কার স্বার্থে ‘প্লে উইথ পিকচার’ বই?

ঢাকা, বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯ | ৪ আষাঢ় ১৪২৬

কার স্বার্থে ‘প্লে উইথ পিকচার’ বই?

মেহেদী হাসান মাসুদ, রাজবাড়ী ৬:১৫ অপরাহ্ণ, মে ১৮, ২০১৯

কার স্বার্থে ‘প্লে উইথ পিকচার’ বই?

শিশুর চেয়েও তার পাঠ্যপুস্তকের ওজন বেশি। এ নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। তাতে কার কি? এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা আছেনই নিজের আখের গোছাতে।

এমনই একজন বালিয়াকান্দি উপজেলার তৎকালীন শিক্ষা অফিসার মো. সিরাজুল ইসলাম। তিনি নিজ উদ্যোগে উপজেলার অসংখ্য কোমলমতিদের ওপর বাড়তি বই চাপিয়ে দিয়েছেন। বিনিময়ে হাতিয়ে নিয়েছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ।

বরাবরের মতো চলতি বছরের ১ জানুয়ারি সারা দেশে বই উৎসব হয়েছে। নতুন বইয়ের গন্ধে মাতোয়ারা শিশুরা। বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসায় থিঁতু না হতেই ঠিক পরের মাসেই বালিয়াকান্দির শিশুরা পেয়েছে উটকো ঝামেলা, ‘প্লে উইথ পিকচার’ নামের বই।

শিক্ষা কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম উপজেলার প্রত্যেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন ১০টি করে বই। প্রাক-প্রাথমিকের জন্য বইগুলোর জন্য নগদে নেয়া হয়েছে ৮০০ করে টাকা।

শিক্ষকেরা শুরুতে অর্থ দিতে অনীহা দেখালেও, চাপে পড়ে কেউ কেউ দিয়েছেন। এখনো অনেকেই দিচ্ছেন। অবশ্য সে সময়ে সিরাজুল ইসলাম প্রধান শিক্ষকদের প্রাক-প্রাথমিকের সরকারি বরাদ্দ থেকে বইয়ের টাকা সমন্বয় করে নিতে বলেছেন।

এ নিয়ে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, কার স্বার্থে উপজেলা শিক্ষা অফিসার সিরাজুল ইসলাম এমন দুর্বল মানের বই চাপিয়ে দিয়েছেন? সরকারি বরাদ্দ হলেই কি, তা ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করা যায়? তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বালিয়াকান্দিতে জাতীয়করণের আওতাধীন ৯৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের সরঞ্জাম বাবদ ১০ হাজার টাকা সরকারি বরাদ্দ রয়েছে। তাদের জন্য সরকারিভাবে ১৫৬ পৃষ্ঠার চার কালারের একটি বইও রয়েছে, যাতে আদর্শলিপি থেকে ইংরেজি, গণিত, ছবি আঁকা সবই রয়েছে।

এসবের বাইরে তৎকালীন শিক্ষা অফিসার সিরাজুল ইসলাম প্রত্যেক বিদ্যালয়কে ১০টি করে ‘প্লে উইথ পিকচার’ বই কিনতে বাধ্য করেছেন। ২৬ পৃষ্ঠার (এপিট-ওপিট) সাধারণ প্রিন্টের বইটির মানও খুবই দুর্বল।

বইটির দ্বিতীয় পাতায় নিদের্শনায় লেখা রয়েছে- প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব জনাব মো. আকরাম আল হোসাইন এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানে বালিয়াকান্দি উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. সিরাজুল ইসলাম (বর্তমানে মানিকগঞ্জের শিবালয়ে কর্মরত)। ওই পৃষ্ঠার নিচের দিকেই প্রাক-প্রাথমিকের বরাদ্দ থেকে পরিশোধযোগ্য লেখা রয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির বালিয়াকান্দি উপজেলা শাখার সভাপতি ও স্বাবলম্বী ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শহিদুল ইসলাম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে ১০টি প্লে উইথ পিকচার বই দিয়ে মূল্যবাবদ প্রাক-প্রাথমিকের বরাদ্দ থেকে ৮০০ টাকা জমা দিতে বলা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার বছরের শুরুতেই শিশুদের জন্য ৪ কালারের ছবিসহ চমকপ্রদ বই দিয়েছে। এরপরও উপজেলা শিক্ষা অফিসার কেন এমন বেখাপ্পা টাইপের বই চাপিয়ে দিলেন, তা বোধ্গম্য নয়। সব শিক্ষার্থীর জন্য দিলে বুঝতাম, সরকারি নির্দেশনা। আমার শিক্ষার্থী ৪০, তাহলে ১০টি বই দিয়ে আমি কি করব? এজন্য বইগুলো এনে রেখে দিয়েছি, কাউকে দিতে পারছি না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক পরিবর্তন ডটকমকে জানান, প্রাক-প্রাথমিকের জন্য ৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে এবার সরকার স্কুলপ্রতি ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। এই বরাদ্দ এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষকের হিসাবে জমা হয়নি, কাজও শুরু হয়নি। অথচ তার আগেই বই কেনার অর্থ সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে, যা মূলত কতিপয় অসাধু শিক্ষকের অর্থ লোপাটের পথ দেখিয়ে দিয়েছে।

বালিয়াকান্দি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চাঁদ সুলতানা পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘সিরাজুল ইসলাম স্যার প্লে উইথ পিকচার নামে ১০টি বই ৮০০ টাকা দিয়ে কিনে নিতে বলেছেন। স্যার বলেছেন, তাই নিয়েছি।’

নলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শশাঙ্ক শেখর ভৌমিকও একই কথা জানান।

এ বিষয়ে তৎকালীন উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. সিরাজুল ইসলাম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘আপনারা এটিকে সমস্যা মনে করছেন। মাত্র ৮০০ টাকাইতো। কেউতো এই টাকা পকেট থেকে দিচ্ছেন না। প্রাক-প্রাথমিকের বরাদ্দ থেকে প্রধান শিক্ষকেরা বইয়ের মূল্য সমন্বয় করে নিবেন।’

এ বিষয়ে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. মিজানুর রহমান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘সিরাজুল ইসলাম স্যার বই বিক্রির অধিকাংশ টাকা শিক্ষকদের থেকে নিয়েছেন। কিন্তু, বইটি কোন প্রেস থেকে করা আমার জানা নেই। এখনো যারা বইয়ের টাকা দেননি, তাদের থেকে আদায় করে স্যারকে পৌঁছে দিতে বলেছেন। আমরা সেভাবেই কাজ করছি।’

এ বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হোসনে ইয়াসমিন করিমী পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। শুনলাম, খতিয়ে দেখে সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এমএইচএম/আইএম