নেতানিয়াহুর ভারত সফর, ‘আপনি ভুলের মধ্যে আছেন’

ঢাকা, শনিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৮ | ৩ ভাদ্র ১৪২৫

নেতানিয়াহুর ভারত সফর, ‘আপনি ভুলের মধ্যে আছেন’

মূল: বিজয় প্রসাদ; ভাষান্তর: হাসান আল মাহমুদ ৩:৫৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২২, ২০১৮

print
নেতানিয়াহুর ভারত সফর, ‘আপনি ভুলের মধ্যে আছেন’

ভারতীয় জনগণ সার্বজনীনভাবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ভারতে স্বাগত জানিয়েছে- এমনটা যদি ভেবে থাকেন তাহলে আপনি ভুলের মধ্যে আছেন। দুই দেশেরই কর্পোরেট মিডিয়া প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে পাঠানো প্রেস রিলিজের উপর জোর দিয়েছে এবং একযোগে সুশৃঙ্খল প্রচারণা চালিয়েছে। সফরে কিছু সাধারণ পরিদর্শনের মধ্যে ছিল: তাজমহল, সাবারমতি গান্ধী আশ্রম ও গান্ধী সমাধি পরিদর্শন। ছিল একটি প্রযুক্তি কেন্দ্রের উদ্বোধন, ব্যবসায়ী নেতাদের সাথে বৈঠক।

মিডিয়া নেতানিয়াহুর এই সফরের আসল উদ্দেশ্য প্রচার করা থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি ফিলিস্তিনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে যেসব ভারতীয় নেতানিয়াহুর সফরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, তাদেরকেও এড়িয়ে গেছে।

অস্ত্র চুক্তি

বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে যেগুলোর ব্যাপারে আলোচনা করতে মিডিয়া ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো নরেন্দ্র মোদি ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার অস্ত্র চুক্তি। ভারত ২০১২ থেকে ২০১৬-এর মধ্যে  ইসরাইলের প্রধান অস্ত্র ক্রেতাদের মধ্যে অন্যতম। এই সময়ে দেশটি ইসরাইলের মোট রফতানিকৃত অস্ত্রের ৪১ শতাংশ ক্রয় করেছে।

‘ব্যবসায়ী নেতাদের’ সাথে মিটিং বলে মিডিয়ায় যা এসেছে- মনে হয়েছে, অস্ত্র প্রস্তুতকারী এবং অস্ত্রের ঠিকাদারসহ স্যুট-টাই পরা এসব যুদ্ধ ব্যবসায়ী কেবল ব্যবসাই করেন, যুদ্ধ নয়।

২০১৭-এর এপ্রিলে ভারত ও ইসরাইল ২ বিলিয়ন ডলারের  সামরিক সাজ-সরঞ্জামের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু এ বছরের জানুয়ারিতে ভারত সরকার ট্যাংক বিধ্বংসী স্পাইক মিসাইল কেনার ৫০০ মিলিয়ন ডলারের যে চুক্তি ছিল, তা বাতিলের কথা জানায় ইসরায়েলি অস্ত্র কোম্পানিগুলোকে। ভারত সফরের সময় নেতানিয়াহু জানায়, চুক্তিটি নিয়ে পুনরায় আলোচনা শুরু হয়েছে। স্পষ্টত, জানুয়ারির ঘটনাটি সেভাবে আমলে না নেওয়ার জন্য নেতানিয়াহুকে ব্যক্তিগতভাবে বলেছেন মোদি।

এটা করতে গিয়ে মোদিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সামরিক কোম্পানি, প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার বিরুদ্ধাচরণ করতে হবে যারা মূলত ভারত সরকারের ‘মেইক ইন ইন্ডিয়া’ নীতি অনুসরণ করছিলেন। দেশেই ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বানানোর পরিবর্তে ভারতকে এখন ইসরায়েলি প্রযুক্তি আমদানির জন্য টাকা গুনতে হবে।

