এখনও ক্ষত শুকায়নি রানা প্লাজার আহত শ্রমিকদের

ঢাকা, সোমবার, ২০ মে ২০১৯ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

এখনও ক্ষত শুকায়নি রানা প্লাজার আহত শ্রমিকদের

সাভার প্রতিনিধি ১:১২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৪, ২০১৯

এখনও ক্ষত শুকায়নি রানা প্লাজার আহত শ্রমিকদের

আজ ২৪ এপ্রিল সাভারের আলোচিত রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ৬ষ্ঠ বর্ষপূর্তি। দিনটি উপলক্ষে রানা প্লাজার সামনে নানা কর্মসূচী হাতে নিয়েছে বিভিন্ন শ্রমিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো। ভবন ধসের এতো বছর পরও এখনও ক্ষত শুকায়নি আহত শ্রমিকদের।

অনেকেই মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। সহায়সম্ভব বেঁচে চিকিৎসা করিয়ে বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তাদের ক্ষোভ প্রথম প্রথম কিছু সাহায্য সহযোগিতা পেলেও এখন আর কেউ তাদের খোঁজ নেয় না।

শিলা বেগম (৩১) কাজ করতেন রানা প্লাজার ৬তলার ইথার টেক্স কারখানায় অপারেটর পদে। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি কারখানাটিকে কাজ করছিলেন। ভালই চলছিল তার সংসার। কিন্তু আচমকা রানা প্লাজা ধসে তার সব শেষ হয়ে যায়। ভবনের ভীমের নীচে চাপা পড়েন তিনি।

প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর উদ্ধারকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। প্রথমদিকে কিছু টাকা পেলেও সেই টাকায় তার চিকিৎসাও ঠিকমতো হয়নি। টাকার অভাবে সন্তানের লেখাপড়াও বন্ধের পথে। কোনো রকম খেয়ে বেঁচে আছেন তিনি। তবে টাকার অভাবে এখন তার চিকিসা বন্ধ রয়েছে।

মৃত্যু পথযাত্রী শ্রমিক রওশন আরা (৩৫)। কাজ করতেন ৬তলার ইথার টেক্স কারখানায়। ভবন ধসে ভিম চাপা পড়ে শরীরে বেধেছে মরনঘাতী রোগ ক্যানসার। প্যারালাইজ রিকশাচালক স্বামীর টাকায় চলছে কোনো রকম চিকিৎসা। রানা প্লাজা ধসের পর কিছু সহযোগিতা পেলেও তা দিয়ে চিকিৎসাও ঠিকমতো হয়নি। টাকার অভাবে দুই সন্তানকে এতিমখানায় ভর্তি করেছেন তিনি। এখন ক্যামোথেরাপির উপর বেঁচে আছেন তিনি।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, রানা প্লাজার ধসের বর্ষপূর্তি আসলে কিছু সাংবাদিকরা আসেন। কিন্তু যাদের জন্য আজ আমাদের এ অবস্থা তারা কেউ আমাদের খোঁজ খর নেয় না। এনজিও কারিতাস একটা গরু দিতে চেয়েছিল কিন্তু আজও পর্যন্ত পাইনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, যে কয়দিন বাঁচবো ক্যামোথেরাপি দিয়িই বাঁচতে হবে।

ছালমা বেগম (২৮) কাজ করতেন ৮ম তলায় নিউ স্টাইল লিমিটেড কারখানায়। এক মাস ছিল তার চাকরির বয়স। কিন্তু ভবন ধসে ভিম কোমরের উপর পড়লে মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙ্গে যায়। ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাকে উদ্ধার করে উদ্ধারকর্মীরা। যখন তার জ্ঞান ফিরে তখন তিনি হাসাপাতালের বেডে।

তিনি বলেন, কিছু টাকা সহযোগিতা পেলেও তা দিয়ে চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। আবার বেশি অসুস্থ্য হয়ে পড়লে তার স্বামী বাক্কার তাকে ফেলে চলে যান। এতে সে আরও ভেঙ্গে পরে। এখন অর্থাভাবে চিকিৎসাও বন্ধের পথে। শুধু সিআরপিতে ফ্রি থেরাপি দিয়ে বেঁচে আছেন তিনি।

তিনি বলেন, আমার এখন যে অবস্থা, ডাক্তার বলছে, আমি আর কোনো দিন কাজ করতে পারবো না।

নিলুফা ইয়াছমিন (৩০)। ৬তলার ইথার টেক্স কারখানায়। সবে মাত্র চাকরিতে যোগদান করেছিলেন তিনি। ভবনের ভিমের নীচে চাপা পড়ে মেরুদণ্ডে ও মাথায় আঘাত পান। উদ্ধারকর্মীরা তাকে ২৪ ঘণ্টা পরে উদ্ধার করে।

তিনি বলেন, যে সামান্য টাকা পেয়েছি তা দিয়ে কয়েকদিনের চিকিৎসা খরচ হয়েছিল। এখন অর্থাভাবে চিকিৎসা করতে পারছি না।

নিলুফা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিভিন্ন এনজিওরা আমাদেরকে নিয়ে ব্যবসা করছে। তাই ক্ষতিপূরনের টাকা আমরা পাই না। আমাদের দেখাইয়া তারাই নেয়।

তার আক্ষেপ, সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ ক্ষতিপূরণ পায়, আর আমরা কোনো ক্ষতিপূরণ পাই না।

রানা প্লাজার ৮ম তলায় নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড কারখানায় কোয়ালিটি ইন্সপেকশন পদে কাজ করতেন মাহমুদুল হাসান হৃদয় (৩২)।

পরিবার নিয়ে সুখেশান্তিতে থাকতে পারবে সেই আসায় রানা প্লাজায় চাকরি নিয়েছিলেন তিনি। চাকরির মাত্র ১৪ দিনের মাথায় ভবনটি ধসে পরে। ভবনের নিচে চাপা পরে সুখ-শান্তি। ধংসস্তুপের নীচ থেকে উদ্ধার কর্মীরা ২০ ঘণ্টা পর তাকে উদ্ধার করে। কিন্তু ভিমের নীচে চাপা পড়ায় পায়ে ও মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়ে আজ পঙ্গু হওয়ার পথে। অল্প কিছু যা সহযোগিতা তাৎক্ষণিকভাবে পেয়েছিলেন তা দিয়ে ঠিকমতো চিকিৎসাও করাতে পারেনি তিনি।

বর্তমানে অর্থকষ্টে দিনযাপন করছেন তিনি। পৌর এলাকার ছায়াবিথি এলাকায় ছোট্ট একটি ফার্মেসি দিয়ে বসে থাকেন কোনো রকম।

হৃদয় বলেন, ফার্মেসিতে যা ঔষধ আছে তা নিজের খেতে হয়, বিক্রি করবো কখন? শুধু বসে বসে সময় কাটাই।

তিনি আরও বলেন, রানা প্লাজার আহত ৩০০ শ্রমিক নিয়ে ‘সাভার রানা প্লাজা সারভাইর্ভারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠন করেছি।

সংগঠনটির সভাপতি তিনি নিজেই। তাদের সংগঠনের কোন পুঁজি নেই। একটি মাটির ব্যাংকই তাদের পুঁজি।

হৃদয় বলেন, মাটির ব্যাংকে যে যা পরে রেখে দেয়। পরে বিশেষ কোনো কাজে সেই ব্যাংক ভেঙ্গে বিশেষ বিশেষ দিনে সাহায্য সহযোগিতা করি।

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে শ্রমিকরা কর্মস্থলে যোগ দেয়ার পরপরই সাভার বাসস্ট্যান্ডের পাশে রানা প্লাজা নামের বহুতল ভবনটি ধসে পড়ে। এ দুর্ঘটনায় ১১৭৫ জন শ্রমিক নিহত এবং দুই হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয় যা বিশ্বের ইতিহাসে ৩য় বৃহত্তম শিল্প দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

এ দুর্ঘটনায় সাধারণ জনগণ, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধারকাজ চালায়। ভবনটিতে পোশাক কারখানা, একটি ব্যাংক এবং একাধিক অন্যান্য দোকান ছিল।

ভবনটিতে ফাটল থাকার কারণে ভবন না ব্যবহারের সতর্কবার্তা থাকলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছিল। এই দুর্ঘটনাটি ছিল বাংলাদেশে ঘটা সবচেয়ে বড় শিল্পদুর্ঘটনা।

এআরই
আরও পড়ুন...
অস্থায়ী শহীদ বেদিতে রানা প্লাজায় নিহতদের শ্রদ্ধা