কেন আবার উত্তপ্ত সিরিয়া?

ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৮ আশ্বিন ১৪২৫

কেন আবার উত্তপ্ত সিরিয়া?

কে বি আনিস ৩:০০ অপরাহ্ণ, মার্চ ০১, ২০১৮

কেন আবার উত্তপ্ত সিরিয়া?

গত বছরের শেষ ভাগ থেকে মনে হচ্ছিল যুদ্ধ কবলিত সিরিয়ার ভাগ্যাকাশে বোধহয় আলোর রেখা দেখা দিচ্ছে। দীর্ঘ ৭ বছরের সংঘাত থেকে সম্ভবত মুক্তি পেতে চলেছে দেশটির মানুষ। কথিত জিহাদি সংগঠন আইএস’র ধারাবাহিক পতন, দেশটির বিদ্রোহী সংগঠন ফ্রি সিরিয়া আর্মির পিছু হটা, সব মিলিয়ে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এই সংঘাতের শেষ বলেই মনে করছিলেন। কিন্তু বছরের গোড়া থেকেই পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে।

কিন্তু কেন এভাবে পুনরায় উত্তপ্ত হয়ে উঠলো মধ্য প্রাচ্যের দোজখে পরিণত হওয়া এই দেশটি?

দীর্ঘ সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধে সিরিয়ায় প্রাণ হারিয়েছে ৪ লাখেরও বেশি মানুষ। এযাবতকালের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শংকটের কারণও হয়ে দাঁড়ায় সিরিয়া। সংঘাতের শুরু থেকেই যুদ্ধ থেকে প্রাণে বাঁচতে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালিয়ে যেতে থাকে সিরিয়ার লাখ লাখ সাধারণ মানুষ।

পরবর্তীতে ইউরোপের দেশগুলোর সীমান্তেও সিরিয়ার মানুষের ঢল দেখতে পায় গোটা বিশ্ব! কিন্তু যারা সিরিয়ার অভ্যন্তরে এখনও অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছেন তাদের কিন্তু প্রতি মূহুর্ত কাটছে মৃত্যুর আশঙ্কায়। বিশেষ করে বিদ্রোহী অধ্যূষিত অঞ্চলে সরকারি বাহিনীর আক্রমণ প্রতিনিয়ত কেড়ে নিচ্ছে বেসামরিক মানুষের প্রাণ।

বন্দুকের নিশানায় সিরিয়ার সাধারণ মানুষ থাকলেও তাদের কিন্তু নেই কোনো দল-মত! তারা আইএস কিংবা বিদ্রোহীদেরও সমর্থন দেয়নি, আবার বাশার বাহিনীর বিরুদ্ধাচরণও করেনি। কিন্তু বেঁচে থাকার আকুতি নিয়ে অবরুদ্ধ এসব মানুষকেই গুনতে হচ্ছে যুদ্ধের মাশুল।

তবে গত বছরের মাঝামাঝি সিরিয়ার বেশ কিছু এলাকা দখলে নেয়া ইসলামিক স্টেটকে রুশ সমর্থিত বাশার বাহিনী নাস্তানাবুদ করলে পরিস্থিতি পাল্টে যাবার আশা দেখা দিয়েছিল। মাঝে রাশিয়া সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়ানোয় নাখোশ হয় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো।

পরবর্তীতে দেখা যায়, সিরিয়ার বিদ্রোহীদের মদদ দেয়া মার্কিন সেনারা রুশ সেনাদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধরছে। এর মধ্যে বিশ্ব রাজনীতি অন্যভাবে উত্তপ্ত হয়ে থাকে। ইয়েমেনে আইএস দমনে ইরাকের সমর্থনপুষ্ট কুর্দি সেনারা সক্রিয় হলে তাদের দমনে তুরস্ক মার্কিন সংকেত পেয়ে সীমান্তে সেনা পাঠায়।

সৌদি আরবও কুর্দিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে সংঘাত এই অঞ্চলেও দেখা দেয়। অন্যদিকে কুর্দি বাহিনীকে সমর্থন দেয়ায় ইরানের উপর স্পষ্ট অসন্তোষ প্রকাশ করে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরবও ইরানের সমালোচনায় সরব হয়। মধ্যপ্রাচ্যে যখন এমন অবস্থা, তখন ‘উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচী আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবাদ’ বিশ্ব রাজনীতিতে আরেকটি শংকটের জন্ম দেয়।

