‘আমার ৬ লাখ টাকা ছিল, এখন পথের ফকির’

ঢাকা, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | 2 0 1

‘আমার ৬ লাখ টাকা ছিল, এখন পথের ফকির’

আব্দুল্লাহ আল নোমান, টাঙ্গাইল ১০:১৭ অপরাহ্ণ, মে ২২, ২০১৯

‘আমার ৬ লাখ টাকা ছিল, এখন পথের ফকির’

‘আমার ছয় লাখ টাকা ছিল। গত ছয় বছরে ধান আবাদ কইরা সব টাকা ফুরাইছি। এহন অন্যের জমিতে কামলা না দিলে খাইতে পারি না। এই অবস্থায় ধানে আগুন দিমু না তো কী করমু? ৩০০ শতাংশ জমিতে ধান আবাদ কইরা এহন আমি পথের ফকির’

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার বানকিনা গ্রামের বর্গাচাষি মকবুল হোসেন মনের দুঃখে পরিবর্তন ডটকমকে এসব কথা বলছিলেন।

টাঙ্গাইলে এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু তাতে খুশি হতে পারছে না কৃষক। তাদের মুখের হাসি বিলীন হয়ে গেছে নানা কারণে।

একদিকে ধানের দাম কম, অন্যদিকে শ্রমিকের মূল্য বেশি। আবার অধিক মূল্য দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ধান বিক্রি করে কৃষকের উৎপাদন খরচও উঠছে না।

মাঠে সোনারঙা পাকা ধানের সমারোহ। অথচ শ্রমিকের অভাবে সেই কাঙ্ক্ষিত ফসল সময়মত ঘরে তুলতে পারছেন না চাষিরা।

আর এসব কারণে টাঙ্গাইলের কৃষকেরা এখন অনেক ক্ষুব্ধ; যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে পাকা ধানে আগুন দেয়ার মধ্য দিয়ে।

টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলায় এবার বোরো ধানের আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৭০২ হেক্টর জমিতে। ফলনও হয়েছে ভালো। এ পর্যন্ত জেলায় প্রায় ৪০ ভাগ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে। কৃষি বিভাগের মতে, এবার টাঙ্গাইলে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে।

কৃষকেরা জানান, বর্তমানে ধানের দাম কম থাকায় তারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ধান আবাদ করে অতিমাত্রায় লোকসান গুণতে হচ্ছে তাদের। যেখানে একমণ ধানের উৎপাদন খরচ এক হাজার টাকার উপরে, সেখানে এক মণ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায়।

ধানের দাম কম থাকায় এবং শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটতে না পারায় রাগে, ক্ষোভে-দুঃখে নিজের পাকা ধানে আগুন লাগিয়ে অভিনব কায়দায় প্রতিবাদ জানান কালিহাতী উপজেলার পাইকড়া ইউনিয়নের বানকিনা গ্রামের কৃষক আব্দুল মালেক সিকদার। গত ১২ মে তিনি তার ৫৬ শতাংশ একটি জমির এক কোণে কেরোসিন ঢেলে পাকা ধানে আগুন লাগিয়ে দেন। আশপাশের লোকজন ছুটে এসে আগুন নিভিয়ে ফেলেন। এ ঘটনায় দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরে ক্ষুব্ধ কৃষকের সাথে সমবেদনা জানাতে ও তাদের কষ্টের ভাগি হতে এগিয়ে আসেন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। গত ১৫ মে তিনটি কলেজের ১৫ জন শিক্ষার্থী সেই মালেক সিকদারের ক্ষেতের ধান কেটে দেন। এছাড়া এর একদিন পর বাসাইল উপজেলায় আরেক কৃষকের জমিতে আগুন দেয় কৃষক।

কৃষকরা বলেন, ইরি-বোরো চাষে এক বিঘা (৫৬ শতাংশ) জমি প্রস্তুত করতে ৬ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। ওই সময় শ্রমিকের মূল্য থাকে ৪৫০ থেকে ৫০০টাকা করে। ট্রাক্টর বাবদ খরচ হয় প্রায় ১৮শ থেকে ২ হাজার টাকা। বীজ ও বীজতলা প্রস্তুত করতে শ্রমিকের মূল্যসহ প্রায় ১৫শ টাকা খরচ হয়। ধানের চারা রূপন করতে ৮ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। এই ৮জন শ্রমিকের খাবারসহ প্রায় ৫হাজার টাকা খরচ হয়। এরপর ধান ক্ষেত থেকে ঘাস পরিষ্কার (নিরানী) করতে ৪ জন শ্রমিক লাগে। এই ৪ জন শ্রমিকের খাবারসহ ২৫শ টাকার মতো খরচ হয়ে থাকে। ধান কাটতে ১০ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। ধান কাটার শ্রমিকের মূল্য এ সময়ে প্রতিজন ৮শ থেকে ৯শ টাকা পর্যন্ত থাকে। এই ১০ জন শ্রমিকের খাবারসহ প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। 

