রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্রের দাবি নিয়ে যা ভাবছে তুর্কি বিশ্লেষকরা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৯ আশ্বিন ১৪২৫

রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্রের দাবি নিয়ে যা ভাবছে তুর্কি বিশ্লেষকরা

পরিবর্তন ডেস্ক ৬:২৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ০৯, ২০১৮

রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্রের দাবি নিয়ে যা ভাবছে তুর্কি বিশ্লেষকরা

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্প্রতি দাবি করেছেন, তার দেশ একাধিক অত্যাধুনিক পরমাণু অস্ত্র প্রস্তুত করেছে যা দিয়ে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সম্ভব। এসব অস্ত্র ব্যবহারের জন্য রয়েছে বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ডুবোজাহাজ।

আনাদোলু এজেন্সির একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্কের বিশ্লেষকরা মনে করছেন পরমাণু অস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে রাশিয়ার এমন দাবির পেছনে কয়েকটি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কারণ রয়েছে। আনাদোলু এজেন্সির (এএ) বিশ্লেষণটি পরিবর্তনের পাঠকদের জন্য অনুবাদ করে দেয়া হলো।

মার্চের ১ তারিখ দেয়া ভ্লাদিমির পুতিনের ওই ঘোষণা পৃথিবীর সব দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং বিভিন্ন দেশের নেতা ও বিশেষজ্ঞরা এর সমালোচনা করেন।

কিন্তু, ইস্তাম্বুলের এমইএফ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ডিন অধ্যাপক মুস্তফা কিবার্গলু বলেন, ‘নির্বাচনের ঠিক আগে আগে যেকোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম নতুন পরমাণু অস্ত্রযুক্ত দূর পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির বিষয়ে পুতিনের বক্তব্য কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটা রাশিয়ার জনমতকে প্রভাবিত করবে।’

তিনি মনে করেন, শুধু রাশিয়ার মানুষ নয়, সারা পৃথিবীরই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পুতিন ওই বক্তব্য দিয়েছেন।

এএকে কিবার্গলু বলেন, ‘রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল, ইউক্রেনে সামরিক অভিযান ও বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোতে তাদের সামরিক চাল ও রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে পশ্চিমাদের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। সম্প্রতি পেন্টাগন ট্রাম্পের নির্দেশে তাদের পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের নীতিমালায় পরিবর্তন এনেছে। ওই দলিলে অনেক ছোটখাট যুদ্ধেও পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে।’

তিনি মনে করেন, এর ফলে বিভিন্ন দেশের মধ্যে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের যে ‘নন-প্রলিফারেশন অব নিউক্লিয়ার ওয়েপনস (এনপিটি)’ চুক্তি রয়েছে তা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং আরও বেশি দেশ এধরনের অস্ত্র তৈরি শুরু করবে।

রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা ১৯৫০ সালে শুরু হয়েছিল এবং ১৯৭০ এর দশক পর্যন্ত তা পুরদমে চলে। পরে তারা বুঝতে পারে, এসব অস্ত্রে তাদের দেশগুলোসহ পুরো দুনিয়াই কয়েকবার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

এসব অস্ত্র তৈরি শুধু ব্যয়বহুল নয়, এগুলো নিরাপদে সংরক্ষণ করেও বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এর ফলে পরাশক্তিগুলো পরমাণু অস্ত্রের ভাণ্ডার ছোট করার জন্য কয়েকটি চুক্তি সম্পাদন করে।

কিবার্গলু মনে করেন, পরমাণু অস্ত্রের শক্তি সম্পর্কে ধারণা রাখেন এমন যে কেউ এটি প্রয়োগ করার ঝুঁকি নিতে চাইবে না। একসময়, পরমাণু অস্ত্র আছে এমন দেশগুলোর হুমকি বা রাজনৈতিক ইচ্ছাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হয়। পরমাণু অস্ত্র বা আগ্নেয়াস্ত্র যেটাই হোক না কেন, সেটা কখনো না কখনো প্রয়োগ করার সম্ভাবনা থেকেই যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এই বিশ্লেষক বলেন, ‘কিম জং উন, ট্রাম্প এবং পুতিনের মতো জনপ্রিয় নেতারা পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের উত্তেজনাময় অভিযানে নামবে না কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারবে না।’

পুতিন বলেছেন, তার দেশে পরমাণু অস্ত্র বা প্রথাগত অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হলে রাশিয়া পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগ করবে। তবে শুধুমাত্র রাশিয়ার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লেই কেবল দ্বিতীয় ক্ষেত্রে পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগ করা হবে।

তিনি করেছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাখ্যান করায় রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

হোয়াইট হাউস ২ মার্চ এক বিবৃতে জানিয়েছে, ফোনে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, জার্মানির চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মেরকেল ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন রুশ নেতার ভাষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, এর ফলে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমাগুলোর আলোচনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ইস্তাম্বুলের ইস্তিনিয়ে ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মেসুত হাক্কি কাসিন আনাদলুকে বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রথমত পুতিন বলতে চাইছেন- যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে সামরিক সুবিধা পেতে চাইছে। দ্বিতীয়ত, তিনি বলছেন- তারা মিথ্যে হুমকি দিচ্ছেন না। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর ও অবাস্তব। পুতিন আরও বলছেন- তারা রাশিয়াকে ঘিরে ফেলতে পারবে না। সব শেষে তিনি জোর দিয়ে বলছেন- তার দেশ কাউকে হুমকি দিচ্ছে না এবং আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে না।’

বর্তমানে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই প্রায় নয় হাজার পরমাণু অস্ত্র রয়েছে, যার মধ্যে দেড় হাজার অস্ত্র আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে নিক্ষেপযোগ্য রাখা হয়েছে। অতএব, আগামী কয়েক দশক আর একটিও নতুন পরমাণু অস্ত্র না বানালেও, যেগুলো রয়েছে সেগুলোর প্রভাবই দীর্ঘ সময় ধরে থাকবে বলে মনে করেন কাসিন।

বর্তমানে চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ভারত, পাকিস্তান, ইসরাইল ও উত্তর কোরিয়ার কাছেও পরমাণু অস্ত্র রয়েছে। মোট নয়টি দেশের কাছে প্রায় ১৫ হাজার পরমাণু অস্ত্র রয়েছে।

রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক হাজার আটশ’ পরমাণু অস্ত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রয়োগ করার মত অবস্থায় রাখা হয়েছে।

এনপিটি চুক্তির আওতায় চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র অফিসিয়ালি বৈধভাবে পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু, চুক্তির কারণে তারা এই অস্ত্রভাণ্ডার চিরকাল তৈরি বা সংরক্ষণ করতে পারবে না। এমনকি তারা এসব অস্ত্র ধ্বংস করে ফেলার পক্ষপাতী।

পাকিস্তান, ভারত, ইসরাইল ও উত্তর কোরিয়া এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি।

জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এনপিটি একটি ঐতিহাসিক চুক্তি। পরমাণু অস্ত্র ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ও শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরমাণু শক্তির ব্যবহার বাড়াতে এই চুক্তি করা হয়। পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করাও এটির উদ্দেশ্য।

১৯৬৮ সালে এটিতে স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত করা হয় এবং ১৯৭০ সালে এটি কার্যকর করা হয়। ১৯৯৫ সালের মে মাসে এই চুক্তির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো হয়েছিল। মোট ১৯১টি দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।

এমআর/এমএসআই