নারান্দিয়ার নজরকাড়া মুড়ি, দিনে বিক্রি ৬ লাখ টাকা

ঢাকা, ২৬ মে, ২০১৯ | 2 0 1

নারান্দিয়ার নজরকাড়া মুড়ি, দিনে বিক্রি ৬ লাখ টাকা

আব্দুল্লাহ আল নোমান, টাঙ্গাইল ৬:৩৭ অপরাহ্ণ, মে ১৮, ২০১৯

নারান্দিয়ার নজরকাড়া মুড়ি, দিনে বিক্রি ৬ লাখ টাকা

পবিত্র রমযানে ইফতারির রকমারি উপাদানের মধ্যে মুড়ি সবচেয়ে অত্যাবশ্যকীয়। সারা বছর মুড়ির চাহিদা থাকলেও রোজায় উৎপাদন ও বিক্রি বহুগুণে বেড়ে যায়। তাই ব্যবসায়ীরা বছর জুড়ে অপেক্ষায় থাকেন রমযানের জন্য।

আবার অনেকে মৌসুমি ব্যবসা হিসেবে এই মাসে মুড়ি উৎপাদন এবং বিক্রি করে থাকেন। যে কারণে মুড়ি তৈরির কারিগর ও ব্যবসায়ীদের এখন দম ফেলার ফুসরত নেই।

সারা দেশের কমপক্ষে ১০টি জেলায় মুড়ি সরবরাহ হয় টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার নারান্দিয়া থেকে। এখানকার উৎপাদিত মুড়ির সুনাম বিভিন্নস্থানে। মুড়ি উৎপাদনের সাথে নারান্দিয়ার মানুষ অনেক আগে থেকেই জড়িত। এখানে দুইভাবে মুড়ি উৎপাদিত হয়, হাতে ভেজে ও মেশিনের সাহায্যে।

নারান্দিয়ায় ৪টি মিলে মেশিনের সাহায্যে এবং কয়েকশ’ পরিবার হাতে ভেজে মুড়ি উৎপাদন করে। মেশিনের সাহায্যে মুড়ি উৎপাদন নতুন সংযোজন হলেও হাতে ভেজে মুড়ি তৈরি এবং বিক্রি করে অনেক আগে থেকেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছে বহু পরিবার। বিশেষ করে মোদক সম্প্রদায়।

সততা মুড়ি মিলের স্বত্বাধিকারী শংকর চন্দ্র মোদক বলেন, ৫০ কেজি চালের বস্তায় ৪৪-৪৫ কেজি মুড়ি হয়। প্রতি কেজি মুড়ি আমরা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি করি। পাইকাররা আবার সেই মুড়ি প্রতি কেজি কমপক্ষে ৬৫-৭৫ টাকা দরে খুচরা বিক্রি করেন। রমযানে প্রতিদিন ৪টি মিলে ১৫০ বস্তারও বেশি চালের মুড়ি উৎপাদিত হচ্ছে। প্রায় ৪ লাখ টাকার মেশিনে ভাজা মুড়ি প্রতিদিন কেনাবেচা হয় এই এলাকায়।

এদিকে মেশিনের সাহায্যে বিপুল পরিমাণ মুড়ি প্রতিনিয়ত উৎপাদিত হলেও হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। মেশিনে ভাজা মুড়ি সাদা ও লম্বা করতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ইউরিয়া কিংবা সোডা ব্যবহারের অভিযোগ থাকায় এক শ্রেণির মানুষ সব সময় হাতে ভাজা মুড়ি খেয়ে থাকেন।

কালিহাতী উপজেলার নারান্দিয়া, মাইস্তা, নগরবাড়ী, দৌলতপুর, লুহুরিয়া ও সিংহটিয়াসহ প্রায় ১৫টি গ্রামের কয়েকশ’ পরিবার হাতে ভেজে মুড়ি তৈরি করে থাকে। একজন ব্যক্তি ১ দিনে এক থেকে দেড় মণ চালের মুড়ি ভাজতে পারেন। প্রতি মণ চালে ২২ থেকে ২৩ কেজি মুড়ি হয়। প্রতি কেজি মুড়ি পাইকারি ৫৫-৬৫ টাকা এবং খুচরা ৭০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। মূলত গ্রামের মহিলারাই হাতে ভেজে গুণগত মানসম্মত মুড়ি তৈরি করেন।

