আফরিন অভিযানে তুরস্ককে কেন সাহায্য করছে রাশিয়া?

ঢাকা, বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮ | ৩১ শ্রাবণ ১৪২৫

আফরিন অভিযানে তুরস্ককে কেন সাহায্য করছে রাশিয়া?

মূল: লিওনিদ ইসায়েভ; ভাষান্তর: হাসান আল মাহমুদ ১২:৫৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০১৮

print
আফরিন অভিযানে তুরস্ককে কেন সাহায্য করছে রাশিয়া?

জানুয়ারির ২০ তারিখে উত্তর সিরিয়ার কুর্দি নিয়ন্ত্রিত আফরিনে বিমান ও স্থল হামলা শুরু করেছে তুরস্ক। তারা অভিযানটির নাম দিয়েছে 'জলপাই-গাছের শাখা' (অলিভ ব্রাঞ্চ), ঐতিহাসিকভাবে যাকে শান্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এমন একটি উচ্চাকাঙ্খী অভিযানে যেভাবে হামলার তীব্রতা বাড়ানো হয়েছে তাতে বোঝা যায় রাশিয়ার স্পষ্ট সমর্থন ছাড়া এটা সম্ভব ছিল না।

প্রথমত, অভিযান পরিচালনার জন্য তুরস্কের বিমানবাহিনীকে সিরিয়ার আকাশ সীমায় প্রবেশ করতে হয়েছে। রাশিয়ার সাথে পরামর্শ করা ছাড়া আঙ্কারা এটা কিছুতেই করতে পারে না।

অধিকন্তু তুর্কি সমর্থিত ফ্রি সিরিয়ান আর্মিকে আফরিনে নিয়ে আসতেও রাশিয়ার কাছ থেকে তুরস্কের এই নিশ্চয়তা পাওয়া দরকার যে, বাশার আল আসাদ পরিস্থিতির কোনো সুযোগ গ্রহণ করবে না এবং ইদলিব প্রদেশে তুরস্কের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে না।

আমেরিকা সমর্থিত আরব যোদ্ধা ও কুর্দিদের জোট সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সও (এসডিএফ) ভাল করেই জানে, রাশিয়ার সহযোগিতা না থাকলে অভিযান শুরু করা তুরস্কের পক্ষে সম্ভব হত না। ফলে এই ইস্যুতে রাশিয়ার অবস্থানের ব্যাপারে এসডিএফ প্রতিনিধিরা হতাশা ব্যক্ত করেছেন।

এসডিএফ'র প্রথম সারির একটি বাহিনী কুর্দিশ পিপলস প্রোটেকশন ইউনিটস’র (ওয়াইপিজি) একজন কমান্ডার জেনারেল সিপান হেমু বলেন, 'রাশিয়া কুর্দিদের সাথে প্রতারণা করেছে। কোনো একদিন এই নীতিভ্রষ্টতার জন্য কুর্দিদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে রাশিয়াকে।'

কুর্দিরা মনে করে, অভিযানের শুরু থেকেই রাশিয়া তুরস্কের সাথে আছে। কুর্দিদের এমন মূল্যায়নের সাথে দ্বিমত করাটা কঠিন। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে মস্কো-আঙ্কারা সম্পর্কের উন্নয়ন গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলে দেখা যায়, আফরিনের ভবিষ্যতকে কেন্দ্র করে তাদের পারস্পরিক সহযোগিতা শুরু হয়েছে অভিযান শুরুর অনেক আগ থেকেই।

মূলত এই অভিযানের বীজ বপিত হয়েছে গত গ্রীষ্মে ইস্তাম্বুলে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সের্গেই শোইগু এবং তুর্কি সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ হালুসি আকারের মধ্যকার আলোচনার সময়েই। আলোচনার ফলস্বরূপ আফরিনে আক্রমণ চালানোর জন্য তুরস্ককে সিরিয়ার আকাশ সীমার কিছু অংশ ব্যবহারের অনুমতি দেয় রাশিয়া।

ইদলিবে সংঘাতমুক্ত এলাকা প্রতিষ্ঠায় মস্কোর সাথে এক চুক্তিতে উপনীত হওয়ার পর আঙ্কারা কুর্দি অধ্যুষিত এ অঞ্চলের আশপাশে এক মাস আগে থেকেই সেনা উপস্থিতি বাড়াতে থাকে।

চূড়ান্ত আক্রমণের দিন আফরিন থেকে রাশিয়ার সেনা প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘোষণায় অভিযানে তাদের সম্মতি থাকার বিষয়টিকে আরও পরিস্কার করে।

অভিযানের ব্যাপারে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেবল উদ্বেগ জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এটাও ছিল তুরস্কের অভিযানের ব্যাপারে একটি গ্রিন সিগনাল।

