‘প্রবীরের মতোই স্বপনকে সাত টুকরো করা হয়’ 

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৮ | ৮ কার্তিক ১৪২৫

‘প্রবীরের মতোই স্বপনকে সাত টুকরো করা হয়’ 

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি ১০:১০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৯, ২০১৮

‘প্রবীরের মতোই স্বপনকে সাত টুকরো করা হয়’ 

নারায়ণগঞ্জ শহরের আমলাপাড়ায় পিন্টুর ফ্ল্যাটে সোনা ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষের মতোই পাসপোর্ট অফিসের দালাল স্বপন কুমারকেও সাত টুকরো করে হত্যা করেছে পিন্টু দেবনাথ, আদালতে জবানবন্দিতে এমনটাই জানিয়েছেন একজন।

আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে পিন্টুর প্রেমিকা রত্মা রানী জানান, হত্যার পূর্বে যৌন মিলনের প্রলোভন দেখিয়ে পিন্টু তার প্রেমিকা রত্না রানীকে দিয়ে স্বপনকে ডেকে নেয় নিজের ফ্ল্যাটে। একই ফ্ল্যাটেই সোনা ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষকে টুকরো টুকরো করে হত্যা করা হয় বলে জানান তিনি।

জবানবন্দিতে রত্না আরও জানান, বিছানায় বসিয়ে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করে ঘুমের ওষুধ মেশানো ফ্রুটিকা জুস স্বপনকে পান করান তিনি। এতে ঘুমিয়ে পড়েন স্বপন। এরপর শীলপাটা দিয়ে স্বপনের মাথায় আঘাত করেন পিন্টু। পরে লাশ গুমের জন্য সাত টুকরো করে বাজারের ব্যাগে ভরে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়া হয়।

তিন দিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আশেক ইমামের আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে এসব কথা বলেন রত্মা রানী। একই সময় এ মামলায় গ্রেফতার স্থানীয় বড় ভাই আবদুল্লাহ আল মামুনও নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহমুদুল মোহসীনের আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

কোর্ট পুলিশের এসআই কামাল হোসেন ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির এসআই মফিজুল ইসলাম এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

এসআই মফিজুল ইসলাম জানান, নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ কাচারীগলি এলাকার মৃত সোনাতন চন্দ্র সাহার ছেলে কাপড় ব্যবসায়ী ও পাসপোর্ট অফিসের দালাল স্বপন কুমার সাহা, আমলাপাড়া এলাকার স্বর্ণব্যাবসী পিন্টু ও স্বর্ণব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ ছিলেন একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর রত্মা রানী ছিলেন পিন্টুর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী।

তিনি আরও জানান, বিয়ের আশ্বাস দিয়ে রত্না রানীর কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা ধার নেয় পিন্টু। এরপর থেকে রত্মা রানী প্রায় সময় পিন্টুর ফ্ল্যাটে যাতায়াত করত এবং তাদের মধ্যে অবৈধ যৌন মেলামেশা চলত।

মফিজুল ইসলাম আরও জানান, পিন্টুকে ভারতে বাড়ি কিনে দেয়ার প্রলোভন দেখায় স্বপন। এরপর ভারতে নিয়ে একটি ফ্ল্যাটও পিন্টুর টাকায় স্বপন তার ভাগ্নির নামে কিনে দেয়। তখন পিন্টুকে স্বপন বলে ভারতে নাগরিকত্ব করিয়ে তার ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিবে। কিন্তু, তা না করে পিন্টুকে ঘুরাতে থাকে স্বপন। একই সঙ্গে প্রবীর ঘোষের সাথে মিলে পিন্টুকে নানাভাবে হয়রানি করতে পরামর্শ করে স্বপন। সর্বশেষ প্রায় বছরখানেক আগে বড় ভাই আল মামুনকে প্রবীর ঘোষের বাসায় ডেকে নেয় সে। এরপর স্বপন ও প্রবীর ঘোষ মিলে পিন্টুকে নারী দিয়ে ফাঁসাতে আল মামুনের সঙ্গে পরিকল্পনা করে।

তিনি জানান, সেই পরিকল্পনার কথা পরের দিনই পিন্টুকে ডেকে নিয়ে বলে দেয় মামুন। একই সঙ্গে প্রবীরের ব্যাপারে পিন্টুকে মামুন প্রশ্ন করেছিল, প্রবীর তোর বন্ধু না শত্রু? পিন্টু নির্দ্বিধায় প্রবীরকে বন্ধু বলে স্বীকার করলে মোল্লা মামুন নিজেই পিন্টুকে চড় মারে ও গালি দিয়ে বলেন, প্রবীর তোর বন্ধু না। এরপর মোল্লা মামুন ফোন করে প্রবীরকে। মোবাইলে লাউড স্পিকারে পিন্টুর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতেই প্রবীর বলেছিল, ওরে মাইয়া লোক দিয়া... কইরা র‍্যাব দিয়া ধরাইয়া দেন দাদা। ওর টাকা পয়সা বাইরা গেছে, অর্ডারও বাইরা গেছে। ওর দোকানডা আমার লাগব। প্রিয়বন্ধুর মুখে এমন কথা শোনার পরই ক্ষোভ জন্মে পিন্টুর মধ্যে।

মামলার বাদী নিহত স্বপনের ভাই অজিত কুমার সাহা জানান, স্বপন কুমার সাহা ছিলেন খুচরো কাপড় ব্যবসায়ী। ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে সে নিখোঁজ রয়েছে। গত ৯ জুলাই পিন্টুর বাসার সেপটি ট্যাংকি থেকে প্রবীর ঘোষের টুকরো টুকরো লাশ উদ্ধারের পর পিন্টুর প্রতি আমাদের সন্দেহ বাড়ে। পরে ১৫ জুলাই বিষয়টি ডিবিকে জানালে রিমান্ডে থাকা পিন্টুর সহযোগী বাপন ভৌমিক বাবু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে। সে তখন পিন্টু দেবনাথের এক বান্ধবী রত্না রাণী চক্রবর্তীর সন্ধান দেয়। তার মোবাইল নাম্বার পর্যালোচনা করে জানা গেছে স্বপনের মোবাইলটি রত্না ব্যবহার করছে। ১৫ জুলাই রোববার রাতে তাকে আটকের পর তার কাছ থেকে স্বপনের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল উদ্ধার করা হয়।

তিনি আরও জানান, মূলত পিন্টুর টাকা নিয়ে স্বপন ভারতে একটি ফ্লাটবাসা ক্রয় করে। ওই ফ্লাটবাসা স্বপন না দিয়ে বরং উল্টো হুমকি দিচ্ছিল। এসব কারণেই ২০১৬ সালের মার্চে আমলাপাড়া এলাকার মোল্লা মামুন নিজেই পিন্টুকে হুমকি দিত। তখন থেকেই স্বপন সাহা ও প্রবীর ঘোষকে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকে পিন্টু। রত্না জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর রাতে পিন্টু দেবনাথের বাসায় বসে স্বপনকে হত্যার পর লাশ শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেওয়া হয়।

এপি/আরজি