অপরদিকে সার বাবদ প্রায় ৩ হাজার টাকা খরচ হয়। সব মিলিয়ে বীজতলা প্রস্তুতসহ কৃষকের সোলানী ধান গোলায় তুলতে প্রায় ৩০ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। আর এই ৩০ জন শ্রমিকের খাবারসহ সব মিলিয়ে কৃষকের খরচ হচ্ছে ২৭ হাজার টাকার ওপরে। এদিকে ওই এক বিঘা (৫৬ শতাংশ ) জমিতে ধান হচ্ছে ২৬ থেকে ২৮ মণ করে। আর ভালো ফলন হলে ৩০ মণও হয়। ধানের বর্তমান মূল্য ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা করে। ৫৫০ টাকা হিসেবে ২৮ মণ ধানের মূল্য ১৫৪০০টাকা। কৃষকের ২৭ হাজার টাকা খরচ হলে এক বিঘা (৫৬ শতাংশ) জমিতে কৃষকের প্রায় ১১ হাজার টাকা করে ঘাটতি হচ্ছে।

কৃষক আব্দুল মালেক সিকদার পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, একমণ ধানের দাম ৫০০ টাকা। অথচ একমণ ধানের উৎপাদন খরচ এক হাজার টাকার উপরে। এছাড়া বর্তমানে একজন ধানকাটা শ্রমিকের মূল্য ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। খাওয়া-খরচ দিয়ে একজন শ্রমিকের দাম পড়ে কমপক্ষে এক হাজার টাকা। তারপরেও শ্রমিক পাওয়া যায় না। তাই কোন উপায় না দেখে মনের দুঃখে ও ক্ষোভে আমি নিজের পাকা ধানে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলাম। যাতে ধানের দাম বাড়ানোর বিষয়টি সরকার বিবেচনা করে। তবে শিক্ষার্থীরা আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। এজন্য আমি খুব খুশি।

কালিহাতীর বানকিনা গ্রামের বর্গাচাষি মকবুল হোসেন বলেন, ‘আমি ৩০০ শতাংশ জমিতে ধান আবাদ কইরা এহন পথের ফকির। কামলার অভাবে, টাকার অভাবে ধান কাটতে পারতাছি না। ঘরের ধানের ভাত খাইয়া অভ্যাস। তাই আবাদও ছাড়তে পারি না। ৩০০ শতাংশ জমিতে আমার খরচ একলাখ টাকার উপরে। ধান পামু ১৫০ মণ। যার দাম ৭৫ হাজার টাকা। তাইলে বাকি টাকা আমি কই পামু?’

ওই এলাকার হায়দার আলী নামে এক শ্রমিক বলেন, ‘আমি ৮০০ টাকা কইরা কামলা দিতাছি। কৃষক তিনবেলা খাবার দেয়। বর্তমানে কামলা কম, তাই দাম বেশি।’

বাসাইল উপজেলার কলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, ‘আমি প্রায় ৫ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছি। এক বিঘা জমিতে ট্রাক্টর, শ্রমিক ও সারের খরচ বাবদ প্রায় ২৭ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে ২৬ থেকে ৩০ মণ পর্যন্ত ধান হয়। এবার ধানের দাম কম। তাই আমার প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় ১০ হাজার টাকা করে ঘাটটি হবে।’

চাষিরা জানান, গত বছর এই সময় একজন শ্রমিকের মূল্য ছিল ৫০০ টাকা। এবার তা ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। শ্রমিককে তিনবেলা খাবার দিতে হয়। তারা আবার সব খাবার খায় না। খাবারের মেনু তারা আগেই বলে দেয়। খাবার পছন্দ না হলে তারা কাজ করে না। কৃষকদের বাঁচাতে হলে ধানের দাম কমপক্ষে এক হাজার টাকা নির্ধারণ করা উচিত। কেননা, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।

কৃষকরা আরো জানান, বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ার কারণে শ্রমিকের দামও বেড়ে গেছে। তারা শ্রমিকের বিকল্প হিসেবে ধান কাটা ও মাড়াই যন্ত্র প্রতিটি এলাকায় দেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান। সরকার প্রতি বছর কৃষকদের কাছ থেকে ধান নেয়ার জন্য বললেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্থানীয় দালালের মাধ্যমে ধানগুলো গোডাইনে তুলছেন। এরফলে কৃষকরা সরকারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তারা সরকারকে কৃষকদের প্রতি সুদৃষ্টি দেয়ার জন্য অনুরোধ জানান।

কালিহাতী উপজেলার পাইকড়া ইউনিয়নের সিংহটিয়া ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আমীর মাহমুদ সিদ্দিকী পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, কৃষকেরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, এজন্য উৎপাদন খরচের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ধানের দাম নির্ধানণ করা দরকার।

রকিবুল ইসলাম নামে মির্জাপুরের এক কৃষক বলেন, বীজতলা থেকে শুরু করে প্রতিমণ ধান ঘরে তুলতে এক হাজার টাকার উপরে খরচ হয়। কিন্তু ধান বিক্রি করছি তার অর্ধেক দামে। এবার আমরা পথে বসে গেছি।

এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, এ সময়ে ধানের বাজার কিছুটা কম থাকলেও কৃষক যদি ধান সংরক্ষণ করে রাখে তবে ক’দিন পরেই অধিক মূল্য পাবে। তাপাদহসহ নানা কারণে বর্তমানে কিছুটা শ্রমিক সংকট রয়েছে বলে তিনি জানান।

এইচআর

 

ঢাকা: আরও পড়ুন

আরও