রাশিয়ার শেষ খেলা

সিরীয় কুর্দিরা ক্ষুব্ধ হওয়া সত্ত্বেও আফরিন ইস্যুতে বিরোধিতা করার চেয়ে তুরস্ককে সহযোগিতা করাই রাশিয়ার জন্য লাভজনক। কারণ কুর্দিদের সাথে রাশিয়ার কখনই দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত সহযোগিতার সম্পর্ক ছিল না। বরং অতীত ইতিহাস বলে মস্কো 'কুর্দি কার্ড'কে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ, বিশেষত তুরস্কের সাথে যখন সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে তখন ব্যবহার করেছে এবং আফরিনের ব্যাপারে মস্কো ওয়াইপিজির কাছে খুব একটা ‍ঋণীও নয়। কারণ সিরিয়া সংকটে গ্রুপটি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মৈত্রী গড়ে তুলেছিল এবং সংঘাতে নিজেকে রাশিয়ার প্রতিপক্ষ হিসেবে হাজির করেছে।

এ ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিনিময়ে আফরিনকে সিরীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে হস্তান্তর করতে রাশিয়ার দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল কুর্দিরা। কিন্তু ওয়াশিংটন তার মিত্র ওয়াইপিজিকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এটা যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির অসারতা প্রমাণের সুযোগ তৈরি করে দিলো রাশিয়াকে।

এ ছাড়া এই মুহূর্তে আঙ্কারাকে সহযোগিতা করাটা রাশিয়ার জন্য মুখ্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২৯-৩০ জানুয়ারি সোচিতে অনুষ্ঠিত হওয়া কংগ্রেস অব সিরিয়ান পিপল'র সহ-আয়োজক ছিল তুরস্ক।

ফোরামটি গঠনের পেছনে রয়েছে ক্রেমলিনের স্থানীয় রাজনৈতিক তাৎপর্য। কারণ এটা কেবল পুতিনের একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগই নয়, বরং এটা ছিল তার নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর একটি মাধ্যমও। রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট মার্চে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজেকে একজন শান্তি স্থাপনকারী ও জয়ী হিসেবে চিত্রিত করতে চান। একই সাথে ইলেক্টরেটদের সামনে সিরিয়ায় সামরিক সংঘাতের বিজয়সূচক সমাপ্তি ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে শান্তি স্থাপনে নিজের সরকারকে প্রধান উদ্যোগতা হিসেবে তুলে ধরতে চান।

আফরিন ইস্যুতে আঙ্কারাকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে সামরিক সংঘাত ছাড়াই ইদলিব পরিস্থিতির সমাধানের সুযোগ তৈরি করেছে মস্কো। রাশিয়া জানতো, ইদলিবে একটি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়াটা দামেস্ক এবং তার মিত্রদের জন্য অনেক ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। এটা এমনকি একটা নতুন মানবিক বিপর্যয়ও নিয়ে আসতে পারে। এক বছর আগে যেমনটা হয়েছিল আলেপ্পোতে।

বলা বাহুল্য, এমন সংঘাত ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়া সিরীয় বাহিনীকে পরিশ্রান্ত করে ফেলতো, যেটা রাশিয়াকে পুনরায় সিরীয় যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরতে বাধ্য করতো।

অপারেশনের ব্যাপারে রাশিয়ার মৌন সম্মতির কারণে ইদলিবে কিছু ছাড় দিতে প্রস্তুত রয়েছে আঙ্কারা। অভিযান শুরুর দিনই সিরীয় সরকার ঘোষণা করেছে- কোনো বাধা ছাড়াই প্রতিপক্ষ নিয়ন্ত্রিত ইদলিবের আবু দুহর এয়ারপোর্ট হস্তগত করেছে তারা।

রাশিয়ার সাথে চূড়ান্ত দরকষাকষির জন্য আরও একটি বিষয় রয়েছে তুরস্কের: সেটা হলো, তুরস্কের মধ্য দিয়ে গ্যাস পাইপলাইন। মস্কো এটির ব্যাপারে উচ্চাশা করে আছে এবং কোনোভাবে এর নির্মাণ বাধাগ্রস্ত হোক তা চায় না।

আফরিন অভিযানে রাশিয়ার সম্মতি গ্যাজপ্রমের সিইও আলেকসি মিলারের দেওয়া এক বিবৃতির সাথে মিলে যায়। বিবৃতিতে তুরস্কের জলসীমার মধ্য দিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিতীয় গ্যাস লাইন নির্মাণের চুক্তির খবর নিশ্চিত করেছেন মিলার।

এতে নিকট ভবিষ্যতে ২০১৫ সালের মতো প্রকল্পটি বাতিল করাটা অসম্ভব হয়ে উঠল তুরস্কের জন্য। কোন বিঘ্ন না ঘটলে পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৯ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হবে প্রকল্পটির। সূত্র:
আলজাজিরা।

 
.


আলোচিত সংবাদ