‘মাজুফল’ এক ভয়ানক প্রতারণা!

ঢাকা, শনিবার, ২৩ মার্চ ২০১৯ | ৯ চৈত্র ১৪২৫

‘মাজুফল’ এক ভয়ানক প্রতারণা!

পরিবর্তন ডেস্ক ১০:১৯ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১৪, ২০১৯

‘মাজুফল’ এক ভয়ানক প্রতারণা!

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে ঘরে বসেই ফ্যাশনেবল ড্রেস থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই আমরা অনলাইনের মাধ্যমে পেয়ে যাচ্ছি। এমনকি স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন প্রোডাক্ট-ও পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন অনলাইন পেইজ-এ। বিজ্ঞাপনদাতারা নানান রকম লোভনীয় কথাবার্তা ব্যবহার করে অনেক রকম জিনিসই গছিয়ে দিচ্ছেন আমাদের হাতে। কিন্তু এসব জিনিস আসলেই কতটা ভরসার উপযুক্ত, তা কি আমরা যাচাই করে দেখছি একটিবারও?

ইদানিং রুপচর্চা বিষয়ক নানান গ্রুপে ‘মাজুফল’ নিয়ে নানান রকম প্রশ্ন ও আলোচনা হচ্ছে। এই সমস্ত গ্রুপ বা পেইজ-এর দাবি যে এই ফল ব্যবহার করে ব্রণ, মেছতার দাগসহ বিভিন্ন গোপন সমস্যার সমাধান করা যায়! সবচাইতে ভয়াবহ ব্যাপার হল, তারা এমনটাও দাবি করছেন যে এই ফল ভ্যাজাইনা বা যোনি টাইট করার একটি উত্তম মাধ্যম এবং তার জন্য তারা যেসব মেথড বর্ণনা করছেন তা এককথায় বিশ্রী, বীভৎস ও ভয়াবহ!! অবাক হচ্ছেন? আসুন তাহলে জেনে নেই এ সম্পর্কে বিস্তারিত।

কী এই মাজুফল?

মাজুফল এর ইংরেজি নাম হচ্ছে ‘Gall nut’ বা ‘Oak Gall’। এটি মূলত একটি চাইনিজ ফল। আসলে ঠিক ফলও না, বোলতা জাতীয় একধরনের পতঙ্গের কারণে এটি হয়ে থাকে। কিভাবে তা সম্ভব? আপনি হয়তো জানেন না, এই মাজুফল আসলে ওক গাছের বাকল ও বোলতার বর্জ্য পদার্থ দিয়ে তৈরি একটি বাসা যার ভেতর সেই বোলতার লার্ভা বেড়ে ওঠে। বোলতার প্রজননের সময় এরা ওক গাছের গায়ে ছিদ্র করে এবং ডিম পাড়ে।

এই ছিদ্রের ফলে গাছের গায়ে ট্যানিক এসিড (Tannic acid) এবং গ্যালিক এসিড (Gallic acid) নামক এক প্রকার রস বের হয় এবং বোলতার বর্জ্যের সাথে মিশে একটি ফল বা বলের আকৃতি তৈরি করে। এই বলের ভেতরেই সেই বোলতার লার্ভা বেড়ে ওঠে এবং যখন পূর্ণাঙ্গ রুপ নেয়, তখন তা ছিদ্র করে বের হয়ে আসে। এই পরিত্যক্ত বল বা বাসাটিই হচ্ছে মাজুফল!

