'মনে হচ্ছিল সাগরের মধ্যেই না খেয়ে মরবো'

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

'মনে হচ্ছিল সাগরের মধ্যেই না খেয়ে মরবো'

আব্দুল্লাহ আল নোমান, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি ৪:৪৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৮, ২০১৯

'মনে হচ্ছিল সাগরের মধ্যেই না খেয়ে মরবো'

'ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে ছোট্ট একটি নৌকায় আমরা ৭৫ জন লোক জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকেও বেঁচে ফিরতে পেরেছি। মনে হচ্ছিল সাগরের মধ্যেই না খেয়ে মারা যাবো। কখনও ভাবিনি বেঁচে ফিরতে পারবো।' দীর্ঘ চার মাস পর তিউনিসিয়া থেকে প্রাণ নিয়ে নিজ দেশে ফিরে এসে কথাগুলো বলছিলেন টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার বাঘেরবাড়ী গ্রামের সেন্টু মিয়া।

সেন্টু মিয়া ওই গ্রামের চানু মিয়ার ছেলে। দাম্পত্য জীবনে সেন্টুর ঘরে রয়েছে পাঁচ বছর বয়সের দুই জমজ ছেলে। চার ভাইয়ের মধ্যে সেন্টু সবার বড়। অভাবের সংসার হওয়ায় স্কুলের গন্ডি পেরুতে পারেনি সেন্টু। বাবা কৃষি কাজ করে সংসার চালাতো। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় সংসারের দায়িত্বভার পড়ে তার ওপর। এরপর কিশোর বয়সেই ঢাকায় একটি বইয়ের ছাপা কারখানায় কাজ নেয় সেন্টু।

সেন্টু তার ছোট ভাই মিন্টুকে ধার-দেনা করে কাতারে পাঠান। কাতারে মিন্টুর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলার বাসিন্দা হামিদের সঙ্গে। হামিদের ভাই থাকেন ইতালিতে। মিন্টুর স্বপ্ন জাগে বড় ভাই সেন্টু মিয়াকে ইতালি পাঠাবেন। এরপর সেন্টুর ইতালি যাওয়ার বিষয়ে মিন্টু তার বন্ধু হামিদের সঙ্গে কথা বলেন। বিষয়টি হামিদ তার ভাই ইতালি প্রবাসী জনিকে জানায়।

পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলার ইতালী প্রবাসী জনি ও একই এলাকার লিবিয়া প্রবাসী রফিকুল ইসলাম সেলিম মিলে সেন্টুকে ইতালি পাঠানোর জন্য সাড়ে ৮ লাখ টাকা চুক্তি করে। চুক্তি মোতাবেক সেন্টুর পরিবার ঋণ, গরু বিক্রি, জমি বন্ধক ও স্বজনদের কাছ থেকে ধার নিয়ে সাড়ে ৮ লাখ টাকা জমা দেয় ব্যাংকের মাধ্যমে।

ভুক্তভোগী সেন্টু মিয়া বলেন, চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে দুবাই, মিসর হয়ে লিবিয়ার বেনগাজী এলাকার একটি ক্যাম্পে পৌঁছাই। সেখানে এক সপ্তাহ থাকার পর দালাল রফিকুল ইসলাম সেলিম আমাকে সহ ৫জনকে সেখান থেকে নিয়ে অন্য আরেকটি রুমে আটকে রেখে অতিরিক্ত টাকা দাবি করে। টাকা আদায়ে বিভিন্নভাবে নির্যাতনও চালায়।

তিনি আরো বলেন, আমার কাছে দালাল সেলিম আরও অতিরিক্ত এক লাখ টাকা দাবি করে। পরে সেলিমকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। ওই সময় একটি রুমে বিভিন্ন এলাকার ৫৩ জন লোক ছিল। তাদেরকেও বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হতো। সেখানে প্রায় ৪ মাস থাকার পর ইতালির উদ্দেশ্যে সাগর পাড়ে আমাকেসহ আরও ৭৫ জনকে নিয়ে যায়। এর আগে বড় একটি জাহাজের ছবি দেখানো হয়। ওই জাহাজে করে ইতালি নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সাগরপাড়ে গিয়ে দেখা যায় ছোট্ট একটি নৌকা। আমরা ওই নৌকায় উঠতে চাচ্ছিলাম না। আমাদেরকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সবার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে নৌকায় উঠানো হয়। ৭৫ জন এক নৌকায় ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা হই। কয়েক ঘণ্টা যাওয়ার পর নৌকার মটরের তেল শেষ হয়ে যায়। ভাসতে থাকি ভূমধ্যসাগরে।

সেন্টু বলেন, সাগরে ব্যাপক ঢেউ ছিল। কোন ধরণের খাবার ছিল না আমাদের সঙ্গে। শুধু পানি খেয়ে সাগরের মধ্যে নৌকায় ৪ দিন কেটে যায়। কোনও প্রকার খাবার না থাকায় সবার জীবনই মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিল। ৪ দিনের মাথায় একটি তেলের জাহাজ সাগর দিয়ে যাচ্ছিল। আমরা ওই জাহাজ দেখে জাহাজের লোকদের হাত ইশারা করে ডাকার চেষ্টা করি। এরমধ্যে অনেকেই নৌকা থেকে লাফিয়ে জাহাজের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পরে তিউনিসিয়ার তেলবাহী জাহাজের লোকজন এসে আমাদের সবাইকে জাহাজে উঠান। তিউনিসিয়া দেশটির কেউ আমাদের নিতে চায়নি। এরপর ওই জাহাজে ১০ দিন কেটে যায়। পরে জাহাজকর্মীরা সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি জানালে আমাদেরকে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। আমি তৃতীয় ধাপে গত ২৫ জুন বাংলাদেশে ফিরেছি। পরে ২৬ জুন গ্রামের বাড়িতে আসি।

'এখন দালাল জনি ও রফিকুল ইসলাম সেলিমের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এখন আমি নিঃস্ব। কি করবো কিছুই বুঝতেছিনা।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন সেন্টু।

এদিকে সেন্টু দেশে ফিরতে পারলেও ঋণের বোঝা মাথায় থাকায় এই অসহায় পরিবারের সদস্যদের চোখে-মুখে রয়েছে হতাশার ছাপ। দিশেহারা হয়ে পড়েছে এই পরিবারটি।

সেন্টুর বাবা চানু মিয়া বলেন, ‘ঋণ, জমি বন্ধক ও আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার নিয়ে সাড়ে ৮ লাখ টাকা দালালদের দেওয়া হয়। এখন আমাদের আর কিছুই রইল না। কোন জনমে এই ঋণ সুদ করতে পারবো সেটাও জানি না।’ 

পিএসএস

 

বিশেষ আয়োজন: আরও পড়ুন

আরও