ইউরোপের যুদ্ধে যোগ দিবে আমেরিকা?

ঢাকা, বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৮ | ৮ কার্তিক ১৪২৫

ইউরোপের যুদ্ধে যোগ দিবে আমেরিকা?

মোহাম্মদ মামুনূর রশিদ ৭:২৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৯, ২০১৮

ইউরোপের যুদ্ধে যোগ দিবে আমেরিকা?

গত বছর একটি প্রবন্ধে জিজ্ঞেস করেছিলাম 'ন্যাটো কি যুদ্ধে জড়াবে? যদি জড়ায় তাহলে কিসের জন্য জড়াবে?' কিন্তু এখন সম্ভবত সঠিক প্রশ্নটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর হয়ে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে কিনা।

এটা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

ন্যাটোর বেশিরভাগ কৌশল নির্ধারক ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন রাশিয়া ও তার পশ্চিমের প্রতিবেশীদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধক্ষেত্র হবে বাল্টিক দেশগুলো (এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুনিয়া) অথবা পোল্যান্ড। সেখানে সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা সুয়াল্কি গ্যাপ, যা লিথুনিয়া ও পোল্যান্ডের সীমান্তে ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি এলাকা। এটা বেলারুশের কনাস শহর ও রাশিয়ার ছিটমহল কালিনিনগ্রাদ ওব্লাস্টের মধ্যে অবস্থিত।

কৌশলগত কারনে কালিনিনগ্রাদ রাশিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তারা সেখানে সম্প্রতি ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্রের মজুদ বাড়িয়েছে।

বেলারুশ রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং সম্ভবত তারা রাশিয়ার সৈন্যদেরকে তাদের ভূখণ্ডে জড়ো হয়ে সেখানে কার্যক্রম পরিচালনা করতে দিবে। একইভাবে এস্তোনিয়া ও লাটভিয়ারও সীমান্ত রয়েছে রাশিয়ার সঙ্গে।

এস্তোনিয়ার ক্ষেত্রে, রাশিয়ার সেনাবাহিনী দেশটির বিরুদ্ধে খুব সহজেই জমায়েত হতে পারে আবার বেলারুশ থেকেও এস্তোনিয়াকে আক্রমণ করতে পারে। তাহলে কালিনিনগ্রাদের সঙ্গে স্বয়ং রাশিয়ার সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে।

কালিনিনগ্রাদ এখন ৮৭% রাশিয়ান

কালিনিনগ্রাদ আগে কনিসবার্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৪৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি পটসড্যাম সম্মেলনে এটা রাশিয়াকে দেয়ার বিষয়ে সম্মত হন। এটা ছিল পূর্ব প্রুশিয়ার রাজধানী এবং এটি মূলত জার্মানি অধ্যুষিত এলাকা। কিন্তু রাশিয়ানরা বেশিরভাগ জার্মানদের তাড়িয়ে দেয়ায় এখন সেখানে ৮৭ শতাংশ লক রাশিয়ান ও ০.৪ শতাংশ জার্মান।

বাল্টিক দেশগুলো এবং পোল্যান্ড তাদের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য রাশিয়া দারুণভাবে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। জুন মাসে এই দেশগুলোর নেতারা তাদের পাওয়ার গ্রিড (বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা) ২০২৫ সালের মধ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে স্থানান্তরের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর কারণ হচ্ছে, তারা আশঙ্কা করছেন ভবিষ্যতে রাশিয়া এই দেশগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা বন্ধ করে দিতে পারে।

কালিনিনগ্রাদের কী হবে তা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি এবং এটা নিয়ে তারা সম্ভবত রাশিয়ার সাথে আলোচনা করবে।

