না জিতেও ব্যালন ডি’অর জিতলেন ইনিয়েস্তা!

ঢাকা, শনিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৮ | ৩ ভাদ্র ১৪২৫

না জিতেও ব্যালন ডি’অর জিতলেন ইনিয়েস্তা!

পরিবর্তন ডেস্ক ৯:১০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৪, ২০১৮

print
না জিতেও ব্যালন ডি’অর জিতলেন ইনিয়েস্তা!

ব্যালন ডি’অরকে নিজেদের সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছেন লিওনেল মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। গত ১০ বছরে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদার এই ব্যক্তিগত পুরস্কারটি সমানভাবে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন দুজনে। মেসি-রোনালদোর রাজত্বে হানা দিয়ে একবারও এই পুরস্কারটা উঁচিয়ে ধরতে পারেননি আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। তবে ক্যারিয়ারে কখনো ব্যালন ডি’অর না জিতেও যেন ব্যালন ডি’অর জয়ের স্বাদ পেলেন বার্সেলোনার বর্ষিয়ান মিডফিল্ডার। ইনিয়েস্তার হাতে কখনোই ব্যালন ডি’অর তুলে না দিতে পারার কারণে যে তার কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইল ফ্রান্স ফুটবল!

ফ্রান্সের বিশ্বখ্যাত ফুটবল সাময়িকী ফ্রান্স ফুটবলই দিয়ে থাকে ব্যালন ডি’অর। সেই প্রতিষ্ঠানটিই পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়াটা ইনিয়েস্তার জন্য ব্যালন ডি’অর জয়ের মতোই গৌরবের! ফ্রান্স ফুটবল-এর সম্পাদক প্যাসকল ফেরে সম্পাদকীয়তে ফ্রেঞ্চ ভাষায় লিখেছেন ‘পেরদন আন্দ্রেস।’ যার আভিধানিক বাংলা অর্থ, ‘আমাদের ক্ষমা করো আন্দ্রেস।’

প্যাসকলের এই ক্ষমা চাওয়ার পেছনে অন্য একটা কারণও আছে। মেসি-রোনালদোর সঙ্গে পেরে উঠেননি বলেই যে ইনিয়েস্তা ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি, এমনটা মনে করেন না প্যাসকল। ফ্রান্স ফুটবল সম্পাদক বরং মনে করেন, দুবার এই পুরস্কারটা পাওয়ার যোগ্য দাবিদার ছিলেন ইনিয়েস্তা। অন্তত একবার তো এটা তিনি পেতেই পারতেন। সেটা ২০১০ সালে।

কিন্তু আয়োজকদের অনিয়ম, পক্ষপাতিত্বের কারণে পুরস্কারটা ইনিয়েস্তার হাতে উঠেননি! তাকে দ্বিতীয় বানিয়ে সেবার পুরস্কারটি জেতে নেন লিওনেল মেসি। প্যাসকল সরাসরি সাল উল্লেখ্য করেননি। তবে লেখার ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন, ২০১০ সালে ব্যালন ডি’অরের সত্যিকার দাবিদার ছিলেন ইনিয়েস্তা। আয়োজকদের পক্ষপাতিত্বে সেটা উঠে মেসির হাতে!

প্যাসকল ব্যালন ডি’অর দেয়ার পক্ষপাতিত্বের বিষয়টি তুলে ধরেছেন বাহারি এক উপমায়। লিখেছেন ‘গণতান্ত্রিক অনিয়মের’ কথা। মানে আয়োজকদের ‘গণতান্ত্রিক অনিয়মের’ কারণেই ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি ইনিয়েস্তা। আর সে জন্যই তিনি ক্ষমা চেয়েছেন ইনিয়েস্তার কাছে।

আয়োজকদের অনিয়মের দায়টা ফ্রান্স ফুটবলের কাঁধেও বর্তায়। কারণ, ব্যক্তিগত এই পুরস্কারটি দিয়ে থাকে তারাই। কিন্তু এর মধ্যেও একটু ফারাক আছে। ২০১০ সাল থেকে ব্যালন ডি’অর ও ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলের পুরস্কার দুটি মিলে একক পুরস্কার করা হয়। যে পুরস্কারটি যৌথভাবে আয়োজন করে ফ্রান্স ফুটবল ও বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা মিলে। পুরস্কারটির নামও বদলে হয়ে যায় ফিফা ব্যালন ডি’অর।

কিন্তু ফিফা মানেই তো অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্বের আখড়া। সেই ১৯৫৬ সালে ব্যালন ডি’অর পুরস্কারের প্রবর্তন করে ফ্রান্স ফুটবল। সেই থেকে প্রতি বছরই পুরস্কারটি দিয়ে আসছিল তারা। কিন্তু ১৯৫৬ থেকে ২০০৯, দীর্ঘ এই সময়ে কখনোই এই পুরস্কার প্রাপ্তি নিয়ে অনিয়ম বা পক্ষপাতিত্বের প্রশ্ন উঠেনি। বরং স্বচ্ছতার জন্য সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। ব্যালন ডি’অরের মর্যাদাও তাই আলাদা।

