বামপন্থী ওব্রাদোরের বিশাল জয়ে কোন পথে মেক্সিকো?

ঢাকা, শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮ | ৬ শ্রাবণ ১৪২৫

বামপন্থী ওব্রাদোরের বিশাল জয়ে কোন পথে মেক্সিকো?

মোহাম্মদ মামুনূর রশিদ ৬:১৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ০২, ২০১৮

print
বামপন্থী ওব্রাদোরের বিশাল জয়ে কোন পথে মেক্সিকো?

আঠারো বছর ক্ষমতার রাজনীতির পর, রোববার বামপন্থী প্রার্থী আন্দ্রেস মানুয়েল লোপেজ ওব্রাদোরকে বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করে মেক্সিকানরা বুঝিয়ে দিল যথেষ্ট হয়েছে।

প্রাথমিক গণনায় দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি ভোট পেয়েছেন ওব্রাদোর। বিশ বছর আগে মেক্সিকোতে গণতন্ত্র চালু হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি ভোট ব্যবধানে বিজয়ী প্রেসিডেন্ট হলেন তিনি।

লোপেজ ওব্রাদোরের অবিশ্বাস্য বিজয়ের মনে রাখার মতো পাঁচটি বিষয় এবং এর ফলে দেশটির ভবিষ্যত কী হতে পারে তাই নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা।

স্থিতিশীল অবস্থা প্রত্যাখ্যান

ক্ষমতার রাজনীতি জনগণ বর্জন করায় তা থেকে ওব্রাদোরের সুবিধা আদায় করার সক্ষমতা বুঝকে হলে মেক্সিকোর সাম্প্রতিক নির্বাচনী ইতিহাস বুঝতে হবে।

প্রেসিডেন্ট এনরিকে পেনা নিয়েটোর ইন্সটিটিউশনাল রেভলুশনারি পার্টি (পিআরআই) ১৯২৯ সাল থেকে ২০০০ সাল থেকে মেক্সিকোর রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। এরপর ভিসেন্ত ফক্সের নেতৃত্বে কনজারভেটিভ ন্যাশনাল পার্টি (পিএএন) তাদের সরিয়ে ক্ষমতায় আসে।

সত্তুর বছর একক দলের শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন দল আসায় মেক্সিকানদের মনে ব্যাপক আশার সঞ্চার হয়েছিল, কিন্তু অচিরেই তাদের হতাশ হতে হয়। নতুন সরকারের ছয় বছরে দারিদ্র্য ও বলগাহীন দুর্নীতিতেই ছেয়ে থাকে দেশটি।

২০০৬ সালে পিএএন আবার নির্বাচিত হলেও, প্রেসিডেন্ট ফেলিপে ক্যাল্ডেরন মাদক চক্রগুলোর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে দেশটিকে যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দেন। এর পরের দশ বছরে এক লাখ মানুষ মারা গেলেও সেখানে এখন নজিরবিহীন সহিংসতা চলছে।

পেনা নিয়েটো ২০১২ সালে নতুন ও উন্নত পিআরআই দল নিয়ে আবির্ভূত হন। তবে পরে দেখা যায় সেটাও একটা মরীচিকা-  দুর্নীতি, নজিরবিহীন সহিংসতা এবং বৈষম্যে জর্জরিত একটি দল। তাদের সময়ে দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত।

১৮ বছর ধরে একের পর এক হতাশ হয়ে মেক্সিকানরা পরিবর্তনের জন্য ক্ষুধার্ত এবং সম্ভবত তারা একটু প্রতিশোধও নিতে চায়। এ থেকে বুঝা যায়, ভোটাররা কেন ওব্রাদোরকে ২০০৬ এবং ২০১২ সালে প্রত্যাখ্যান করার পর এবার বিপুল ভোটে নির্বাচিত করল।

ট্রাম্প ফ্যাক্টর

রোববার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওব্রাদোরকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, 'আমি আপনার সাথে কাজ করতে ভীষণ আগ্রহী'। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক যখন বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় তখন নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হল বলে মনে করা হচ্ছে।

ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই মেক্সিকোর সমালোচনা করে আসছিল। তিনি সেখান থেকে আসা শরণার্থীদের সমালোচনা করেন, উত্তর আমেরিকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি এবং দুই দেশের মধ্যে দেয়াল নির্মাণের প্রতিজ্ঞা করেন। এমনকি ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তার সাথে একবারও দেখা করেননি পেনা নিয়েটো।

বামপন্থী হলেও, ওব্রাদোরের জাতীয়তাবাদী মনোভাব, জনসমর্থন আদায়ের জন্য ভাষণ এবং যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারনে তাকে ট্রাম্পের সাথে তুলনা করা হয়। তবে সময়ে সময়ে তিনি প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মারমুখী মনোভাব প্রদর্শন করেছেন, এবং মেক্সিকোর স্বার্থ রক্ষায় যে তিনি ট্রাম্পের সাথে সমানে সমান লড়াই চালাবেন তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

মেক্সিকোর বিশাল চ্যালেঞ্জ

যে দূরারোগ্য সমস্যাগুলোর সমালোচনা করে ক্ষমতায় এসেছেন ওব্রাদোর, এগুলোর সমাধান করার ভার এখন তার উপর।

এই সমস্যার মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি। তিনি এই সমস্যার মোকাবেলা কিভাবে করবেন তা নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিস্তারিত জানাননি। তবে তিনি তখন বলেছিলেন, উদাহরণ সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি নেতৃত্ব দিবেন: তার শেখানো সততা ও নৈতিক পরিচ্ছন্নতা তার সরকারের একদম উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে নিচের র‍্যাঙ্ক পর্যন্ত প্রবাহিত হবে এবং দেশটির সংস্কৃতি বদলে যাবে।

একই সাথে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি পাচ্ছেন যথেচ্ছ সহিংসতায় জর্জরিত একটি দেশ, যা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে দুর্বল এবং দুর্নীতিগ্রস্ত একটি নিরাপত্তাবাহিনী। দুই দশক আগে দেশটিতে তথ্য নথিভুক্ত করার নতুন ব্যবস্থা চালু করার পর সেখানে এ বছরের মে মাসে রেকর্ড পরিমাণ খুনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই সময় সীমার মধ্যে ২০১৭ সাল ছিল সেখানে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বছর।

দেশটিতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া দারিদ্র্য ও অসাম্যের অবসান ঘটানোর যে প্রতিশ্রুতি ওব্রাদোর দিয়েছেন তাও তাকে পূরণ করতে হবে। তিনি এমন উন্নয়ন পরিকল্পনা পেশ করেছেন যাতে বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে ব্যাপক হারে ব্যয় বাড়ানো হবে। এসবের মধ্যে রয়েছে পেনশন বৃদ্ধি, শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, এবং বয়স্কদের ভর্তুকি দেয়ার প্রকল্প।

নতুন আকার ধারন করছে মেক্সিকোর রাজনীতি?

লোপেজ ওব্রাদোরের জয়ে কয়েক প্রজন্মের মধ্যে প্রথমবার একজন বামপন্থী মেক্সিকোর কাণ্ডারি হলেন এবং গত দুই দশক ক্ষমতার রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করা দুটি দল পিআরআই ও পিএএন প্রত্যাখ্যাত হল।

এই নির্বাচনের ফলাফল পেনা নিয়েটোর জন্য বিশেষ হতাশাজনক ছিল। তিনি শুধু প্রেসিডেন্টের পদই হারাননি, একই সাথে কংগ্রেসে (সংসদেও) তার ভরাডুবি হয়েছে। তার দল এক সময় মেক্সিকোর রাজনীতিতে অন্যতম শক্তিশালী ছিল। কিন্তু নতুন ফলাফলে দলটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে এবং এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

পিএএনের ভবিষ্যৎ কী হবে তাও ধোঁয়াটে। দলটির প্রার্থী রিকার্ডো আনায়াকে মেক্সিকোর সবচেয়ে কর্মতৎপর ও উচ্চাভিলাষী রাজনীতিবিদ মনে করা হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি নিজেকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।

সতর্কতার সাথে দেখছেন বিনিয়োগকারীরা

ওব্রাদোর যখন নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন তখন থেকেই বলা হচ্ছে তিনি দেশটির অর্থনীতি ডুবিয়ে দিবেন। মিডিয়ায় তাকে ভেনিজুয়েলার সাবেক সমাজতান্ত্রিক নেতা হুগো শ্যাভেজের সাথে তুলনা করা হয়েছে। তাকে একজন চরমপন্থি এবং বিপদজনক নেতা হিসেবে তুলে ধরতে কয়েকটি বিতর্কিত সংবাদ প্রতিবেদনে তার নির্বাচনী প্রচারণায় রাশিয়ার প্রভাব খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়েছে।

শ্যাভেজের সাথে ওব্রাদোরের তুলনা বাড়াবাড়ি এবং রাশিয়ার সাথে তার সম্পর্কের কোনো প্রমাণ নেই। তা সত্ত্বেও, বিনিয়োগকারীদের কাছে ওব্রাদোরকে প্রমাণ করতে হবে যে তার কৌশল ব্যবসা-বান্ধব হবে।

ওয়াশিংটনের উইলসন সেন্টারের পরিচালক ডানকান উড বিনিয়োগকর্তাদের সম্পর্কে বলেন, 'তাদেরকে বিশেষ উৎসাহী বলা যাবে না, কিন্তু তারা এখন অপেক্ষা করছেন কী হয় তাই দেখার জন্য।'

লোপেজ ওব্রাদোর উচ্চাভিলাষী সামাজিক প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করেছেন এই বলে যে, তিনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে সুবিবেচনার পরিচয় দিবেন ও মেক্সিকোর বিখ্যাত কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের স্বাধীনতাকে সম্মান করবেন। জয়ী হওয়ার পর রোববার রাতে ভাষণ দেয়ার সময় তিনি এই প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

কিন্তু সামাজিক প্রকল্পগুলোর টাকা আসবে কোত্থেকে? তার উপদেষ্টারা মনে করছেন, জাতীয় বাজেটের প্রায় ১০% অর্থাৎ প্রায় ২৫০ কোটি ডলার খেয়ে ফেলবে এই প্রকল্পগুলো। ওব্রাদোর সরকারের অপচয় ও দুর্নীতি কমিয়ে এই ব্যয় নির্বাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে তা যথেষ্ট হবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান বিশ্লেষকরা।

মেক্সিকোর জ্বালানি খাত পুনর্গঠনের বিষয়টি তিনি কিভাবে সামলাবেন তাও পর্যবেক্ষণ করবে বিনিয়োগকারীরা। এই শিল্পের বিশাল অংশ বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে এবং তেল খোঁজা ও উৎপাদনে বিনিয়োগের ফলে ৮০০ কোটি ডলার আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ওব্রাদোর তেল শিল্পকে ব্যক্তিমালিকানায় দেয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন। কিন্তু যেসব চুক্তি করা হয়েছে সেগুলো এবং আইনকে তিনি সম্মান করবেন বলে জানিয়েছেন।

এমআর/এএসটি

 
.



আলোচিত সংবাদ