ঈদ যাত্রায় ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে ভোগান্তির আশঙ্কা 

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬

ঈদ যাত্রায় ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে ভোগান্তির আশঙ্কা 

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি ১:৩৬ অপরাহ্ণ, মে ২৩, ২০১৯

ঈদ যাত্রায় ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে ভোগান্তির আশঙ্কা 

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঢাকা-টাঙ্গাইল চারলেন উন্নীতকরণ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের পরই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়ক। রাজধানী ঢাকার সাথে সড়ক পথে উত্তরবঙ্গের একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম এই মহাসড়কটি। এই সড়কের দৈর্ঘ প্রায় ১২৫ কিলোমিটার। শুধু ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কের টাঙ্গাইলের অংশ ৬৫ কিলোমিটার। ঈদের সময় ঘরমুখো মানুষের যানবাহনের ভিড়ে এই মহাসড়কে সৃষ্টি হয় যানজটের। ফলে ভোগান্তিতে পড়েন গাড়ির চালক ও ঘরমুখো মানুষ।

এবার এই মহাসড়কে ঈদযাত্রায় যানজটের আশঙ্কা করছেন পরিবহন শ্রমিকরা (চালকরা)।

প্রতিবছর ঈদে এ মহাসড়ক দিয়ে উত্তরবঙ্গের লাখ লাখ মানুষ যাতায়াত করেন, যা অন্যন্য সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি হয়। এই মহাসড়কের ৭০ কিলোমিটার চারলেনের কাজ চলছে। শুধু টাঙ্গাইলের অংশে ৪৬ কিলোমিটার কাজ হচ্ছে।  কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঢাকা-টাঙ্গাইল চারলেন উন্নীতকরণ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি।

মহাসড়ক উন্নীতকরণ কাজের কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে মূল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে নতুন নতুন প্রকল্প। ২০১৬ সালে দুই লেনের মহাসড়কটি চারলেনে উন্নীতকরণের প্রকল্প হাতে নেয় সরকার, যা ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বেশ কয়েকটি আন্ডারপাস, ওভারপাস ও দুটি সার্ভিসলেন যুক্ত হওয়ায় কয়েক দফায় বেড়ে যায় প্রকল্পের সময়। যার নির্মাণ কাজ এখনো শেষ হয়নি। ফলে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে প্রতিবন্ধকতা। কাজ শেষ না হওয়ায় আসন্ন ঈদে ভোগান্তির আশঙ্কা করছেন চালকরা।

প্রকল্পের সংশ্লিষ্টরা বলেন, আগামী ঈদে মহাসড়ক যানজটমুক্ত রাখতে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা হাতে নেয়া হয়েছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে ঈদে নির্বিঘ্নে বাড়ি পৌঁছানো কিংবা বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফেরা অসম্ভব বলে মনে করেন গাড়ির চালকরা।

তবে অন্যান্য বছরের চেয়ে এ বছর মহাসড়কে ভোগান্তি কম হবে বলে আশা প্রকাশ করে পুলিশ। এবার মহাসড়কে যানজট নিরসনে থাকছে বিশেষ ব্যবস্থা। গত বছরের ন্যায় এ বছরও মহাসড়কে যানজট নিরসনে সিসি ক্যামেরা রয়েছে।

এ সড়ক দিয়ে প্রায় ২২ থেকে ২৩টি জেলার যানবাহন চলাচল করে। তাই এই সড়কে গাড়ির চাপ থাকে বেশি। এ কারণে প্রতিবছর ঈদে এ সড়কে যানবাহনের চাপে জটলা লাগে। প্রতিদিন এই মহাসড়কে গড়ে প্রায় ৬ থেকে ৮ হাজার যানবাহন চলাচল করে। আর ঈদের সময় ঘরমুখো যাত্রীদের চাপে যানবাহনের সেই সংখ্যা ৫ থেকে ৬ গুণ বৃদ্ধি পায়।

চালকেরা জানায়, বর্তমানে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে এখনো চারলেনের কাজ চলছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি স্থানে মহাসড়কের এক লেন বন্ধ করে আন্ডারপাস কাজ চলছে। এছাড়া গত কয়েকদিনের বৃষ্টির কারণে মহাসড়কের বিভিন্নস্থানে খানা-খন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে ঈদযাত্রায় এবারের মহাসড়কে যানজট হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পুলিশ সূত্রে বলছে, প্রতি বছরই ঈদকে সামন রেখে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীরা সড়কে লক্কর ঝক্কর এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি বের করে। এসব গাড়ি হঠাৎ করেই মহাসড়কে বিকল হয়ে যায়। এতে উভয় পাশের গাড়ি থেমে পড়ে। এক পর্যায়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। অনেক সময় চালকের অদক্ষতা, সড়ক দুর্ঘটনা এবং গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় যানজট হয়। গত বছর ঈদের সময় একদিনে বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর দিয়ে ৩২ হাজারের বেশি গাড়ি পারাপার হয়েছে, যা বঙ্গবন্ধুসেতু চালুর পর থেকেই সর্বোচ্চ গাড়ি পারাপার হয়।

গাড়ির চালকরা পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, মহাসড়কে চারলেনের কাজ চলছে। অন্যদিকে বর্ষণের ফলে মহাসড়কে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা, রসুলপুর, পাচবিক্রমহাটি, নগরজলপাই, ঘারিন্দা, করটিয়া, পাকুল্লা, হাটুভাঙ্গা, মির্জাপুর, গোড়াই, কুন্নী, তারটিয়া এসব এলাকায় ঈদযাত্রায় যানজট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে ধলেশ্বরী বাসের চালক রাজিব মিয়া পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, আমি ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গাড়ি চালাই। এবার ঈদ যাত্রায় মহাসড়কে যানজট হওয়ার আশঙ্কা করছি। কারণ বিগত কয়েক বছর ধরে এ মহাসড়কে চারলেনের কাজ চলছে। আর এ চারলেনের রাস্তার কাজ চলার সাথে সাথে মহাসড়কে এক লেন বন্ধ করে আন্ডারপাস কাজ করা হচ্ছে। আর বিগত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে মহাসড়কে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া ঈদের যাত্রায় মহাসড়কে কয়েকগুন যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যায়। ঈদের আগে যদি মহাসড়কে খানাখন্দ ঠিক করা না হয় এবং চারলেনের কাজ সহনীয় পর্যায়ে না হয় তাহলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানজটের সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাস চালক শহিদ মিয়া পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, এবার ঈদযাত্রায় যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। পুলিশ যদি ঠিক মত দায়িত্ব পালন করে তাহলে মহাসড়কের যানজট সহনীয় পর্যায়ে হবে। যানজটের কারণে যানবাহনে যাত্রীদের সংখ্যা কমে যায়। এতে আমাদের লোকসান হয়।

ধলেশ্বরী বাসের চালক বাবু মিয়া পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, প্রতিবছরই ঈদ যাত্রায় যানজটের সৃষ্টি হয়। তবে যদি ঈদ যাত্রার আগে মহাসড়কের মেরামতের কাজ শেষ না হয় তাহলে যানজট সৃষ্টি হওয়ায় আশঙ্কা রয়েছে। যানজট ছাড়া এই মহাসড়ক ৩ ঘণ্টার মধ্যে পাড়ি দেয়া যায়। যানজট হলে প্রায় ৭ ঘণ্টা সময় লাগে। কোন কোন সময় আরো বেশি সময় লাগে। তবে পুলিশ যদি কঠোরভাবে মহাসড়কে দায়িত্ব পালন করে তাহলে যানজট হবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ (অপরাধ) আহাদুজ্জামান মিয়া পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, যানজট নিরসনে পুলিশ মহাসড়কে সব সময়ই সতর্ক অবস্থানে থাকবে। যানজট নিরসনে টাঙ্গাইলের অংশে ৬৫ কিলোমিটারে হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ এবং থানা পুলিশসহ প্রায় ৭ শতাধিক পুলিশ কাজ করবে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ১০ থেকে ১৫টি স্থানে সিসি ক্যামেরা রয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ মহাসড়কে ৩টি শিপ্টে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করবে। আশা করছি মহাসড়কে যানজট সৃষ্টি হবে না।

তিনি আরো বলেন, এ ছাড়া মহাসড়কে প্রায় ৪৫টি হুন্ডা মোবাইল টিম কাজ করবে। যাতে যানজট সৃষ্টি হলে সহজেই নিরসন করা যায়। এ ছাড়া মহাসড়কে ৪টি সেক্টর ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি সেক্টরে একজন করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজ করবেন।

বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব থানার ওসি মোশারফ হোসেন বলেন, আমার অংশে সহাসড়কে যানজট নিরসনে পুলিশ সার্বক্ষণিক কাজ করবে। ঈদ সামনে রেখে মহাসড়কে ছিনতাই রোধেও পুলিশ কাজ করবে। 

চারলেন প্রকল্পের সংশ্লিষ্টরা জানান, টাঙ্গাইলের অংশে দেওহাটা, মির্জাপুর, কুর্ণি, কদিমধল্যা, পাকুল্লা, জামুর্কি, নাটিয়াপাড়া, বাঐখোলা, করটিয়া হাট বাইপাস, তারটিয়া, ঘারিন্দায় আন্ডারপাসের কাজ চলছে। এদের মধ্যে ঈদ উপলক্ষে দেওহাটা, মির্জাপুর এবং ঘারিন্দার আন্ডারপাস ছেড়ে দেয়া হবে। এ ছাড়া রাবনা এবং গোড়াইতে ফ্লাইওভারের কাজ চলছে। 

এ বিষয়ে জয়দেবপুর-এলেঙ্গা চারলেন প্রকল্পের প্রজেক্ট ম্যানেজার অমিত কুমার চক্রবর্তী পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, মহাসড়কের মূল চার লেনের কাজের প্রায় ৯৩ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া নতুন সার্ভিস লেন ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নতুন আরেকটি সার্ভিস লেনের কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া পুরো মহাসড়কে আন্ডারপাসের কাজ চলছে ১৩টির। শুধু টাঙ্গাইলের অংশে ১১টি আন্ডারপাসের কাজ চলছে। ঈদ উপলক্ষে টাঙ্গাইলের ৩টি আন্ডারপাসসহ ৪টি খুলে দেয়া হবে।

এছাড়া টাঙ্গাইলের অংশে দুটি ফ্লাইওভার কাজ চলছে। এ প্রকল্পের আগামী ২০১৯ সালের ২০ জুন  কাজের মেয়াদ শেষ হবে। সব মোট ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ঈদ যাত্রায় মে ২৭ তারিখের পর থেকে পুরো চারলেনের সুবিধা খুলে করা দেয়া হবে। আশা করি এবার ঘরমুখো মানুষ যানজটের বিড়ম্বনায় পড়বে না।

এমএইচ