অবস্থান থেকে সরে আসলেই এই সংকটের সমাধান হতে পারে। কিন্তু, কানাডা যদি তাদের অবস্থান থেকে সরে যায়, তাহলে নিজেদের আর লিবারেল ডেমোক্রেসি হিসেবে দাবি করতে পারবে না।

কানাডায় আগামী বছর ফেডারেল ইলেকশন হবে। প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো চাইবেন না, আপাতত সৌদি আরবের জন্য নিজের জনগণও চটিয়ে দিতে।

আবার এমবিএস এই পরিস্থিতিতে অনেক বেশি জড়িয়ে পড়েছেন বলে মনে করেন হাসেমি। তার মতে, ‘বিন সালমান এখানে তার মন মতো শাসন করতে পারবেন এবং অন্যান্য দেশগুলো তার মতের সমালোচনা করার আগে দু’বার ভেবে দেখবে।’

সুতরাং, খুব শিগগিরই সৌদি আরব ও কানাডার মধ্যকার সংকট সমাধানের কোনো আশা নেই বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এমআর/আইএম