এখন পর্যন্ত রাশিয়া কখনো বিদ্যুৎ সরবরাহ  বন্ধ করেনি এবং বিদ্যুৎ রপ্তানি দেশটির আয়ের একটি অন্যতম উৎস। পাওয়ার গ্রিড সরিয়ে নেয়ার পর কালিনিনগ্রাদ ত্যাগ করতে বললে রাশিয়া তা পছন্দ নাও করতে পারে। নতুন চুক্তি অনুযায়ী, হাই-ভোল্টেজ বিদ্যুতের তার সরাসরি নেয়া হবে বাল্টিক সাগরের নিচ দিয়ে।  এটা কালিনিনগ্রাদে রাশিয়ার জলসীমার ঠিক বাইরে থাকলেও রুশরা এটা খুব সহজেই কেটে দিতে পারবে।

মধ্যস্থতাকারীরা মনে করেন, কালিনিনগ্রাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইইউয়ের সাথে আলোচনা করতে হবে রাশিয়াকে।

পাওয়ার গ্রিড ইউক্রেনের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। রাশিয়া চাইলে সাইবার আক্রমণ চালিয়ে ইউক্রেনের কয়েকটি পাওয়ার স্টেশন অকেজো করে দিতে পারত। এছাড়া ক্রাইমিয়াতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা রাশিয়ার জন্য একটি কৌশলগত লক্ষ।

একই সঙ্গে লক্ষণীয়, পশ্চিমের অবরোধ এড়াতে জার্মানির প্রতিষ্ঠান সিমেন্স সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সেখানে পাওয়ার জেনারেটর সরবরাহ করেছিল।

বিদ্যুৎ চুক্তির জন্য বাল্টিক দেশগুলোতে সংঘাতের সম্ভাবনা

নতুন এই বিদ্যুৎ চুক্তি বাল্টিক দেশগুলোর অনুতাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

রাশিয়া কালিনিনগ্রাদে ইস্কান্দার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে এবং তাও প্রথমবার নয়।  এসএস-২৬ স্টোন হিসেবে সাধারণ বা পরমাণু অস্ত্র নিয়ে ৩০০ মেইল দূরে আঘাত হানতে পারে। সেই সঙ্গে, বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা গেছে  রাশিয়া ওই এলাকায় সামরিক ঘাঁটি আরও শক্তিশালী করছে এবং অস্ত্র মজুদের জায়গা উন্নত করছে।

ন্যাটো হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার বা মিশ্র যুদ্ধের সম্ভাবনায় উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে বাল্টিক দেশগুলোতে এমন যুদ্ধের সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ সেখানে প্রায় ১০ বেশি লাখেরও জাতিগত রুশ অবস্থান করছে। এদের অনেকেই সেখানকার নাগরিক নন এবং তারা নিজেদের রুশ পাসপোর্ট সঙ্গে রেখেছেন।

হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার দিয়ে জাতিগত বা রাজনৈতিক বা সামরিক সংঘাত বুঝায়। পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলে এখন এমন যুদ্ধ চলছে। সেখানে রাশিয়াপন্থি বিছিন্নতাবাদিরা ডনেটস্ক অ্যান্ড লুহান্‌স্ক পিপলস রিপাবলিক নামে একটি দেশ গঠন করেছে। রুশ স্বেচ্ছাসেবীরা স্থানীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দেয়; রাশিয়ার সৈন্যরাও সক্রিয়ভাবে তাদের সহায়তা করে। এসব সহায়তার মধ্যে রয়েছে কুখ্যাত 'বাক' ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অস্ত্র যোগান দেয়া।

বাল্টিক দেশগুলোর সামরিক দুর্বলতা

বাল্টিক দেশগুলো সামরিকভাবে দুর্বল এবং রাশিয়ার সেনাবাহিনীর আক্রমণ সম্ভবত তারা ঠেকাতে পারবে না।

