কোথায় আছে জান্নাত জাহান্নাম? তা কি এখন বিদ্যমান?

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

কোথায় আছে জান্নাত জাহান্নাম? তা কি এখন বিদ্যমান?

মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ ৬:৩৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৩, ২০১৮

কোথায় আছে জান্নাত জাহান্নাম? তা কি এখন বিদ্যমান?

আল্লাহতে বিশ্বাসী মাত্রই আমরা জান্নাতের প্রতি আগ্রহী ও জাহান্নাম হতে ভীত। এজন্যে আমরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকি, এবং আল্লাহর হুকুম মেনে নেক আমলে ব্রতী হই। কখনো কৌতূহল হয় প্রতিশ্রুত জান্নাত ও জাহান্নাম কি পরবর্তীতে সৃষ্টি করা হবে, নাকি এখনও তা বিদ্যমান? বিদ্যমান হলে তা কোথায় আছে?

এ নিবন্ধে ইনশাআল্লাহ, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এ প্রশ্নেরই উত্তর দেওয়া হবে। নিম্নে তা বিবৃত করা হল। 

প্রথমেই জেনে নিই জান্নাত জাহান্নাম কি বর্তমানে বিদ্যমান?

জান্নাত জাহান্নাম বর্তমানে বিদ্যমান আছে। হযরত আনাস (রা.) মিরাজের ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন-

ثم انطلق بي جبريل حتى انتهى بي إلى سدرة المنتهى، فغشيها ألوانٌ لا أدري ما هي، قال: ثم دخلت الجنة، فإذا فيها جنابذ اللؤلؤ، وإذا ترابها المسك

“তারপর জিবরীল (আ.) আমাকে নিয়ে চলতে থাকে। সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছলে তাকে কতক রঙ এসে ডেকে ফেলে। আমি বুঝতে পারিনি এটি কি? তিনি বলেন, ‘তারপর আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম’। জান্নাতকে আমি দেখতে পেলাম, মণি-মুক্তার গম্বুজ। আরও দেখতে পেলাম, জান্নাতের মাটি হল, মিসক”। -বুখারি, হা: ৩৪৯; মুসলিম, হা: ১৬২ 

وعن أبي هريرة رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : لـَمّا خلق الله الجنة والنار أرسل جبرائيل إلى الجنة، فقال: انظر إليها، وإلى ما أعددت لأهلها فيها، فجاء فنظر إليها، وإلى ما أعد الله لأهلها فيها... ثم قال: اذهب إلى النار فانظر إليها، وإلى ما أعددت لأهلها فيها، فنظر إليها فإذا هي يركب بعضها بعضاً

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করার পর জিবরীল আলাইহিস সালামকে জান্নাতে পাঠান এবং বলেন, তুমি জান্নাতের দিকে তাকাও এবং দেখো আমি জান্নাতে জান্নাতিদের জন্য কি কি প্রস্তুত করে রেখেছি। তারপর সে জান্নাতে প্রবেশ করে এবং আল্লাহ তাআলা জান্নাতিদের জন্য কি কি তৈরি করে রেখেছেন তা দেখেন। তারপর আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, তুমি এখন জাহান্নামে প্রবেশ কর, তারপর সে জাহান্নামে প্রবেশ করল, আল্লাহ বললেন, দেখো আমি জাহান্নামীদের জন্য কি কি তৈরি করে রেখেছি। তারপর সে জাহান্নামের দিকে তাকিয়ে দেখে জাহান্নামের এক অংশ অপর অংশের উপর উথলে পড়ছে।” -তিরমিযি, হা:২৫৬০; নাসায়ী, হাদিস নং: ৩৭৭২ 

ইমাম তহাবী রহ. বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, জান্নাত ও জাহান্নাম আল্লাহর মাখলুক, কখনো তা ধ্বংস হবে না এবং ক্ষয় হবে না। কারণ, আল্লাহ মাখলুককে সৃষ্টির পূর্বে জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করেন। আর জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টির জন্য তিনি মাখলুক হতে অধিবাসী সৃষ্টি করেন। যাদের তিনি জান্নাত দেবেন তা হবে তার পক্ষ হতে তাদের প্রতি অনুগ্রহ। আর যাদের তিনি জাহান্নামে দেবেন তা হবে তার প্রতি আল্লাহর পক্ষ হতে ইনসাফ। প্রত্যেকেই তার সুবিধা অনুযায়ী আমল করবে এবং তাকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সেদিকে ধাবিত হবে। আর ভালো ও মন্দ বান্দার উপর নির্ধারিত। -আকীদাতু-তহাবী, পৃ: ১২

