ঈদ হবে না ছেলেধরা গুজবে নিহত মিনুর পরিবারের

ঢাকা, ৮ আগস্ট, ২০১৯ | 2 0 1

ঈদ হবে না ছেলেধরা গুজবে নিহত মিনুর পরিবারের

আব্দুল্লাহ আল নোমান, টাঙ্গাইল ৭:৪৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৭, ২০১৯

ঈদ হবে না ছেলেধরা গুজবে নিহত মিনুর পরিবারের

টাঙ্গাইলে ছেলে ধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়ে নিহত ভ্যানচালক মিনু মিয়া তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। স্বামীকে হারিয়ে ৭ বছরের ছেলে ও বৃদ্ধ শ্বশুরকে নিয়ে চারিদিকে অন্ধকার দেখছেন মিনুর সাত মাসের অন্তসত্ত্বা স্ত্রী রিনা আক্তার।

কিভাবে চলবে তার পরিবার ও সংসার। আর মাত্র ক’দিন পরেই কোরবানির ঈদ হলেও তাদের মধ্যে ঈদের আনন্দ নেই। এবার ঈদ করাও হবে না তাদের। মিনুর পরিবার এই ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শাস্তির দাবি করেন।

নিহত মিনুর পরিবার বাদি হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই দফায় ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এখনো মিনুর ভ্যানটি বাড়ির পাশেই পড়ে রয়েছে। কিন্তু নেই শুধু মিনু।

নিহত মিনু মিয়া জেলার ভূঞাপুুর উপজেলার টেপিবাড়ি গ্রামের কোরবান আলীর ছেলে। মিনুর পরিবার নিতান্তই গরীব। ভ্যান চালিয়ে পরিশ্রম করে সংসার চালাতেন মিনু। তিনি কোনও অপকর্মের জন্য মারা যাননি। তিনি গুজবে মারা গেছেন।

রাস্তায় বন্যার পানি উঠায় মিনুর ভ্যান চালানো বন্ধ হয়ে যায়। উঁচু সড়কের পাশে ঠাই নেই। এ অবস্থায় কারেন্ট জাল কেনার জন্য মিনু টাকা ধার করে পাশের বাড়ির শাকের শেখকে সঙ্গে নিয়ে গত ২১ জুলাই কালিহাতী উপজেলার সয়া বাজারে যান জাল কিনতে। ওই হাটে স্থানীয়রা মিনুকে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি দেয়। তিনি পরিচয় দেয়ার পরও মারধোর থেকে রেহাই পাননি।

মিনুর অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী রিনা আক্তার বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। আমার স্বামী ছিলেন একজন পরিশ্রমী মানুষ। পরিশ্রম করে সংসার চালাতেন। তিনি কোনও অপকর্মের জন্য মারা যাননি। তিনি গুজবে মারা গেছেন। গুজব ঠেকানোর দায়িত্ব সরকারের। তিনি দেশের জন্যই মারা গেছেন। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে স্বামী হত্যার বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বৃদ্ধ শ্বশুর ও সন্তানকে নিয়ে দু’মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকবো কিভাবে? আমি এখন কেমন করে চলবো এবং ঈদ কেমন করে কাটবে তা বলতে পারছি না। কারণ আমার বাড়িঘর, জায়গা জমি কিছুই নেই। আমার ঈদ করা হবে না। এছাড়া সন্তানকে লেখাপড়া শিখিয়ে স্বামীর স্বপ্ন পূরণ করাও কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়েছে।

রাস্তা ও ঘরে বন্যার পানি ঢোকায় আমার স্বামীর ভ্যান চালানো বন্ধ হয়ে যায়। বন্যার কারণে আমরাও উঁচু সড়কের পাশে ঠাঁই নেই। এ অবস্থায় কারেন্ট জাল কেনার জন্য তিনি টাকা ধার করে পাশের বাড়ির শাকেরকে সঙ্গে নিয়ে ২১ জুলাই কালিহাতীর সয়া বাজারে যান। ওই হাটে ১০-১১ বছরের এক ছেলে তার পকেট থেকে টাকা চুরি করার সময় তার হাত ধরে ফেলেন তিনি। এসময় ছেলেটি চিৎকার শুরু করলে স্থানীয়রা আমার স্বামীকে ছেলেধরা ভেবে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে। তিনি পরিচয় দেওয়ার পরও মানুষগুলো তাকে ছাড়েনি। প্রধানমন্ত্রী যদি আমাদের পাশে দাঁড়াতেন তাহলে বৃদ্ধ শ্বশুর ও সন্তান নিয়ে দুমুঠো খেয়ে বেঁচে থাকতে পারতাম। সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে আমার স্বামীর স্বপ্ন পূরণ করতে পারতাম।’

মিনুর বাবা কুরবান আলী বলেন, ‘মিনুর স্ত্রী, সন্তান ও আমাকে দেখার আর কেউ রইল না। মিনু তার সন্তানদের মানুষ করে যেতে পারলো না। আমার ছেলেকে যারা বিনা অপরাধে হত্যা করেছে আমি তাদের বিচার চাই।’

স্থানীয় কাউন্সিলর শরিফুল আলম সোহেল বলেন, ‘ঘটনার দিন মিনু পাশের বাড়ির শাকের শেখকে সঙ্গে নিয়ে জাল কিনতে যান। ওই ঘটনার পর থেকে শাকের শেখের কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাকে খুঁজে বের করতে পারলেই ঘটনার আসল রহস্য বের হয়ে আসবে।’

কালিহাতী থানার ওসি হাসান আল মামুন পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই দফায় ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। বর্তমানে গ্রেফতার ৮ জনই টাঙ্গাইল কারাগারে রয়েছেন। ঘটনায় জড়িত বাকিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যহত রয়েছে। এ ঘটনায় হত্যা মামলা সংযুক্ত হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২১ জুলাই মিনু কালিহাতীর সয়া হাটে মাছ ধরার জাল কিনতে যায়। কিন্তু হঠাৎ করে এক ছেলেকে সিএনজি অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যাচ্ছে এমন গুজবে মিনু মিয়াকে আটক করে এলাকাবাসী। পরে তাকে গণপিটুনি দেন তারা।

অবশ্য কয়েক ব্যক্তি তাকে পিটুনি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। অবস্থা বেগতিক হয়ে গেলে পুলিশে খবর দেন তারা। পরে পুলিশ এসে মিনু মিয়াকে উদ্ধার করে কালিহাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। সেখানে মিনুর অবস্থা অবনতি হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু মাথায় আঘাত গুরুতর হওয়ায় রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ভর্তি করা হয়। সেখানে ৮ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ২৯ জুলাই সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মিনু মিয়ার মৃত্যু হয়।

এএএন/পিএসএস

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও