দ্বীপটি ঘিরে কেন ভারতের আগ্রহ?

ঢাকা, শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ | ১ পৌষ ১৪২৫

দ্বীপটি ঘিরে কেন ভারতের আগ্রহ?

আহমেদ শরীফ ৭:০১ অপরাহ্ণ, জুন ২৩, ২০১৮

দ্বীপটি ঘিরে কেন ভারতের আগ্রহ?

পশ্চিম ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দেশ সেইশেল। ছোট হলেও ভূরাজনৈতিক কারণে সাম্প্রতিককালে এর গুরুত্ব ফুলে ফেঁপে উঠছে। গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বাব-এল বান্ডেব প্রণালী এবং পূর্ব আফ্রিকার উপকূলের মোজাম্বিক প্রণালীর মাঝামাঝি হওয়ায় দেশটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শক্তিধর দেশগুলির মাঝে চলছে প্রতিযোগিতা। ১৬ই জুন সেইশেলের প্রেসিডেন্ট ড্যানি ফাউরে ঘোষণা দেন যে, এর আগে ভারতের সাথে করা সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সমঝোতাকে বাতিল করা হয়েছে।

এবছরের ২৭শে জানুয়ারি সেইশেলের পররাষ্ট্র সচিব ব্যারি ফাউরে এবং ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শংকর এক সমঝোতা স্বাক্ষর করেন, যার মূলে ছিল সেইশেলের সর্ব-পশ্চিমের দ্বীপ এসম্পশন আইল্যান্ডে ভারত একটা সামরিক ঘাঁটি তৈরি করবে, যা উভয় দেশ যৌথভাবে ব্যবহার করবে। ‘এশিয়ান এইজ’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এমন সামরিক ঘাঁটি ভারত মহাসাগরে ভারতের প্রভাব বৃদ্ধি করতে এবং চীনের প্রভাব কমাতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আগামী ২৫শে জুন প্রেসিডেন্ট ফাউরের ভারত সফরে আসার কথা রয়েছে। এর মাত্র সপ্তাখানেক আগে এই ঘোষণা দিয়ে ফাউরে তার ভারত সফরকে আলোচনায় নিয়ে আসলেন।

ভারতের সাথে এই সমঝোতাটি যে নড়বড়ে ভিত্তির উপরে ছিল, তা সকলেরই জানা ছিল। সেইশেলের বিরোধী দল এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা ওয়াভেল রামকালাওয়ান অনেক আগে থেকেই সেইশেলে ভারতের সামরিক ঘাঁটির বিরোধিতা করে আসছিলেন। ভারত তার সামরিক ঘাঁটির সপক্ষে জনসমর্থন আদায় করতে রামকালাওয়ানকে তার পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি দেখতে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ভারতে আমন্ত্রণ জানায়। রামকালাওয়ানের প্রপিতামহ ১৮৮৩ সালে ভারতের বিহার রাজ্য থেকে যাত্রা করে প্রথমে মরিশাস, এবং পরবর্তীতে সেইশেলে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। ভারতে তার সফরটি আবেগপূর্ণ হলেও সফরের মাঝেই রামকালাওয়ান পরিষ্কারভাবে বলেন যে, সেইশেলের মাটিতে ভারত কেন, কোনো দেশের সামরিক স্থাপনাই তিনি সমর্থন করবেন না।

ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা রামকালাওয়ানের অবস্থানকে ধরতে পারেননি বলেই সমঝোতা স্বাক্ষরে এগিয়ে যান। ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে সেইশেল সরকার গত মার্চে সমঝোতাটি সংসদে উপস্থাপন করা থেকে বিরত থাকে। কারণ সেই প্রস্তাব সংসদে পাশ হবার কোন সম্ভাবনাই ছিল না।