ভারত ও ইসরাইলের মধ্যকার সম্পর্কের মূল ভিত্তিই হলো অস্ত্র। আর বাদবাকি বিষয়গুলো সবগুলোই আনুষঙ্গিক। সে যাই হোক, অস্ত্র চুক্তির উপর জোরারোপ করাটা সম্ভবত খুব অমার্জিত হয়ে যাবে। মোদি ও নেতানিয়াহু উভয়ই নিজেকে তুলে ধরতে পছন্দ করেন। তারা বিজ্ঞাপনের শিল্প সম্পর্কে ভালো জানেন। তাই অস্ত্র চুক্তি বাতিলের কারণে তারা সম্পর্ক কমাবেন না। উভয়েই মহান উদ্দেশ্যে নিজেদের দেশকে কাছাকাছি নিয়ে এসে  নিজেকে বড় মনের অধিকারী হিসেবে দেখাতে চান।

গান্ধী ও ফিলিস্তিন

দীর্ঘদিন ধরে ভারতে মহাত্মা গান্ধী অপব্যবহৃত হয়ে আসছেন। যে ব্যক্তি অর্থকে এড়িয়ে চলেছেন এবং পুঁজিবাদের মুনাফালোভী উদ্দেশ্যকে ঘৃণা করতেন; সম্মান জানিয়ে ভারতীয় মুদ্রার নোটে তার ছবিটিই ব্যবহার করা হয়েছে।

১৯৩১ সালে গান্ধীকে যখন সেনাবাহিনী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, একজন সাংবাদিককে তিনি বলেন, তিনি আশা করেন ভবিষ্যতের ভারত রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী হবে 'কল্পনাতীতভাবে ক্ষুদ্র'। অথচ বর্তমানে ভারতের রয়েছে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম নিয়মিত সেনাবাহিনী। ভারত তার সামরিক বাহিনীর পেছনে বছরে ৫৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে, সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে যা বিশ্বে পঞ্চম (যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, সৌদি আরবের পর)। দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আমদানিকারী দেশ।

আহমেদাবাদের কাছে সাবারমতি নদীর তীরে গান্ধীর প্রধান আশ্রম এবং  রাজঘাটে তার সমাধিতে নেতানিয়াহুকে মোদির নিয়ে যাওয়াটা ছিল উনিবেশবাদ বিরোধী ভারতীয় এই নেতাকে অপমান করার সমতুল্য। এই লোক মূলত একটি অস্ত্র চুক্তি করতে এসেছে- এটা কেবল এই কারণেই গর্হিত সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং  নেতানিয়াহুর প্রোপাগান্ডামূলক সফরের সময় করপোরেট মিডিয়ার ভুলে থাকা গান্ধীর ফিলিস্তিনিদের প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তার কারণেও।

১৯৩৮ সালে গান্ধী লিখেছিলেন, 'ফিলিস্তিন আরবের অংশ (...) আরবদের উপর ইহুদিদের চাপিয়ে দেওয়াটা অন্যায় ও অমানবিক। উপনিবেশবাদ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থাকা একজন হিসেবে তিনি এটা লিখেছিলেন। তার দৃষ্টিতে ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে সেখানে নিজেদের ইহুদি বিদ্বেষী ইতিহাস দ্বারা পরিচালিত হয়ে ইহুদিদের বসিয়ে দিতে পারে না ইউরোপ।

ইসরাইল প্রতিষ্ঠার দুই বছর আগে ১৯৪৬ সালে গান্ধী লিখেন- ‘একটি অনভ্যর্থিত ভূমিতে জোর খাটানোর জন্য ইহুদিদের কেন আমেরিকান অর্থ কিংবা ব্রিটিশ অস্ত্রের উপর নির্ভর করতে হবে? ফিলিস্তিনে নিজেদের জবরদস্তিমূলক অবতরণকে নিষ্কণ্টক করতে তাদের কেন সন্ত্রাস অবলম্বন করতে হবে?’

