‘আমি এখন মরেও শান্তি পাব’: রূপার ভাই

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট ২০১৮ | ১ ভাদ্র ১৪২৫

‘আমি এখন মরেও শান্তি পাব’: রূপার ভাই

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি ৩:৩৮ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৮

print
‘আমি এখন মরেও শান্তি পাব’: রূপার ভাই

টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্তবাসে কলেজ ছাত্রী জাকিয়া সুলতানা রূপাকে গণধর্ষণ ও হত্যা মামলায় পাঁচ আসামীর মধ্যে চারজনের ফাঁসি এবং একজনের সাতবছর সশ্রম কারাদণ্ড ও একলাখ টাকা জরিমানা দিয়েছেন আদালত। সোমবার টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত বিচারক হিসেবে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক আবুল মনসুর মিয়া এ দণ্ডাদেশ দেন। রায় ঘোষণার পর রূপার ভাই ও বোন আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। রায়ে তারা সন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত এই দণ্ড কার্যকর করার দাবি জানান।

কাঁদতে কাঁদতে হাফিজুর রহমান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘মনে করেছিলাম আমরা ন্যায় বিচার পাব না। আদালতের কাছে আমার ন্যায় বিচার পেয়েছি। যারা আমার বোনকে এরকম নির্মমভাবে হত্যা করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে। এখন আমি মরেও শান্তি পাব।’

তিনি আরো বলেন, ‘কাঁদতে কাঁদতে আমার  মায়ের  চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। মা এই ‘নরপিশাচদের’ ফাঁসি কার্যকরের জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছেন। আমরা এই রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানাচ্ছি। যাতে ভবিষ্যতে আর কোন বোনকে এ-রকম নির্মম পরিণতির শিকার হতে না হয়।’

রূপার ছোটবোন পপি আক্তার পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘আমাদের অনেক স্বপ্ন ছিল আপুকে নিয়ে। আপুও একদিন এই আদালতে দাড়াঁইতো উকিল হয়ে। তার লেখাপড়াও প্রায় শেষ হয়েছিল। কিন্তু ওরা আমার বোনকে চলন্তবাসে গণধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মনে করেছিলাম আমরা ন্যায়বিচার পাব না। কিন্তু সরকার আমাদের ন্যায্য বিচার দিয়েছে। আমরা খুবই খুশি হয়েছি।’

মামলার রায়ের দিন সোমবার সকালেই আদালতে আসেন নিহত রূপার বড়ভাই হাফিজুর রহমান এবং বোন পপি আক্তারসহ কয়েকজন নিকট আত্মীয়।

আদালতে পাঁচ আসামীর উপস্থিতিতে বিচারক মাত্র ছয় মিনিটে চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায়ের সারসংক্ষেপ পড়ে শুনান। এর আগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে বিচারক ১২ ফেব্রুয়ারি রায়ের জন্য তারিখ ধার্য করেন।

মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামীরা হচ্ছেন- ছোঁয়া পরিবহনের চালক ময়মনসিংহের কোতয়ালি থানার মির্জাপুর গ্রামের মৃত শহিদুল ইসলামের ছেলে হাবিব মিয়া (৪৫), বাসের তিন হেলপার একই জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার নন্দিবাড়ী গ্রামের খোরশেদ আলমের ছেলে শামীম মিয়া (২৬), মৃত কামাল হোসেনের ছেলে আকরাম (৩৫) ও কোতয়ালি থানার মির্জাপুর গ্রামের মৃত এমদাদুল হকের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম (১৯)। সাত বছর কারাদ-প্রাপ্ত আসামী হচ্ছেন বাসের সুপারভাইজার ছবর আলী ওরফে গেন্দু (৫৫)। তিনি একই এলাকার সুলতান আলীর ছেলে।  

কারাদণ্ড প্রাপ্ত ছবর আলীর জরিমানার টাকা নিহত রূপার পরিবারকে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সাথে যে বাসটিতে রূপাকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয় সে বাসটি নির্দায় অবস্থায় ক্ষতিপূরণ হিসেবে রূপার পরিবারকে দেওয়ারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে মামলার রায়ে। আদালতের বাইরে অপেক্ষমান আসামীদের স্বজনেরাও কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে আসামীদের টাঙ্গাইল জেলহাজতে নিয়ে যাওয়া হয়।