কিন্তু ফিফার সঙ্গে একিভূত হওয়ার পর প্রথম বছরেই ফিফা ব্যালন ডি’অরের নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে অস্বচ্ছতার প্রশ্ন ওঠে। বাণিজ্যের স্বার্থে প্রভাব খাটিয়ে ফিফা পুরস্কার প্রদানেও পক্ষপাতিত্বের পথে হাঁটে। ঢুকিয়ে ফেলে রাজনীতি। বিষয়টি নিয়ে বনিবনা না হওয়াতেই ২০১৬ সালে আবার পুরস্কারটি আলাদা করে ফেলা হয়। গত দুই বছর ধরে ফ্রান্স ফুটবল আবার এককভাবে পুরস্কারটি দিচ্ছে। ফিফার পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে ‘ফিফা দ্য বেস্ট’ পুরস্কার।

ফ্রান্স ফুটবল সম্পাদক প্যাসকলের এই ক্ষমা চাওয়া নিশ্চিতভাবেই ইনিয়েস্তার জন্য বড় প্রাপ্তি। সেই সঙ্গে ২০১০ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত পুরস্কারটিতে পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে, সেটাও স্পষ্ট!

২০১০ সালে ফিফা ব্যালন ডি’অর জেতেন মেসি। প্রথম রানারআপ হয়ে ইনিয়েস্তার হাতে উঠে রূপার বল। দ্বিতীয় রানারআপ হয়ে জাভি হার্নান্দেজ পান ব্রোঞ্জ বল। সেবার মেসি কিভাবে ব্যালন ডি’অর পান, তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। কারণ, সেবার লা লিগা ও সুপার কোপা ছাড়া বার্সেলোনা কোনো শিরোপাই জিততে পারেনি। মেসিও তাই। কিন্তু ইনিয়েস্তা মেসির সঙ্গে ক্লাবের হয়ে এই দুটি শিরোপা জেতার পাশাপাশি স্পেনকে উপহার দেন প্রথম বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ফাইনালের একমাত্র গোলটা করেছিলেন তিনিই।

ক্লাবের হয়ে দুদুটি শিরোপার পাশাপাশি দেশকে প্রথম বারের মতো বিশ্বকাপ জেতানো। আর স্পেনের সেই বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে ইনিয়েস্তার ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে বেশি। স্বাভাবিকভাবেই সেবার ব্যালন ডি’অর জয়েবড় দাবিদার ছিলেন ইনিয়েস্তা। দাবিদার ছিলেন তার ক্লাব এবং জাতীয় দল সতীর্থ জাভি এবং নেদারল্যান্ডসের ওয়েসলি স্নাইডারও।

সেবার ইন্টার মিলানের মতো ক্লাবকে ইতিহাসে প্রথম বারের মতো ট্রেবল ‘লিগ, কাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ) জেতান স্নাইডার। এরপর ২০১০ বিশ্বকাপে গিয়ে দলকে তুলেন ফাইনালে। অনেকেই মনে করেন, একজন ফুটবলের পক্ষ এক বছরে এর চেয়ে বেশি সাফল্য পাওয়া সম্ভব না। কিন্তু স্নাইডার ফিফা ব্যালন ডি’লের জন্য সেরা তিনেই ঢুকতে পারেননি।

ইনিয়েস্তা-জাভি সেরা তিনে থাকলেও শেষ পর্যন্ত পুরস্কারটা পান মেসি। বিশ্বকাপে যার দল কোয়ার্টার ফাইনালেই হেরে যায়। ২০১০ সালের মতো না হলেও প্রশ্ন আছে ২০১২ সালের ফিফা ব্যালন ডি’অর নিয়েও। ফিফার রাজনীতিতে এবারও পুরস্কারটা উঠে মেসির হাতেই। অথচ সেবার মেসির বার্সেলোনা লিগ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-কোনো শিরোপাই জিততে পারেনি। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়েও বড় কোনো টুর্নামেন্টে খেলেননি।

অন্যদিকে সেবারও স্পেনকে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতান ইনিয়েস্তা। অস্ট্রিয়া-পোল্যান্ডে আয়োজিত টুর্নামেন্টে স্পেনের শিরোপা জয়ের পেছনে ইনিয়েস্তাই রাখেন সবচেয়ে বড় অবদান। এবারও তাই দাবিদার ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে হতে হয় তৃতীয়। পুরস্কার ওঠে মেসির হাতে। ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো হন প্রথম রানারআপ।

এতোদিন পর দুঃখ প্রকাশ করে প্যাসকলের ক্ষমা চাওয়ার কারণ, ব্যালন ডি’অর বঞ্চিত সেই ইনিয়েস্তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষ দেখা যাচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে মৌসুম শেষেই বার্সেলোনা ছেড়ে পাড়ি জমাতে যাচ্ছেন চীনের সুপার লিগে। মানে ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারের ক্যারিয়ারের আলো নিভে যাওয়ার পথে।

চীনে যাওয়া মানেই ব্যালন ডি’অর জয়ের সম্ভাবনা শেষ! অবশ্য প্যাসকল আশাবাদী, সামনেই বিশ্বকাপ বলে। লিখেছেন, রাশিয়া বিশ্বকাপে আলো ছড়িয়ে ইনিয়েস্তা ব্যালন ডি’অর জিতবে বলেই আশাবাদী তিনি। ৩৩ বছর বয়সী ইনিয়েস্তার ফুটবল মস্তিস্কের প্রশংসা করে ফ্রান্স ফুটবলের প্রধান কর্তা লিখেছেন, ‘ইনিয়েস্তা এটা প্রমাণ করেছেন যে, চ্যাম্পিয়ন হতে হলে এই খেলাটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

 

 

 
.


আলোচিত সংবাদ