হাগানাহ ও ইরগুনের মতো সন্ত্রাসী  গ্রুপগুলোকে তিনি মনে রেখেছেন, যারা ১৯৪৮-এ নাকাবার সময় ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বিতাড়নে অংশ নিয়েছিল এবং ইংরেজ ও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালিয়েছিল।

মোদি এবং তার সরকার এই সফরের সময় ফিলিস্তিনিদের সম্পর্কে গান্ধীর দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল সে সম্পর্কে কিছুই বলেনি। অবশেষে তারা অস্ত্র চুক্তির পথেও এলো।

প্রতিবাদ

নেতানিয়াহুর সফরের বিরুদ্ধে দেশময় প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হয়েছে। নয়াদিল্লিতে কমিউনিস্ট মুভমেন্ট এবং ফিলিস্তিন সমর্থনকারী বিভিন্ন গ্রুপ বড় ধরনের মিছিল করেছে।

কমিউনিস্ট পার্টি ইন্ডিয়ার (মার্ক্সবাদী) একজন নেতা প্রকাশ কারাত বলেন, ‘নেতানিয়াহুকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ভারত ফিলিস্তিনে ইসরাইলি দখলদারিত্বের বৈধতা দান করল। তিনি এটা উল্লেখ করেন যে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইল সফরে যান তখন তিনি পশ্চিম তীরেও যান। কিন্তু গত গ্রীষ্মে ইসরাইল সফরের সময় মোদি ফিলিস্তিনকে এড়িয়ে যান। নেতানিয়াহুর সফরের সময় ফিলিস্তিনের ব্যাপারে কোনো কিছু মুখে না আনাটা ছিল ভারতের রাজনৈতিক চৈতন্য থেকে ফিলিস্তিনকে মুছে ফেলার নীতির অংশ।’

নেতানিয়াহু মুম্বাই যান এবং সেখানে কিছু হাই প্রোফাইল বলিউড অভিনেতা-অভিনেত্রী ও প্রযোজকের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতের সময় নেওয়া একটি সেল্ফিতে ছিলেন অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন, অভিষেক বচ্চন, ঐশ্বরিয়া রাই, বিবেক ওবেরয় এবং প্রযোজক রাজ নায়ক ও রনি স্ক্রুওয়ালা। দুর্নীতির অভিযোগে ইসরাইলে তদন্তাধীনে থাকা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের করা যুদ্ধাপরাধের তালিকায় থাকায় একজন ব্যক্তির সাথে হাসিমুখে ছবি তুলতে কেউই সংকোচবোধ করেননি।

তবে ভারতের চলচ্চিত্র শিল্পের সবাই এই সফরকে স্বাগত জানাননি। পুরস্কার জয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা আনন্দ পাতরধন এই হেঁয়ালিতে যোগ না দিয়ে মোদির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যখন পাতরধনকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম তিনি এর চমৎকার একটি সারসংক্ষেপ বললেন, ‘যেকোনো সম্ভাব্যতায় বলিউডের কিছু বড় ব্যক্তিত্ব মোদি-নেতানিয়াহুর ফিলিস্তিন বর্জনের কুচকাওয়াজে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু আপনাকে যেটা জানা দরকার সেটা হচ্ছে, এটা  নিষ্ঠুর, যুদ্ধবাজ সংখ্যাগুরুবাদীদের সাথে বলিউডের রুইকাতলাদের- যারা তাদের প্রচুর পরিমাণ অবৈধ সম্পদ পানামার মতো ট্যাক্স হ্যাভেনগুলোতে (যেখানে বিনিয়োগ করলে কর দিতে হয় না) বিনিয়োগ করে রেখেছেন- একটা অসৎ মৈত্রী তৈরি করবে। অধিকার হারাদের সুবিচারের জন্য বিচলিত হবেন- এ লোকদের কাছ থেকে এমনটা আশা করাই বরং বাড়াবাড়ি।’ সূত্র: আলজাজিরা।

এইচএএম/এএল/

 
.


আলোচিত সংবাদ