অপরাধী সন্দেহে গণপিটুনি : কী বলে ইসলাম?

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

অপরাধী সন্দেহে গণপিটুনি : কী বলে ইসলাম?

মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ ৪:৪৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৪, ২০১৯

অপরাধী সন্দেহে গণপিটুনি : কী বলে ইসলাম?

ছেলেধরা আতঙ্কে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। ইতিপূর্বেও দেখা গেছে দেশে কোন বড় ব্রিজ বা সেতুর কাজ শুরু হলেই এই ধরণের একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় স্বার্থান্বেষী কোন কুচক্রী মহল। পদ্মাসেতুর বেলায়ও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকার এটাকে গুজব জানিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালালে সম্প্রতি এই গুজবকে সত্য প্রমাণ করতেই সম্ভবত দেশের বিভিন্ন স্থানে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে নির্মম হত্যাকাণ্ডের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটানো হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে কিছু শিশুও নিখোঁজ হয়ে যায়। এরপর থেকে গণমানুষের মনে অস্থিরতা ও নেতিবাচক সন্দেহপ্রবণতা প্রবল হয়ে ওঠে। 

তাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নিজে সতর্ক থাকা কাম্য। কিন্তু, এ ধরনের গুজবে বিশ্বাস স্রেফ কুসংস্কারাচ্ছন্নতা। অজ্ঞতার যুগে শয়তানের উদ্দেশ্যে এ ধরনের মানুষ বলি দেওয়া হতো। ইসলামে এসবের কোন ভিত্তি নেই।

এছাড়া, মানুষকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা নিন্দনীয় কাজ। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ

অর্থ: ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয় কোনো কোনো অনুমান তো পাপ।’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত : ১২)

যে অপরাধী, সে তো অপরাধী। কিন্তু যখন স্রেফ অপরাধী হিসেবে কাউকে সন্দেহ করা হয় উপযুক্ত কারণ ছাড়াই, তখন সন্দেহটাই হয়ে ওঠে পাপ– তাকে আঘাত করা যে আরও কত বড় পাপ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কেউ যদি বলে ওঠে, ‘ওই তো ছেলেধরা, ওই তো ছেলেধরা’, এখানেও আগে যাচাই করে নেওয়া আবশ্যক যে সে আসলেই ছেলেধরা কিনা। নয়তো খুব সম্ভব নিরপরাধ মানুষকে মারার দায়ে নিজেকেই অপরাধী সাব্যস্ত হতে হবে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ

অর্থ : ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের কাছে যদি কোনো ফাসেক ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তা যাচাই করো। অজ্ঞতাবশত কোনো গোষ্ঠীকে আক্রান্ত করার আগেই, (না হলে) তোমরা কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত : ৬)

এরপরেও কাউকে যদি উপযুক্ত কারণে ছেলেধরা সন্দেহ হয়, অথবা সে যদি প্রকৃত ছেলেধরাই হয়, তবু তাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া কর্তব্য। কারণ এই একটি গুজব সম্প্রতি কেড়ে নিয়েছে অনেক নিরপরাধ মানুষের প্রাণ।

জনসমক্ষে প্রকাশ্যে কাউকে কুপিয়ে হত্যা করা হলে আমরা নীরব দর্শকের ভুমিকায় থাকি, কেউ ছিনতাইয়ের কবলে পড়লে আমরা তাকে উদ্ধার না করেই উল্টো পথে পালাই, আর ভিত্তিহীন কথায় শুধু সন্দেহের কারণে নিরীহ মানুষকে হত্যা করে ফেলি। এ কেমন মনুষ্যত্বের পরিচয় আমরা দিচ্ছি? অথচ পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন,

مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا

অর্থ: যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টির অপরাধ ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে। (সূরা মায়েদাহ, আয়াত : ৩২)

তাই আসুন, আমরা সচেতন হই। অজ্ঞতার যুগের বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করি এবং যাচাই ছাড়া নিরপরাধ মানুষের ওপর চড়াও হওয়া থেকে নিবৃত হই। নিঃসন্দেহে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তার ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত করে।

রাব্বুল আলামিন সমাজে স্থিতিশীলতা দান করুন, আমাদের অপরাধগুলো ক্ষমা করুন, আমাদের মাঝে শান্তি ফিরিয়ে দিন।

এমএফ/

 

 

ফতোয়া/মাসায়েল: আরও পড়ুন

আরও