মে মাসে সেইশেলের সরকারি দলের পত্রিকা ‘দ্য পিপল’এর সম্পাদকীয়তে বলা হয় যে, রামকালাওয়ান ভারত সফরের সময়ে সামরিক ঘাঁটির পক্ষে কথা বলে এখন উল্টা কথা বলছেন। সেইশেলের প্রসিডেন্ট এখন বলছেন যে, এসম্পশন আইল্যান্ডে একটা কোস্টগার্ডের ঘাঁটি স্থাপন করা গুরুত্বপূর্ণ। আর সেটা সেইশেল এখন নিজের অর্থায়নেই করবে। সেইশেলের মতো একটা দেশের মাত্র ১২ বর্গ কিঃমিঃ-এর ছোট্ট একটা দ্বীপ কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল ভারতের কাছে?

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে সেইশেলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভারত মহাসাগরের বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝে।

১১৫টা দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দেশের মোট জনসংখ্যা ১ লাখের মতো। মাত্র ৪’শ ৫৯ বর্গ কিঃমিঃ স্থলভাগ হলেও দেশটার সমুদ্রসীমা প্রায় ১৩ লক্ষ বর্গ কিঃমিঃ বা বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা (১ লক্ষ ১১ হাজার ৬’শ ৩১) থেকে ১২ গুণ বড়। এর উত্তরপূর্বের বার্ড আইল্যান্ড থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমের এসম্পশন আইল্যন্ডের দূরত্ব প্রায় ১ হাজার কিঃমিঃ-এর মতো। দেশটির সমুদ্রসীমা পশ্চিম দিকে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের দেশ তাঞ্জানিয়া, কমরু দ্বীপপুঞ্জ, মাদাগাস্কার, মরিশাস এবং ফরাসী উপনিবেশ মাইয়োত ও রিউনিয়ন দ্বীপের সমুদ্রসীমাকে স্পর্শ করেছে। ১৭৫৬ থেকে ফরাসীরা এখানে উপনিবেশ স্থাপন করলেও ১৭৯৪ সাল থেকে সেইশেল ছিল ব্রিটিশদের অধীনে।

দ্বীপটিতে ব্রিটিশ এবং ফরাসী উভয়ের প্রভাবই লক্ষ্য করা যায়। ১৯৭৬ সালে স্বাধীনতা পাওয়া দেশটার অর্থনীতি পর্যটন এবং মৎস্য আহরণের উপরে নির্ভরশীল। মাথাপিছু গড় আয় ১৬ হাজার ডলারের উপরে হলেও এই দেশে অভাবি লোক কম নেই। তবে মাথাপিছু আয় বেশি হওয়ায় পশ্চিমা দেশগুলির কাছ থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা তেমন একটা আসে না। রামকালাওয়ান ভারত সফরে গিয়ে ভারতের প্রশংসা করে বলেন যে, ইউরোপের মতো ভারত মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। শুধু রামকালাওয়ান নয়, সেইশেলের মানুষদের ভারতের সাথে রাখার লক্ষ্যে গত মার্চে ভারত সেইশেলে পাঁচটি উন্নয়ন প্রকল্প, সেইশেল পাবলিক ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের জন্যে ৭১টি টাটা বাস এবং ১০টি এম্বুলেন্স দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়।

এছাড়াও সেইশেলের নিরাপত্তায় ভারত সরকার ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান, হেলিকপ্টার এবং কোস্টগার্ডের জন্যে টহল বোট দিয়েছে। এরপরেও ভারত সেইশেলের কাছ থেকে সামরিক ঘাঁটির চুক্তিটি সই করিয়ে নিতে পারেনি।