ফলে মনে হচ্ছিল, বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সিরিয়া সংকট হয়তো ম্লান হয়ে পড়ছে। হয়তো বা দেশটিকে নিয়ে রুশ আর পশ্চিমা দেশগুলোর উৎসাহে ভাটা পড়তে চলেছে। যার কারণে বিশ্ব রাজনীতির যাতাকলে পড়া সিরিয়ার অবশিষ্ট নারী, পুরুষ ও শিশুদের উপর হয়তো শান্তি মিলতে যাচ্ছে।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, ধারণাটি ভুল ছিল। যার পেছনে রয়েছে কিছু সুক্ষ্ণ ভূ-রাজনৈতিক চাল! প্রথম তাকাতে হবে সিরিয়ায় দখল নেয়া ইসলামিক স্টেট বা আইএস’কে দমনে এগিয়ে আসা কুর্দি যোদ্ধাদের দিকে।

ভিডিও...

সিরিয়া নিয়ে পশ্চিমা নীল নকশা পণ্ড করতে মাথা চারা দেয়া আইএস’র খেলাফত দমনে দেশটির বিদ্রোহী সংগঠন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স বা এসডিএফ’কে মাঠে নামালেও তারা ব্যর্থ হয়।

সেসময় মার্কিন পক্ষ আইএস অভিযানে ব্যর্থ হলেও রাশিয়ার সহযোগিতায় বাশার বাহিনী অনেকটাই সাফল্যের মুখ দেখছিল। ফলে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে কুর্দিদের সহযোগিতা নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোট।

এরপর অবশ্য কুর্দি মিলিশিয়াদের সহযোগিতায় আইএস নির্মূলে সফলতাই পেতে দেখা যায়। রাকাসহ আইএস’এর দখলে থাকা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকার দখল ফিরে পেতে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় অন্যখানে!

আইএস’কে উচ্ছেদ করার পর সিরিয়ায় সেই সব এলাকা যুক্তরাষ্ট্রের কথা মতো বিদ্রোহীদের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানায় কুর্দি যোদ্ধারা। বরং পরিষ্কার হয়, আইএস দমনে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করলেও তাদের মূল সমর্থন রয়েছে ইরানের প্রতি। ফলে এসডিএফ’র মুখোমুখি অবস্থানে দেখা যায় কুর্দি মিলিশিয়াদের।

ভিডিও...

রুশ সমর্থনপুষ্ট বাশার সরকারকেই কুর্দি যোদ্ধারা ইরানের কথা মতো সাহায্য করতে থাকে। মাঝে রাশিয়া জানিয়ে দেয়, সিরিয়ার সংঘাত অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসায় যে কোনো সময় তাদের বাহিনীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন জানিয়ে দেন, পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী সিরিয়ায় অবস্থান করবে। সেই সঙ্গে তারা কুর্দি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের দখল নিতে তুর্কি যোদ্ধাদের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করবে।

এমন ঘটনা প্রবাহ বলছে, সিরিয়ায় আইএস দমনের নামে অভিযান পরিচালনা করা বিদেশি রাষ্ট্রগুলো বেসামরিক নাগরিকদের জীবন রক্ষার চাইতে ভূ-রাজনীতি নিয়েই বেশি বিচলিত। সিরিয়ায় তামাদি হওয়া বসন্ত বাতাসকে বইয়ে দিতে মরিয়া মার্কিনী শক্তি এখন তাদের কুর্দি মিত্র ওয়াইপিজি’কে সাহায্য দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’, এজন্য মার্কিন বাহিনী নিজেরা অস্ত্র না ধরলেও মিত্র তুরস্ককে লাগানো হয়েছে কুর্দি দমন অভিযানে।

অন্যদিকে, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পাশে থাকা ইরান ও রাশিয়াও কুর্দিদের সহযোগিতা বৃদ্ধিসহ মার্কিন মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের দমনে অভিযান জোরদার করেছে। আদতে বৈশ্বিক পরিস্থিতির দিকে নজর বাড়াতে দু’পক্ষই চাইছে দ্রুত সিরিয়া শংকটের সমাধান!

মাঝে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাপে চ্যাপ্টা হওয়া দেশটির সাধারণ মানুষের লাশের পরিমাণই শুধু বাড়ছে।

ভিডিও...

সুত্র: দি ইকোনমিস্ট

কেবিএ