শুনেই একটু হলেও কি গা  গুলিয়ে উঠছে না? জানেন কি, বিভিন্ন অসাধু ব্যবসায়ীরা এই মাজুফল দিয়ে সরল মানুষদের প্রতারিত করছে? কীভাবে? দেখুন তবে।

মাজুফল যেভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে

১. মাজুফল ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহার করা হয়। এটি থেকে কালি তৈরি করা হয়। টেক্সটাইল বা লেদার শিল্পেও এর ব্যবহার রয়েছে। চীন, ইন্দোনেশিয়ায় এটি প্রাকৃতিক ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ফেসবুকে অনেকেই বলছেন এটি ব্রেস্ট টাইটনিং ও ভ্যাজাইনা টাইটনিং- এর কাজ করে। তবে বাস্তবে এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায় নি।

২. এটি ব্যবহার করার জন্য ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ভয়ঙ্কর পদ্ধতির উল্লেখ করছেন যা আসলে ভয়াবহ স্বাস্থ্যহানির কারণ হতে পারে। যেমন কেউ বলছেন এই ফল গুঁড়ো করে বা পানিতে ভিজিয়ে বা সেদ্ধ করে, সেই পানিতে কটন বল ভিজিয়ে তা ভ্যাজাইনাতে বেশ কিছুক্ষণ রেখে দিতে! এভাবে পর পর সাত দিন ব্যবহার করলে ভ্যাজাইনা টাইট হয়ে যাবে!

৩. আবার কেউ বলছেন, এই ফল গুঁড়ো করে তার সাথে মধু মিশিয়ে ছোট বলের মত করে নিতে। তারপর সেই বল ঘুমানোর ৪-৫ ঘণ্টা আগে ভ্যাজাইনাতে রেখে দিতে এবং তাতে ভাজাইনা টাইট হয়ে যাবে। কি ভয়ংকর কথা! সেই সাথে এও বলে দেয়া হয় যে এই পানি ভেজানো কটন বল বা গুঁড়োর পেস্ট ব্যবহারের ফলে ভ্যাজাইনাতে একটু জ্বলুনি হতে পারে। জেনে রাখুন, ভ্যাজাইনাতে মলম, তরল, পেস্ট বা যে কোন কিছু দেয়ার পর যদি জ্বলুনি শুরু হয় তবে তা ভ্যাজাইনার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

৪. এমন আরো অনেক জঘন্য উপায়ে ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে উচ্চ মূল্যে এই মাজুফল বা গাল নাট দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। অনেক নারীই আছেন যার একাধিক বাচ্চা প্রসবের পরে বা আরো অনেক করণে চিন্তায় পড়েন। অসাধু ব্যবসায়ীরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহারটাই করে যাচ্ছেন। এর ফলে নারীরা শুধু যে ঠকছেন তা নয়, এতে করে নিজেদের অজান্তেই শরীরের অনেক বড় ক্ষতিও করে ফেলছেন।

তাই এখনি হয়ে যান সাবধান!

নারীর শরীরের সবথেকে সেনসিটিভ যায়গাগুলোর মধ্যে ভ্যাজাইনা অন্যতম। নিজের সুস্বাস্থের পাশাপাশি একটি সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য এর ভূমিকা অনেক। তাই এ ব্যাপারে নারীদের চিন্তা থাকাই স্বাভাবিক। ভ্যাজাইনা এতই বেশি সেনসিটিভ যে চিকিৎসকগণের ভেতরে সাবান বা অ্যান্টিসেপ্টিক পর্যন্ত ব্যবহার করতে নিষেধ করেন। আর সেখানে এরকম একটি জঘন্য জিনিস এত বিচ্ছিরিভাবে ব্যবহার করার কোনো মানে হয় কি?

সৃষ্টিকর্তা নারীদেহের সব অঙ্গই সুরক্ষার জন্য প্রাকৃতিকভাবেই ব্যবস্থা করে রেখেছেন। তারপরেও নারীদের ফাঙ্গাল ইনফেকশন, ক্যান্সার, ওভারিয়ান ক্যান্সারসহ আরো বিভিন্ন ভয়ানক রোগ হয় শুধুমাত্র নিজেদের অসাবধানতার কারণে। যার শেষ পরিনতি মৃত্যু।

বিজ্ঞাপনদাতাদের লোভনীয় কথাবার্তায় যেকোনো জিনিস অন্ধের মত ব্যবহার করতে ঝাপিয়ে পড়বেন না। যেকোনো জিনিস ব্যবহারের আগে তা সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন, বুঝুন এবং তারপরেই অগ্রসর হন।

ইসি/