বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ‘খুদে আইনস্টাইন’

ঢাকা, সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮ | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ‘খুদে আইনস্টাইন’

পরিবর্তন ডেক্স ১১:৩৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৬, ২০১৬

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ‘খুদে আইনস্টাইন’

‘প্রিয় সুবর্ণ, আশা করছি তুমি তোমার কঠোর পরিশ্রম এবং অর্জনের জন্য গর্ব অনুভব কর। তোমার মতো শিক্ষার্থী আমেরিকায় আরও দরকার, যারা স্কুলে কঠোর পরিশ্রম করার চেষ্টা করে, বড় স্বপ্ন দেখে এবং আমাদের সমাজের পরিবর্তন ঘটায়। আমাদের দেশ অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। কিন্তু আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হই তাহলে এসব মোকাবিলা করা কোনো ব্যাপারই নয়। তুমি তোমার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাও, আমি তোমার সঙ্গে আছি। তোমার কাছে আমি অনেক বড় কিছু প্রত্যাশা করি।’ –বারাক ওবামা। গত ২ নভেম্বর আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট এই চিঠিটি পাঠিয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চার বছর বয়সী সুবর্ণ আইজ্যাককে।

খুদে আইনস্টাইন হিসেবে পরিচিতি পাওয়া সুবর্ণ বাবা-মায়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছে। এক বছর বয়সী সুবর্ণ আইজ্যাক বারী নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালের বেডে জ্বরে কাতরাচ্ছিল। তার বাবা রাশীদুল বারী বললেন, আই লাভ ইউ মোর দ্যান এনিথিং ইন দ্য ইউনিভার্স। সুবর্ণ বলল, ইউনিভার্স অর মাল্টিভার্স? কলেজ শিক্ষক রাশীদুল বারী চমকে গেলেন। কিন্তু তখনও তিনি জানতেন না এই সুবর্ণ ৩ বছর বয়সে অংক, পদার্থ বিজ্ঞান এবং রসায়নে দক্ষতা দেখিয়ে সারা পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিবে। ইতোমধ্যেই সুবর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হৈ-চৈ ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুবর্ণর মেধা বিস্ময় সৃষ্টি করেছে সর্বত্র। যে এখনও স্কুলেই যায়নি, সে কীভাবে জ্যামিতি, এ্যালজাবরাসহ রসায়নের জটিল বিষয়ের সহজ সমাধান দিচ্ছে। অক্ষর জ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রক্রিয়া অবলম্বন করা ছাড়াই কীভাবে সে ইংরেজি বই অবলিলায় পাঠ করছে? কৌতুহলের পাশাপাশি জিজ্ঞাসার অন্ত নেই বিস্ময় শিশু সুবর্ণকে ঘিরে। এর ৫টি প্রধান কারণ হচ্ছে, (১) দেড় বছর বয়সে সে রসায়নের পর্যায় সারণী তথা ক্যামিস্ট্রি পিরিয়ডিক টেবল মুখস্ত করে ফেলেছে, (২) দুই বছর বয়সে সে যুক্তরাষ্ট্রের কলেজে ইন্টারভিউ দিয়েছে, (৩) ভয়েস অব আমেরিকায় সাক্ষাৎকার প্রদান, (৪) ৩ বছর বয়সে সে লেবুর সাহায্যে ব্যাটারি এক্সপেরিমেন্ট করে এবং (৫) সাড়ে তিন বছর বয়সে খ্যাতনামা একটি কলেজের প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎকারের আমন্ত্রণ পেয়েছে। মাত্র দেড় বছর বয়সে রসায়নের পর্যায় সারণী সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা এবং তা মুখস্ত করে সুবর্ণ। যথারীতি ওর মা ওকে অংক শিখাচ্ছিলেন। হঠাৎ সুবর্ণ বলল, ইফ ওয়ান প্লাস ওয়ান ইক্যুয়াল্টো টু, দ্যান ২ প্লাস ২=৪ এবং এন+এন=২ এন, তাই না? রাশীদুল বারী তখন পাশের রুমে তার ছাত্রদের পেপার দেখছিলেন। এমন বিস্ময়কর কথা শুনে তিনি দৌড়ে সুবর্ণর কাছে চলে গেলেন। তার চোখে আনন্দের জল। স্ত্রী জানতে চাইলেন, কাঁদছ কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বারি বললেন, জানো আমাদের সামনে কে বসে আছে? কার্ল ফাইডরিচ গোস (জার্মানের অঙ্কশাস্ত্র বিশেষজ্ঞ)। দেড় বছর বয়সী পুত্রের অংক শাস্ত্র প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে রাশীদুল বারী তাকে এডভান্সড ম্যাথ এন্ড সায়েন্স এর লেসন দেয়া শুরু করলেন। আর এভাবেই মাত্র ২ বছর বয়সে সে রসায়নের পিরিয়ডিক টেবিল মুখস্ত করে ফেলল। এ অবিশ্বাস্য কথাটি সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে বারী সাইন্স ল্যাব এবং সোস্যাল মিডিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ে এ বিস্ময়কর প্রতিভার কথা। এমনি অবস্থায় মেডগার এভার্স কলেজের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড পোজম্যান সুবর্ণের মেধা যাচাই করতে চান। সুবর্ণ পর্যায় সারণীর সবগুলো এলিমেন্ট বলে পোজম্যানকে অবাক করে দেয়। সেদিন তিনি এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, ১ বছর পর অর্থাৎ গত ২৫ নভেম্বর আবার তাকে ডেকে পাঠালেন পোজম্যান।