আদালত সূত্রে জানা যায়, সকালেই আলোচিত এই মামলার আসামীদের টাঙ্গাইল জেলা কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। বেলা ১১টা ৭মিনিটে বিচারক এজলাসে উঠেন এবং ৭৩ পৃষ্ঠার রায়ের বিশেষ বিশেষ অংশসহ দ- প্রদানের অংশটুকু পড়ে ১১টা ১৩ মিনিটে রায় ঘোষণা শেষ করে তিনি আদালত মুলতবী করেন।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট নাছিমুল আক্তার নাছিম। তাকে সহযোগিতা করেন মানবাধিকার কমিশনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস আকবর খান, মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এমএ করিম মিঞা এবং মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান আজাদ। আসামীপক্ষের আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট শামীম চৌধুরী দয়াল।

পরিবারের হাল ধরতে চেয়েছিলেন রূপা
নিহত জাকিয়া সুলতানা রূপা বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর ঢাকার আইডিয়াল ল কলেজে ভর্তি হন। পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি একটি বহুজাতিক কোম্পানীতে চাকরী নেন। ওই কোম্পানীর শেরপুর শাখা অফিসে চাকুরীরত অবস্থায় শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নিতে তিনি বগুড়ায় যান। পরীক্ষায় অংশ নেয়ার পর ঘটনার দিন গত ২৫ আগস্ট তিনি শেরপুর ফেরার উদ্দেশ্যে বগুড়া থেকে ছোঁয়া পরিবহনের বাসে ময়মনসিংহ ফিরছিলেন। বাসটি টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় পৌঁছলে অন্য যাত্রীরা নেমে যান এবং সেখান থেকে আর কোন যাত্রী না উঠিয়েই বাসটি ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। পথিমধ্যে ওই বাসের হেলপাররা তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে এবং মধুপুর উপজেলার পঁচিশমাইল এলাকার বনে তার লাশ ফেলে রেখে চলে যায়।

ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন
ওইদিন সকালে আদালত চত্বরে রূপাকে গণধর্ষণ ও হত্যা মামলার আসামীদের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মানবাধিকার আইনজীবী পরিষদ এ মানববন্ধনের আয়োজন করে। এতে বক্তব্য রাখেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলাম, এই সংগঠনের সভাপতি অ্যাডভোকেট এস আকবর খান ও নিহত রূপার ছোটবোন পপি আক্তার।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে রূপাকে চলন্ত বাসে পরিবহন শ্রমিকেরা ধর্ষণ করে এবং বাসেই তাকে হত্যার পর টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার পঁচিশ মাইল এলাকায় বনের মধ্যে তার মৃতদেহ ফেলে রেখে যায়। এলাকাবাসীর কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ওই রাতেই অজ্ঞাত পরিচয় তরুণী হিসেবে তার লাশ উদ্ধার করে। পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদি হয়ে মধুপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করে। ঘটনার দুই দিন পর রূপার বড়ভাই হাফিজুর রহমান নয়া দিগন্ত পত্রিকায় মধুপুরে অজ্ঞাত যুবতীর লাশ উদ্ধারের খবর দেখে মধুপুর থানায় যান। সেখানে গিয়ে তিনি রক্তাক্ত লাশের ছবি ও সালোয়ার-কামিজ দেখে শনাক্ত করেন যে, এই অজ্ঞাত যুবতীই তার ছোট বোন। ৩১ আগস্ট রূপার মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে তার ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তাকে সিরাজগঞ্জের তারাশ উপজেলার নিজ গ্রাম আসানবাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়।

গত ২৮ আগস্ট এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে ময়মনসিংহ-বগুড়া রুটের ছোঁয়া পরিবহনের দণ্ডিত চালক, সুপারভাইজার ও তিন হেলপারকে পুলিশ গ্রেফতার করে। পরদিন তাদের টাঙ্গাইলের জুুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চালান দেয়া হয়। চালান দেয়ার প্রথম দিন বাসের তিন হেলপার ও পরদিন চালক ও সুপারভাইজার ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

গত ১৫ অক্টোবর এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওই সময়কার অরণখোলা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কাইয়ুম খান সিদ্দিকী টাঙ্গাইলের বিচারিক হাকিম আদালতে পাঁচ আসামীর সকলের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। রূপাকে গণধর্ষণ ও হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিলের পর মামলাটি বিচারের জন্য পরদিন ১৬ অক্টোবর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বদলী করা হয়। গত ২৫ অক্টোবর আদালত এই অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন এবং গত ২৯ নভেম্বর আদালতে আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। গত ২৩ জানুয়ারি এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। মোট ৩২ জন সাক্ষীর মধ্যে ২৭ জন সাক্ষ্য প্রদান করেন।


এএএন/আরজি

 
.


আলোচিত সংবাদ