উপরের আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারলাম জান্নাত জাহান্নাম বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে। 

এ ব্যাপারে হাদিসের আরও প্রমাণ:

কা’ব ইবন মালেক (রা.) হতে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

إنما نسمة المؤمن طائرٌ يعْلُقُ في شجر الجنة، حتى يرجعه الله تبارك وتعالى إلى جسده يوم يبعثه

“মুমিনের আত্মা জান্নাতে পাখির মত, জান্নাতের গাছের সাথে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত ঝুলতে থাকবে। তারপর যখন কিয়ামতের দিন সমগ্র মানুষকে পুনরায় জীবন দান করা হবে, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের রুহকে তাদের দেহে আবার ফেরত দেবেন”-মুসনাদে আহমাদ পৃ: ৪৫৫/৩; নাসায়ী- হা: ২০৭৩; ইবনে মাযাহ: ৪২৭১; সহিহ নাসায়ী পৃ: ৪৪৫/২; সিলসিলাতুল আহাদীস-সহীহাহ: ৭২০/২, ৯৯৫ 

কোথায় আছে জান্নাত?

আল্লাহ তাআলা বলেন, كَلَّآ إِنَّ كِتَٰبَ ٱلۡأَبۡرَارِ لَفِي عِلِّيِّينَ وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا عِلِّيُّونَ “কক্ষনো নয়, নিশ্চয় নেককার লোকদের আমলনামা থাকবে ইল্লিয়্যীনে । আপনি কি জানেন ‘ইল্লিয়্যীন’ কী?” –সূরা মুতাফফিফীন: ১৮-১৯ 

আব্দুল্লাহ ইবন‌ে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘ইল্লিয়্যীন’ অর্থ জান্নাত, অথবা সপ্তম আকাশে আরশের নিচে অবস্থিত একটি স্থান। -তাফসীরে বাগাভী, ৪৬০/৪; তাফসীরে ইবন কাসীর ৪৮৭/৪ 

ইমাম ইবনে কাসীর রহ. আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ইল্লিয়্যিন শব্দটি ‘উলু শব্দ হতে নির্গত। যখন কোন বস্তু উপরে অবস্থান করে, তখন তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং তার মহত্ব বাড়তে থাকে। এ কারণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার বড়ত্ব ও মহত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন - وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا عِلِّيُّونَ  “কিসে তোমাকে জানাবে ‘ইল্লিয়্যীন’ কী”? –সূরা মুতাফফিফীন: ১৯ 

ইমাম ইবন্ কাসির রহ. সূরা যারিয়াত এর ২২ নং আয়াত-  وَفِي ٱلسَّمَآءِ رِزۡقُكُمۡ وَمَا تُوعَدُونَ “আকাশে রয়েছে তোমাদের রিযিক ও প্রতিশ্রুত সব কিছু” এর তাফসীরে বলেন, এখানে তোমাদের রিযিক অর্থ বৃষ্টি আর তোমাদের যা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, তার অর্থ হল, জান্নাত -তাফসীর ইবনে কাসীর: ২৩৬/৪ 

কোথায় আছে জাহান্নাম?

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন- كَلَّآ إِنَّ كِتَٰبَ ٱلۡفُجَّارِ لَفِي سِجِّينٖ  وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا سِجِّينٞ  كِتَٰبٞ مَّرۡقُومٞ “কখনো নয়, নিশ্চয় পাপাচারীদের আমলনামা সিজ্জীনে। কিসে তোমাকে জানাবে ‘সিজ্জীন’ কী? লিখিত কিতাব।” –সূরা মতাফফিফীন:৭-৯ 

এ বিষয়ে ইমাম ইবনে কাসীর রহ., ইমাম বাগাভী রহ. ও ইমাম ইবনে রজব রহ. একাধিক হাদিস উল্লেখ করেন, তাতে তিনি বলেন, সিজ্জীন হল, সপ্ত যমীনের নিচে। অর্থাৎ, যেমনি-ভাবে জান্নাত সাত আসমানের উপরে অনুরূপভাবে জাহান্নাম সপ্ত যমীনের নীচে একটি স্থান। -তাফসীরে বাগাভী, ৫৪৮/৪, তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪৮৬, ৪৮৭/৪

এমএফ/

আরও পড়ুন...
মৃত্যু যেন হয় জান্নাতের পথে যাত্রা
হাদিসের আলোকে ভালো মৃত্যুর কিছু নিদর্শন

 

মৃত্যু ও পরকাল : আরও পড়ুন

আরও