কোটি নাগরিকের এনআইডি পাওয়ার অপেক্ষা বাড়ছেই

ঢাকা, রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮ | ৩ ভাদ্র ১৪২৫

কোটি নাগরিকের এনআইডি পাওয়ার অপেক্ষা বাড়ছেই

মো. হুমায়ূন কবীর ৯:০৩ অপরাহ্ণ, জুন ১৩, ২০১৮

print
কোটি নাগরিকের এনআইডি পাওয়ার অপেক্ষা বাড়ছেই

দেশের এক কোটি নতুন ভোটারের লেমিনেটেড জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার জন্য আরো অপেক্ষা করতে হবে। ২০১২ সালের পর যেসব নাগরিক ভোটার হয়েছেন তাদের গুটিকয়েক বাদে বাকিরা স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র (স্মার্টকার্ড) অথবা লেমিনেটেড কার্ড কোনোটিই পাননি। গত ফেব্রুয়ারি থেকে এসব নাগরিকদের হাতে লেমিনেটেড কার্ড তুলে দেয়ার ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত তা প্রস্তুত করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)।  

ইসি সূত্র জানায়, বর্তমানে নাগরিকের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে স্মার্টকার্ড। ২০১২ সালের পর থেকে যারা ভোটার হয়েছেন তাদেরকে বছরের পর বছর জাতীয় পরিচয়পত্র না পাওয়ায় ব্যাংক একাউন্ট খোলা, মোবাইল ফোনের সিম রেজিস্ট্রেশনসহ নানা সুবিধা পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। তাই এসব নাগরিকের হাত প্রাথমিকভাবে লেমিনেটেড কার্ড তুলে দিয়ে এ সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা নেয় কমিশন। 

সূত্র জানায়, নতুন এসব ভোটারদের জন্য একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিলামের মাধ্যমে চুক্তি করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী ৯৩ লাখ লেমিনেটেড জাতীয় পরিচয়পত্র গত ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সময় মতো তা না দিতে পারা এবং কার্ড মানসম্মত না হওয়ায় তা গ্রহণ না করার জন্য সুপারিশ করেছে ইসির এ সংক্রান্ত কমিটি। এমন পরিস্থিতিতে ওই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিল করা হবে নাকি ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব কার্ড পুনরায় প্রিন্ট করা হবে তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি।

এতে কবে এসব ভোটাররা কার্ড পাবেন তা নিশ্চিত কেউ বলতে পারছেন না।

এ বিষয়ে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ জানান, যেসব নাগরিককে এখনই স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া যায়নি তাদেরকে আপাতত: লেমিনেটেড কার্ড দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু ওই কার্ড নাকি মানসম্মত হয়নি বলে শুনেছি। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।

এ বিষয়ে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন্স) ও ইসির যুগ্ম-সচিব আব্দুল বাতেন বলেন, ৯৩ লাখ লেমিনেটেড কার্ড প্রিন্ট করা হয়েছে। ওই সব কার্ডের মান ভালো পাওয়া যায়নি। এছাড়া নির্দিষ্ট সময়ে ওইসব কার্ড সরবরাহ করতে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়েছে। সব বিবেচনায় এসব কার্ড গ্রহণ না করার জন্য আমরা নির্বাচন কমিশনকে সুপারিশ করেছি।

ইসির কর্মকর্তারা জানান, দেশের ৯ কোটির বেশি মানুষের হাতে স্মার্ট বা লেমিনেটেড কার্ড রয়েছে। বর্তমানে ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ১৮ লাখ। এ হিসাবে এক কোটির বেশি নাগরিকের হাতে জাতীয় পরিচয়পত্র নেই।

জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৯৩ লাখ জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করতে স্মার্ট টেকনোলজিস বিডি লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেয় ইসি। এতে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৯ কোটি টাকা। গত ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ওই প্রতিষ্ঠানকে এসব কার্ড সরবরাহের কথা থাকলেও তা গত মার্চে সরবরাহ করে। কিন্তু কার্ডের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক আব্দুল বাতেনকে প্রধান করে কমিটি গঠন করে। সম্প্রতি ওই কমিটি তার রিপোর্টে এসব কার্ডের মান ভালো নয় উল্লেখ করে তা গ্রহণ না করার সুপারিশ করেছে।

ওই কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, নিম্নমানের কাগজে এসব কার্ড প্রিন্ট করা হয়েছে। এতে ১৫০ জিএসএম (গ্রামস পার স্কয়ার মিটার) মানের কাগজ দেয়ার কথা থাকলেও কিছু কার্ড ১০০ জিএসএম কাগজে প্রিন্ট করা হয়েছে। আবার কিছু কিছু কার্ড ১২০, ১৩০ ও ১৫০ জিএসএম কাগজে প্রিন্ট করা হয়েছে। ওই কার্ডের লেমিনেটিংয়ে যে পেপার (পাউস) ব্যবহার করা হয়েছে তাও নিম্নমানের। এছাড়া চুক্তিতে নতুন প্রিন্টার ও লেমেনেটিং মেশিন ইসিকে সরবরাহের কথা উল্লেখ থাকলেও এ কোম্পানিটি পুরাতন মেশিনে এসব কাজ করেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, টেন্ডারে কার্যাদেশ দেয়ার ক্ষেত্রেও বেশি দর ধরা হয়। এ টেন্ডারে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্রিয়েটিভ বাংলাদেশ নামক প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন ৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা দর উদ্ধৃত করলেও জাল কাগজপত্র দেয়ায় প্রতিষ্ঠানটি নন-রেসপনসিভ করা হয়।

অপর প্রতিষ্ঠান এম এন মল্লিক এন্ড কোম্পানি ৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা দর উদ্ধৃত করলেও ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ওই পরিমাণ কার্ড সরবরাহ করতে পারবে না বলে এক মাস সময় চায়। পরে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ করার শর্তে স্মার্ট টেকনোলজিস বিডি কোম্পানি নামের প্রতিষ্ঠানকে বেশি দরে কাজ দেয়া হয়। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানটি ডিসেম্বরের পরিবর্তে মার্চে কার্ড সরবরাহ করে।

জানা যায়, স্মার্ট টেকনোলজিস স্বীকার করেছে যে সরবরাহকৃত কার্ডের ২০ শতাংশের মান খারাপ হয়েছে। আর মানসম্মত কার্ড দিতে না পারার অভিযোগ এনে তাদের কার্যাদেশ কেন বাতিল করা হবে না- তা জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে ইসি। তার জবাবে কোম্পানিটি পিপিআর ও পিপিএ অনুযায়ী যেসব কার্ডের মান খারাপ সেগুলো ঠিক করে দেওয়ার জন্য আরো দুইমাস চেয়েছে কোম্পানিটি।

নাম প্রকাশে ইসির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এই কোম্পানিটিকে কোনো ভাবেই ক্ষমা করা উচিত নয়। তাদের ভুলের জন্য কমিশনের ভাবমূর্তি খারাপ হচ্ছে। এ বিষয়ে কমিশনের কঠিন হওয়া উচিত।

ইসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১০ কোটি ৪০ লাখের উপরে ভোটার রয়েছে। প্রথম থেকে এনআইডি সংশোধন বা হারানো সেবা বিনামূল্যে দেওয়া হলেও ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ফি নেওয়া শুরু করে কমিশন।

এইচকে/এসবি

 
.


আলোচিত সংবাদ