অত্যাসন্ন ১২ রবিউল আউয়াল; ঈদে মিলাদুন্নবী বিদআত কেন?

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

অত্যাসন্ন ১২ রবিউল আউয়াল; ঈদে মিলাদুন্নবী বিদআত কেন?

পরিবর্তন ডেস্ক ৭:৫১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৮

অত্যাসন্ন ১২ রবিউল আউয়াল; ঈদে মিলাদুন্নবী বিদআত কেন?

আসছে ১২ রবিউল আউয়াল। এ দিবসকে কেন্দ্র করে প্রচলিত রয়েছে এক বিশাল বিদআত ঈদে মিলাদুন্নবী। যদি বলা হয়, এটা কেন বিদআত? উত্তর হল, আল্লাহর কিতাব, রাসূল (সা.) এর সুন্নাত, সাহাবাদের আমল এবং সম্মানিত তিন যুগের কোন যুগে এর কোন অস্তিত্ব ছিল না। তাই এটি বিদআত। কারণ, যে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কমনা করা হবে, কুরআন বা সুন্নাহয় অবশ্যই তার পক্ষে অন্তত একটি দলীল থাকতে হবে। আর মীলাদ মাহফিলের পক্ষে এমন কোন দলীলই নেই। অতএব, এটি একটি বিদআতী ইবাদত - যা হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর পর তৈরি করা হয়েছে। মিশরের ফাতেমীয় শিয়া সম্প্রদায়ের শাসকগণ এটাকে সর্বপ্রথম ইসলামের নামে মুসলমানদের মাঝে চালু করে।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمْ الْإِسْلَامَ دِينًا

“আজকের দিনে তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। তোমাদের উপর আমার নেয়ামতকে পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম।” (সূরা মায়েদাঃ ৩)

এই আয়াতের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, উম্মাতে মুহাম্মাদীর জন্য মনোনীত দ্বীনকে আল্লাহ তাআলা নবী (সা.) এর ওফাতের পূর্বেই পূর্ণ করে দিয়েছেন। তিনি এই বিষয়টি পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন যে, তাঁর ওফাতের পরে লোকেরা কথায় বা কাজে যে সব নতুন প্রথার উদ্ভাবন করে শরীয়তের সাথে যুক্ত করবে, তা বিদআত হিসাবে প্রত্যাখ্যাত হবে। যদিও এগুলোর উদ্দেশ্য ভাল হয়। সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়ীগণ বিদআত থেকে জনগণকে সতর্ক করেছেন ও ভয় প্রদর্শন করেছেন। কেননা এটা ধর্মের ভিতরে অতিরিক্ত সংযোজন, যার অনুমতি আল্লাহ তাআলা কোন মানুষকে প্রদান করেন নি। ইহা আল্লাহর দুশমন ইয়াহুদী-খ্রিষ্টান কর্তৃক তাদের ধর্মে নব নব প্রথা সংযোজনের সাথে সামঞ্জস্য স্বরূপ। সুতরাং এরূপ করার অর্থ এই যে, ইসলাম অসম্পূর্ণ ছিল। মীলাদপন্থীরা মীলাদের মাধ্যমে তা পূর্ণ করে দিলেন। এটা যে কত বড় অপরাধ এবং আল্লাহর বাণীর বিরোধী, তা সর্বজন বিদিত। 

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

« مَنْ أَحْدَثَ فِى أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ »

“আমাদের এই দ্বীনের মাঝে যে নতুন কিছু উদ্ভাবন করবে, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।” সহীহুল বুখারী

তিনি আরও বলেন:

وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ فَإِنَّهَا ضَلاَلَةٌ فَمَنْ أَدْرَكَ ذَلِكَ مِنْكُمْ فَعَلَيْهِ بِسُنَّتِى وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ »

“তোমরা আমার সুন্নাত এবং আমার পরবর্তী খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত পালন করবে। আর তা দৃঢ়তার সাথে ধারণ করবে। সাবধান! তোমরা দ্বীনের মধ্যে নতুন বিষয় আবিষ্কার করা থেকে বিরত থাকবে। কারণ প্রত্যেক নব প্রবর্তিত বিষয়ই বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা”। (তিরমিযী, অনুচ্ছেদ: সুন্নত গ্রহণ, ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ) 

বিখ্যাত আলেমে দ্বীন ইমাম আবু হাফস্ তাজুদ্দীন ফাকেহানী (র.) বলেন, একদল লোক আমাদের কাছে বার বার প্রশ্ন করেছে যে, কিছু সংখ্যক মানুষ মীলাদ নামে রবিউল আওয়াল মাসে যে অনুষ্ঠান করে থাকে, শরীয়তে কি তার কোন ভিত্তি আছে? প্রশ্নকারীগণ সুস্পষ্ট উত্তর চেয়েছিল।

আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে উত্তর দিলাম যে, আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাতে এর পক্ষে কোন দলীল পাই নি এবং যে সমস্ত আলেমগণ মুসলিম জাতির জন্য দ্বীনের ব্যাপারে আদর্শ স্বরূপ, তাদের কারও পক্ষ থেকে এধরণেরে আমলের প্রমাণ পাওয়া যায় নি। অথচ তারা ছিলেন পূর্ববতী যুগের (সাহাবীদের) সুন্নাতের ধারক ও বাহক। বরং এই মীলাদ নামের ইবাদতটি একটি জঘণ্য বিদআত, যা দুর্বল ঈমানদার ও পেট পূজারী লোকদের আবিষ্কার মাত্র। 

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া (র.) বলেন, এমনি আরও বিদআতের উদাহরণ হল, কিছু সংখ্যক মানুষ রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জন্ম দিবসকে ঈদ হিসাবে গ্রহণ করত: এ উপলক্ষে মীলাদ মাহফিলের আয়োজন করে থাকে। অথচ রাসূলের (সা.) সঠিক জন্ম তারিখ সম্পর্কে আলেমগণ যথেষ্ট মতবিরোধ করেছেন। এ ধরণের অনুষ্ঠান পালনকারীদের দু’টি অবস্থার একটি হতে পারে। হয়ত তারা এব্যাপারে ঈসা (আ.) এর জন্ম দিবস পালনের ক্ষেত্রে নাসারাদের অনুসরণ করে থাকে অথবা নবী (সা.) এর প্রতি অতি ভালবাসা ও সম্মান দেখানোর জন্য করে থাকে। 

যাই হোক এ কাজটি সাহাবাদের কেউ করেন নি। যদি কাজটি ভাল হত, তাহলে অবশ্যই তারা কাজটি করার দিকে আমাদের চেয়ে অনেক অগ্রগামী থাকতেন। তাঁরা রাসূল (সা.) কে আমাদের চেয়ে অনেক বেশী ভালবাসতেন এবং সম্মান করতেন। তাঁরা ছিলেন ভাল কাজে আমাদের চেয়ে অনেক বেশী আগ্রহী। তবে তাদের ভালবাসা ও সম্মান ছিল তাঁর অনুসরণ, আনুগত্য, তাঁর আদেশের বাস্তবায়ন এবং প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে তাঁর সুন্নাতকে বাস্তবায়িত করার ভেতর। তিনি যে দ্বীন নিয়ে প্রেরিত হয়েছিলেন, তার প্রচার ও প্রসারের ভিতরে এবং অন্তর-মন, জবান এবং শক্তি দিয়ে সে পথে জিহাদের মাধ্যমে। এটিই ছিল উম্মতের প্রথম যুগের আনসার ও মুহাজেরীনে কেরাম এবং উত্তম ভাবে তাদের অনুসারী তাবেয়ীগণের পথ। 

মীলাদ নামের এ বিদআতটির প্রতিবাদে ছোট-বড় অনেক কিতাব রচনা করা হয়েছে। এতে বিদআত ও নাসারাদের সাথে সাদৃশ্য থাকার সাথে সাথে অন্যান্য মীলাদ অনুষ্ঠানের দ্বার উন্মুক্ত করার আশঙ্কা রয়েছে। যেমন মাশায়েখ ও নেতাদের মীলাদ পালন করা, যাতে মন্দ কাজের আরও অনেক দরজা খোলার ভয় রয়েছে। বাস্তবেও তাই হয়েছে। বর্তমানে এ মীলাদ মাহফিল শুধুমাত্র রাসূল (সা.)এর জন্ম দিবসের সাথে সীমাবদ্ধ নয়। এখন নেতা-নেত্রী, পীর-ফকীর, শায়েখ-মাশায়েখ এমনকি সাধারণ মানুষের জন্ম দিবসেও মীলাদ মাহফিল উদযাপন করা হয়ে থাকে।

রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে এমন বিদআতি কার্যকলাপ হতে বিরত থেকে সঠিক পন্থায় দ্বীন পালনের তাওফিক দান করুন। আমীন।

এমএফ/

আরও পড়ুন...
নবীজির (সা.) সৌন্দর্য সম্পর্কে সাহাবাদের পাঁচ বর্ণনা
মিলাদুন্নবী কি সীরাত আলোচনার অনুষ্ঠান?
ঈদে মিলাদুন্নবী: নবীপ্রেম না অবাধ্যতা
‘ঈদে মিলাদুন্নবী : নবীজিকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন নাকি বিদআত?
অত্যাসন্ন ১২ রবিউল আউয়াল; ঈদে মিলাদুন্নবী বিদআত কেন?
সীরাতুন্নবী ও মিলাদুন্নবী : পার্থক্য ও সংশ্লিষ্ট কথা
ঈদে মিলাদুন্নবী বিদআতে হাসানা, একটি ভ্রান্ত কথা

 

ফতোয়া/মাসায়েল: আরও পড়ুন

আরও