দৌলতপুর গ্রামের মিনতি রানী বলেন, আমরা বংশপরম্পরায় এই মুড়ি ভাজা ও ব্যবসার সাথে জড়িত। ধান সিদ্ধ করে রোদে শুকানোর পর আবার সেই ধান মেশিনে মাড়াই করে মুড়ি ভাজার জন্যে চাল তৈরি করা হয়। পরে সেই চাল দিয়ে লবণজলের মিশ্রণে আগুনে বিশুদ্ধ মুড়ি ভাজতে অনেক পরিশ্রম হয়। কিন্তু এবার বাজার দর অন্য বছরের চেয়ে একটু ভাল। অনেক সময় গ্রাহকদের চাহিদার তুলনায় হাতে ভাজা মুড়ি তৈরি এবং সরবারহ কম হয়।  

তাদের দেয়া তথ্যে, প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ টাকার হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদন এবং কেনাবেচা হয়। তবে পরিশ্রমের লাভের বেশির ভাগই চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। রমযানে দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা পিকআপ, ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে বস্তাভর্তি মুড়ি কিনে টাঙ্গাইলের প্রত্যন্ত এলাকায় বিক্রি করেন। যাতায়াত ব্যবস্থা ভাল থাকায় পার্শ্ববর্তী সিরাজগঞ্জ, ঢাকা, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, বগুড়া ও গাজীপুরে নারান্দিয়ার মুড়ি সরবরাহ হয়।

লোকনাথ মুড়ি মিলের মালিক সুনীল চন্দ্র মোদক বলেন, আমরা অনেক সময় মোবাইলেও মুড়ির অর্ডার নিয়ে সরবরাহ করে থাকি। তাছাড়া নির্দিষ্ট বাজারে স্থায়ী গ্রাহকরা মুড়ি ক্রয় করে থাকেন।

রমযানে ৬ লাখ টাকার মুড়ি প্রতিদিন মেশিনে ও হাতে ভেজে তৈরি হলেও বছরের অন্য সময়ে অর্ধেকে নেমে আসে। ৪টি মিলে ৪০ জন শ্রমিক এবং কয়েকশ’ পরিবার প্রত্যক্ষভাবে ও বিপুল সংখ্যক মানুষ পরোক্ষভাবে মুড়ি ব্যবসার সাথে জড়িত থেকে তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন। ফলে রমযানে কাজের চাপে দম ফেলার সময়টুকু পায় না মুড়ি উৎপাদনকারীরা।

তবে প্রযুক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদনকারীরা। মেশিনে মুড়ি ভাজতে সময় কম লাগে কিন্তু তুলনামূলকভাবে লাভ বেশি। অন্যদিকে হাতে মুড়ি ভাজতে সময় বেশি লাগে কিন্তু লাভ সামান্য। ফলে হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদনকারীরা দিনদিন এই কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় ধাবিত হচ্ছেন এবং অনেকেই চলে গেছেন। এই পেশাকেই টিকিয়ে রাখতে উৎপাদনকারী এবং ব্যবসায়ীরা সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।

কালিহাতী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদার বলেন, টাঙ্গাইল তথা বাংলাদেশের মধ্যে মুড়ি উৎপাদনের অন্যতম স্থান কালিহাতীর নারান্দিয়া। এখানকার উৎপাদিত লাখ লাখ টাকার মুড়ি সারা দেশে সরবরাহ হচ্ছে। এটি এক প্রকার কুটিরশিল্প। মানুষের চাহিদা পূরণে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের যথাযথ উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা হাতে ভাজা মুড়ি বিক্রি করেন তাদের ক্ষেত্রে।

এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক আবু নাসের বলেন, নারান্দিয়ায় মুড়ি কেনাবেচার একটি নির্দিষ্ট বাজার স্থাপনের পরিকল্পনা আছে। সরকার থেকে হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদনকারী ব্যক্তি এবং পরিবারগুলোকে বিশেষ ঋণ সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন।

কালিহাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দেবনাথ বলেন, নারান্দিয়ার হাতে ভাজা বিশুদ্ধ মুড়ির চাহিদা দেশজুড়ে। তাদের টিকিয়ে রাখতে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।

এএএন/পিএসএস

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও