টাঙ্গাইলে কোরবানির পশুর শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় ব্যস্ত খামারিরা

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৬ আশ্বিন ১৪২৫

টাঙ্গাইলে কোরবানির পশুর শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় ব্যস্ত খামারিরা

আব্দুল্লাহ আল নোমান, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি ৯:৩০ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৭, ২০১৮

টাঙ্গাইলে কোরবানির পশুর শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় ব্যস্ত খামারিরা

আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে টাঙ্গাইলে শেষ সময়ে পরিচর্যাসহ কোরবানির পশু মোটাতাজাকরণে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন খামারিরা। এ বছর ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার ছাড়াই দেশিয় খাবার দিয়ে গরু মোটাতাজা করা হয়েছে। গো-খাদ্যের দাম একটু বেশি হওয়ায় লালন-পালনে আগের চেয়ে খরচও কিছুটা বেশি হয়েছে। দেশের বাইরে থেকে কোরবানির হাটে কোনো গরু না এলে ভাল দামেই খামারের গরু বিক্রি করতে পারবেন- এমনটাই আশা করছেন তারা। এ গরুই সারা বছরের স্বপ্ন তাদের।

টাঙ্গাইল জেলা প্রাণি সম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইল জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে নয় হাজার ৩৪৫টি গরুর খামার রয়েছে। জেলায় এ বছর ৪৫ হাজার গরু-ছাগলের চাহিদা রয়েছে। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে জেলার খামারগুলোতে প্রায় ৬০ হাজার গরু-ছাগল প্রস্তুত করা হচ্ছে।

জানা যায়, জেলার খামারিরা প্রতি বছর কোরবানির ঈদের ৬ থেকে ৭ মাস আগে বিভিন্ন হাট-বাজার ও চরাঞ্চল থেকে কম দামে ছোট ছোট গরু কিনে আনেন। পরে তা দেশিয় পদ্ধতিতে পরিচর্যা, গো-খাদ্য খড়, ভূষি, তিল, খৈল ও বিভিন্ন জাতের ঘাস খাইয়ে মোটাতাজা করা হয়। খামারিদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হওয়ায় অসাধু পন্থা অবলম্বন না করে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে।

তাদের আশা, দেশিয় পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজা করে লাভবান হবেন তারা। দেশিয় পদ্ধতিতে প্রাকৃতিকভাবে গরু মোটাতাজা করার ফলে গরুর চাহিদা বাজারে বেশি থাকায় এ বছর খামারিদের সংখ্যাও বেড়েছে। এ ছাড়া দেশিয় পদ্ধতিতে গরু লালন-পালন করে আর্থিকভাবেও লাভবান হওয়ায় এখন আর কেউ অসাধু পন্থা অবলম্বন করছেন না। এতে খামারিরা স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, গত বছর আর্থিকভাবে বেশি লাভবান হওয়ার আশায় মোটাতাজা করার বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে অনেক খামারিই সর্বশান্ত হন। ফলে এ বছর তেমন কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নন খামারিরা। কোরবানির জন্য দেশিয় পদ্ধতিতে তারা গরুর পরিচর্যা করছেন। কোনো কোনো খামারি বাড়ির চারপাশে রাস্তার পাশে বিভিন্ন জাতের কাঁচা ঘাস রোপণ করেছেন। এ কাঁচা ঘাসের সাথে খড়, ভূষি, তিল, খৈল ও সয়াবিন খাইয়ে গরু লালন-পালন করেছেন। এ কারণে কিছুটা বেশি দামে গরুগুলো বিক্রি করতে পারবেন বলে আশাবাদী তারা।



দীর্ঘ ২০ বছর ধরে গরু মোটাতাজা করে বিক্রি করছেন টাঙ্গাইল সদর উপজেলার দাইন্যা ইউনিয়নের শ্রীফলিআটা গ্রামের মো. শাজাহান। গত বছর ৪টি গরু ওষুধের মাধ্যমে মোটাতাজা করে বিক্রি কায় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এবার ৬টি গরু দেশিয় পদ্ধতিতে মোটাতাজা করছেন। প্রতিবেশি দেশ থেকে অতিমাত্রায় গরু আমদানি না হলে এ বছর গতবারের ক্ষতি পুষিয়ে তিনি লাভবান হবেন, পরিবারের স্বপ্ন পূরণ হবে বলে আশা করছেন। তার খামারের একটি গরুর দাম চাওয়া হয়েছে ৪ লাখ টাকা।

সদর উপজেলার কাতুলী ইউনিয়নের চৌবাড়িয়া গ্রামের খামারি আশরাফ আলী এবার ৪টি গরু মোটাতাজা করেছেন। তার মধ্যে তিন বছর বয়সী ব্রাহমা জাতের একটি গরু কোরবানি উপলক্ষে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে দেখতে আসছেন। তিনি গরুটির দাম হাঁকছেন ৮ লাখ টাকা। কেউ কেউ দাম বলছে ৪-৬ লাখ টাকা।

শাজাহান জানান, স্ত্রী করুণা বেগম, ছেলে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র তায়েবুর রহমান ও তিনি গরু মোটাতাজাকরণে কাজ করে থাকেন। প্রাণিসম্পদ অফিসের লোকজন মাঝেমধ্যে এসে তদারকি করেন। গরুর ভাল দাম পেলে এ বছরের স্বপ্ন পূরণ হবে বলে জানান তিনি।

খামারি আব্দুল মামুন, রশমত মিয়া, হায়দার আলীসহ অনেকেই বলেন, প্রাকৃতিকভাবে কাঁচা ঘাস, খড়, খৈল, ভূষি খাইয়ে গরু মোটাতাজাকরণ করছেন তারা। তাদের দাবি প্রতিবেশি দেশ থেকে যেন গরু অতিমাত্রায় আমদানি করা না হয়। তাহলে তারা কিছুটা বেশি লাভবান হতে পারবেন।

দাইন্যা ইউনিয়নের ফুটানী বাজার এলাকার রফিকুল ইসলাম বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এ বছর গরুর গো-খাদ্যের দাম অনেকটা বেশি। অসাধু পন্থা অবলম্বন না করায় তার প্রতিটি গরুতে তুলনামূলকভাবে বেশি খরচ হয়েছে।

সন্তোষ এলাকার হাফিজুর রহমান বলেন, অনেক যত্নে খামারের গরুগুলো লালন-পালন করেছেন। তার পরিবারের সকল সদস্যই গরুর পরিচর্যা করতে সময় দিয়ে থাকে। বর্তমানে গরুর বাজার ভাল আছে। প্রতিবেশি দেশ থেকে গরু আমদানি করলে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এসএম আউয়াল হক বলেন, কোরবানির ঈদ উপলক্ষে খামারিরা দেশিয় প্রদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণ করছেন। এবার জেলায় ৯ হাজার ৩৪৫টি পরিবার গরু ও ছাগল লালন-পালন করছে। আমরা তাদেরকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছি। টাঙ্গাইলে ৪টি উপজেলায় ব্রাহ্মা জাতের গরু লালন-পালন করা হচ্ছে। এই জাতের এক একটি গরুতে প্রায় ১ টন করে মাংস পাওয়া যায়। এদের চাহিদা প্রচুর রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় ৪৫ হাজার গরু-ছাগলের চাহিদা রয়েছে। আর আমাদের হিসাবে প্রায় ৬০ হাজার গরু-ছাগল রয়েছে। বাহিরের দেশ থেকে গরু আমদানি ছাড়াই আমাদের নিজস্ব গরু দিয়ে কোরবানি কার্যক্রম সম্পন্ন করা যাবে।

তিনি বলেন, কোরবানির ঈদ উপলক্ষে কয়েকগুণ খামারি এবং গরুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। টাঙ্গাইল থেকে প্রায় ২০ হাজার গরু অন্যান্য জেলায় যায়। তবে অন্যান্য জেলা থেকেও এখানে গরু আসে। খামারিরা যাতে লাভবান হতে পারেন সে লক্ষ্যে আমাদের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হয়। যদি ভারত থেকে গরু প্রবেশ না করে তাহলে খামারির লাভবান হতে পারবেন। আর যদি ভারতে থেকে গরু প্রবেশ করে তাহলে তাদের লোকসান হবে। আমদানি ছাড়াই নিজস্ব গরু দিয়ে জেলার কোরবানি কার্যক্রম সম্পন্ন করা যাবে। এ বছর খামারিরা গরুর ভাল দাম পাবে এবং তাদের স্বপ্ন পূরণ হবে বলে তিনি আশা করেন।

এএএন/আরপি