ভারতের ব্যর্থতার মাঝে সেইশেলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ফ্রান্স। ভারত মহাসাগরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ব্যাপারে ফ্রান্স এবং ভারতের মাঝে কৌশলগত চুক্তি রয়েছে; বিশেষতঃ ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে ফ্রান্স এবং ভারত একমত। সেইশেল থেকে প্যারিসের দূরত্ব ৮ হাজার কিঃমিঃ, তদুপরি ভারত মহাসাগরে উপনিবেশ রাখার সুবাদে সেইশেলের সাথে ফ্রান্সের ১ হাজার ৩’শ ৬০ কিঃমিঃ-এর সমুদ্র সীমানা রয়েছে। ফ্রান্সের দখলে থাকা মাইয়োত, লা রিউনিয়ন, গ্লোরিওসো, ত্রোমেলিন, হুয়ান ডে নোভা, বাসোস দ্য ইন্ডিয়া এবং ইয়রোপা দ্বীপের রয়েছে ১৩ লক্ষ বর্গ কিঃমিঃ-এর বেশি সমুদ্রসীমা।

সেইশেলের দক্ষিণে কৌশলগত মোজাম্বিক চ্যানেলের উত্তরে ফ্রান্সের অধিকারে রয়েছে মাইয়োত এবং গ্লোরিওসো দ্বীপপুঞ্জ। গ্লোরিওসো-এর ২’শ কিঃমিঃ-এর মাঝে রয়েছে সেইশেলের এসম্পশন আইল্যান্ড, যেখানে ভারত সামরিক ঘাঁটি করতে চাইছে। লা রিউনিয়ন দ্বীপে ফ্রান্সের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। সেখানে সর্বদা ফ্রান্সের কয়েকটা যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন থাকে; যেগুলি মোজাম্বিক চ্যানেলসহ ভারত মহসাগরের দক্ষিণাঞ্চল এবং এন্টার্কটিকার কাছাকাছি হিমশীতল সমুদ্রে টহল দেয়।

ফ্রান্সের দক্ষিণ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এরিক ভিদাউদ গত ২৯শে মে সেইশেলের প্রেসিডেন্ট ড্যানি ফাউরের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং দুই দেশের মাঝে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করেন। ‘সেইশেল নিউজ এজেন্সি’র এক খবরে বলা হয় যে, সেইশেল তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফ্রান্সের সাথে সামরিক সহযোগিতা এগিয়ে নিতে চাইছে।

জেনারেল ভিদাউদ বলেন, ফ্রান্স চাইছে সেইশেলকে কেন্দ্র করে একটা নিরাপত্তা এলাকা প্রতিষ্ঠা করতে; যার মাধ্যমে এই অঞ্চলে চলাচলকারী সকল জাহাজের উপরে নজরদারি করা সম্ভব হবে। সেইশেলে ফরাসী রাষ্ট্রদূত লিওনেল মাজেস্তি-লারুই বলেন, জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য হওয়ায় ফ্রান্স একটি বৈশ্বিক শক্তি; যা দেশটিকে ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে আদর্শ অবস্থানে রেখেছে।
গত মার্চে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ ভারত সফর করেন। সফরকালে ম্যাক্রঁ ভারত মহাসাগরে জাহাজ চলাচলে ভারতের সাথে সমঝোতায় পৌঁছেন। ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ভারত মহাসাগরে চীনকে নিয়ন্ত্রণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু মনে করছে। আর একই সুরে ভারত সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে নিজের পক্ষে রাখতে ফ্রান্স এবং অস্ট্রেলিয়াকে পাশে চাইছে।

ভারতীয় গবেষক সিভানি সিং বলছেন যে, পৃথিবীর সবচাইতে বড় সমুদ্রসীমা রয়েছে ফ্রান্সের, যার ২৪ শতাংশ রয়েছে ভারত মহাসাগরে। জিবুতিতেও রয়েছে ফ্রান্সের সামরিক ঘাঁটি। ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা একারণেই চীনকে আটকাতে ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তায় ফ্রান্সকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। সেইশেলে সামুদ্রিক নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হলেও ফ্রান্সকে সেইশেলের পাশে শক্ত অবস্থানে দেখে ভারত স্বস্তির নিঃশ্বাসই ফেলবে।

এএসটি/