এরপর ডাক পড়ে ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগ থেকে। বাবা বারী তাকে নিয়ে যান ওয়াশিংটন ডিসিতে ভয়েস অব আমেরিকা স্টুডিওতে। সেখানে সাবরিনা চোধুরী ডোনা তার ইন্টারভিউ নেন এবং বছরের সেরা কনিষ্ঠ ইন্টারভিউ হিসাবে তারা এটা বাছাই করে ইংরেজি নববর্ষে পুনঃপ্রচার করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘঠনাটি ঘটে যখন আড়াই বছরের এই শিশুটি পর্যায় সারণীর সব এলিমেন্টগুলোর নাম বলে যাচ্ছিল অবলিলায়। বাংলা বিভাগের প্রধান রোকেয়া হায়দারসহ সকল সাংবাদিক অবাক বিস্ময়ে তার এই প্রতিভা অবলোকন করেন।
ছোট্টমনি সুবর্ণ এরই মধ্যে অনেকগুলো সায়েন্টিফিক এক্সপেরিমেন্ট করে ফেলেছে। যার একটি ইলেকট্রিক ব্যাটারি। সে জন্য সে আবার পদার্থবিদ্যা এবং রসায়ন অধ্যায়ন করছে। বিভিন্ন রকম ব্যাটারি সে বানাচ্ছে। তার একটি হচ্ছে লেবু ব্যাটারি। যেটা বানাতে তার দরকার হয় ৪টি লেবু, ৪টি পেরেক, ৪টি পেনি এবং ৫টি এলিগেটর ক্লিপ। এগুলো দিয়ে সে ইলেকট্রিক সার্কিট বানিয়ে পোটেনশিয়াল ডিফারেন্স সৃষ্টি করে লাইট জ্বালাতে পারে। ২০১৫ সালের ১২ জুন ড. ড্যানিয়েল কাবাট, যিনি বর্তমানে লিমন কলেজে ফিজিক্স চেয়্যার, সুবর্ণর এই প্রতিভা দেখার জন্য তাকে লিমন কলেজে আমন্ত্রণ জানান এবং সুবর্ণ ব্যাটারি বানিয়ে তাকে মুগ্ধ করে। সর্বশেষ আমন্ত্রণ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল থেকে।
চট্টগ্রামের সন্তান রাশেদুল বারী উচ্চ শিক্ষার জন্যে নিউইয়র্কে আসার পর ব্রঙ্কসের লিমন কলেজে অধ্যায়ন করেছেন। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্ক সিটি ইউনিভার্সিটির বারুখ কলেজে অংকের এডজাঙ্ক অধ্যাপক এবং একইসাথে নিউ ভিশন চার্টার হাই স্কুল ফর এডভান্সড ম্যাথ এন্ড সায়েন্সে পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক। জেরুজালেম পোস্টে তিনি নিয়মিতভাবে কলাম লিখছেন। সুবর্ণর মা রেমন বারী ব্রঙ্কস কম্যুনিটি কলেজ থেকে একাউন্টিংয়ে ডিগ্রি নিয়েছেন। সুবর্ণর একমাত্র বড় ভাই রিফাত এলবার্ট বারীর বয়স ১২। সেও অসাধারণ মেধার অধিকারী। সপ্তম গ্রেডে পড়ছে এবং ৭ ভাষায় কম্প্যুটার প্রোগ্রামিংয়ে অভ্যস্ত। সে হাই স্কুলে না গিয়েই বিশ্ববিখ্যাত হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে চায়। এজন্যে সে ইতোমধ্যেই ৩ বার এস এ টি প্রদান করেছে। সুবর্ণের জন্ম ২০১২ সালের ৯ এপ্রিল। সুবর্ণ তার বাবার ল্যাবরেটরিতে যাচ্ছে এবং অঙ্ক শাস্ত্র ছাড়াও রসায়নের বিভিন্ন বিভাগ সম্পর্কে ধারণা নিচ্ছে। এখনও সে স্কুলে ভর্তি হয়নি। আর এরইমধ্যে সে তার মেধার বিস্ময় সৃষ্টি করেছে।

এরআরপি/এসবি