সেখানে যুদ্ধ বাঁধলে ন্যাটো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও পোলান্ড, কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, কিন্তু কয়েকটি কারণে তা করা খুব কঠিন হবে। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে ন্যাটোর সৈন্যের যোগান বজায় রাখা এবং ন্যাটোর অস্ত্রের বৈসাদৃশ্য।  সত্যিকারের যুদ্ধে কয়েক ঘণ্টার বেশি টিকে থাকতে হলে জার্মানির লেপার্ড-২ ট্যাঙ্কগুলোর যন্ত্রাংশের যোগান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে, রাশিয়া নিশ্চিতভাবেই ন্যাটোর বাহিনীকে সমবেত করা ও রশদ পৌঁছানোর জন্য ব্যবহৃত সামরিক ঘাঁটি, বিমান ঘাঁটি, ও বন্দরগুলো বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করবে। এসবের পরও, ন্যাটোর সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্রে বিশাল প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হবে।

জাতিগত রুশ ও রুশ স্বেচ্ছাসেবকদের দাঙ্গার কারণে সেখানে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একারণে সেখানে হস্তক্ষেপ অত্যন্ত সমস্যা সংকুল হতে পারে। কিন্তু, ন্যাটো চার্টারের বিখ্যাত 'অণুচ্ছেদ ৫'-এর যৌথ প্রতিরক্ষার বিধানের কারনে সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

ন্যাটোর সদস্যরা, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র, কী ডনবাসের মতো আরও একটি দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী ও জটিল সংঘাতে জড়াতে চাইবে? রাশিয়া আগে থেকেই এমন যুদ্ধ চালিয়ে আসছে। ইউক্রেনের জটিল সংঘাতে ইউরোপ কিছুটা ভূমিকা রাখলেও, ন্যাটোর কোনো দেশ ইউক্রেনীয়দের রক্ষায় তেমন কোনো ভূমিকা রাখেনি। ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিতে চেয়েও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

ন্যাটো-বিরোধী মনোভাব, জার্মানি নিয়ে সন্দেহ

লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও বড় সমস্যা হচ্ছে, সেখানে হাইব্রিড যুদ্ধ শুরু হলে বা ওই দেশগুলো রুশদেরকে উত্তেজিত করলে তাতে যোগ দেয়ার কারণ খুঁজে বের করা। ওয়াশিংটন এখন ন্যাটো বা ইউরোপের দেশগুলোর প্রতি খুব বেশি বন্ধুভাবাপন্ন নয়। ইউরোপীয়রা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করায় এবং অস্পষ্ট ম্যান্ডেট নিয়ে ইউরোপে ন্যাটোর আলাদা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করায় এই দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

এরপরও এসবের অন্তরালে সত্যিকারের সমস্যাটি হচ্ছে, রাশিয়া গ্যাসের চাবি বন্ধ করে দিয়ে ন্যাটোর সহযোগী দেশগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দিতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড যেমনটি বলেছেন, জার্মানি শিল্প কারখানা চালানো, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ঘর গরম রাখতে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভর করে। পোল্যান্ড বা বলকান দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ করতে চাইলেও কৌশলগতভাবে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী জার্মানি তা করবে না।

জার্মানিকে না পেলে যুক্তরাষ্ট্র বলকান দেশগুলো বা পোল্যান্ডকে সাহায্য দিতে পারবে না, কারণ জার্মানি একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। ন্যাটোর অণুচ্ছেদ ৫- অনুযায়ী শতভাগ ঐকমত্যে পৌঁছতে না পারলে এটা করা সম্ভবও নয়। এক্ষেত্রে জার্মানি একটি বাস্তব সমস্যা এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

ন্যাটোর ভাবভঙ্গীতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না করলে ও মিত্রদেশগুলোর আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের কোনো যুদ্ধে যাবে না কারণ: ন্যাটো তা সমর্থন করবে না; জার্মানি সম্ভবত সহযোগিতা করবে না; এবং যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ সম্ভবত রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর কোনো ফায়দা খুঁজে পাবে না।

[মূল: এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত স্টিফেন ব্রায়েনের 'Would America fight in northern Europe? A question for NATO-এর অনুবাদ]

এমআর/এএসটি