যে ১১ দফা দাবিতে ধর্মঘটে ক্রিকেটাররা

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

যে ১১ দফা দাবিতে ধর্মঘটে ক্রিকেটাররা

ক্রীড়া প্রতিবেদক ৬:০৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০১৯

যে ১১ দফা দাবিতে ধর্মঘটে ক্রিকেটাররা

বাংলাদেশের ক্রিকেটে হঠাৎই আন্দোলনের আগুন। বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ নানা দাবিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বিরুদ্ধে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন ক্রিকেটাররা। মোট ১১ দফা দাবিতে বিসিবির বিরুদ্ধে এই ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে।

হঠাৎ ডাকা এই ধর্মঘটের নেতৃত্বে রয়েছেন টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিমসহ জাতীয় দলের অন্য ক্রিকেটাররাও আন্দোলনে শরীক। শুধু ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা এমপি এখনো আন্দোলনে শরীক হননি।

দেশের ক্রিকেট ঠিকঠাক চলছে না-এই অভিযোগে আজ দুপুরে সংবাদ সম্মেলন ডাকেন ক্রিকেটাররা। এ উপলক্ষে ক্রিকেটাররা দুপুরের মধ্যেই মিরপুরের ক্রিকেট একাডেমী ভবনের সামনে জমায়েত হন। আন্দোলনের নেতা হিসেবে সেখানেই ধর্মঘটের ডাক দেন সাকিব। স্পষ্ট কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ক্রিকেট কার্যক্রমে ক্রিকেটাররা অংশ নেবে না।’

নেতা হিসেবে সাকিবই ধর্মঘটের ডাক দেন। তবে আন্দোলনের মোট ১১ দফা দাবি পেশ করেন ১১ জন ক্রিকেটার। একেক জনে তুলে ধরেন একেক দাবি। প্রথম দাবি উত্থাপন করেন নাঈম ইসলাম, ‘কোয়াব (ক্রিকেটার ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) এর নির্বাচন হবে কিনা, কে প্রেসিডেন্ট হবে, কে সম্পাপদ হবে-তা আমরা ক্রিকেটাররাই নির্বাচন করব।’

দ্বিতীয় দাবি তুলে ধরেন জাতীয় দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, ‘আপনারা সবাই জানেন, গত কয়েক বছর ধরে প্রিমিয়ার লিগের পরিস্থিতি ঠিক কি। এটা নিয়ে কম-বেশি সবাই অসন্তুষ্ট। এখানে পারিশ্রমিকের একটা মানদণ্ড বেঁধে দেওয়া হয়েছে। খেলোয়াড়দের অনেক লিমিটেশন দেয়া হয়েছে। আগে যেমন ছিল, তেমনটা নেই। আগে খেলোয়াড়ে ঠিক করতে পারত কোন ক্লাবে খেলবে, কত পারিশ্রমিক পাবে। আমাদের দাবি, প্রিমিয়ার লিগ যেন আগের মতো ফিরে পাই।’ মোদ্দা কথা, দ্বিতীয় দফা দাবির সারসংক্ষেপ হলো, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে কে কোথায় খেলবে, কত পারিশ্রমিক পাবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ খেলোয়াড়দের দিতে হবে।

তৃতীয় দাবিটি তুলে ধরেন মুশফিকুর রহিম, ‘আমাদের তৃতীয় দাবি বিপিএল নিয়ে। আমরা জানি এ বছরের বিপিএলটা বিশেষ। এটাকে অবশ্যই আমরা সম্মান করি। তবে আমাদের দাবি, আগামী বছর থেকে যেন আগের নিয়মেই বিপিএল ফিরিয়ে আনিা হয়।’ তৃতীয় দাবির মূল কথা, আগামী বছর থেকে ফ্যাঞ্চাইজি ভিত্তিতেই বিপিএল চালাতে হবে। দেশি ও বিদেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে দামের তারতম্য ঠিক করতে হবে। বাইরের দেশগুলোর লিগগুলোর মতো ড্রাফটে কোপন খেলোয়াড়কে কোন গ্রেডে রাখা হবে, সেই সিদ্ধান্ত খেলোয়াড়কে নিতে দেওয়া হোক।

৪ ও ৫ নম্বর দাবি তুলে ধরেন সাকিব আল হাসান। এই দুটি দাবির সারমর্ম হলো, প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে বেতন-ভাতা বাড়াতে হবে। ম্যাচ ফি অন্তত ৫০ শতাংশ বাড়াতে হবে। তাদের সবার ধারণা, বৃদ্ধির পর ম্যাচ ফির অঙ্কটা হবে অন্তত এক লাখ টাকা। খেলোয়াড়দের অনুশীলন, জিম, মাঠ ও অন্যান্য সুযোগ বাড়াতে হবে। সারা বছরই কোচ, ট্রেনার, ফিজিও নিশ্চিত করতে হবে। তারা যে পরিকল্পনা দেবেন, তা যেন প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ক্রিকেটাররা অনুসরণ করতে পারে। এ সব সুযোগ-সুবিধা যদি এ বছর নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়, তাহলে যেন আগামী বছরই সবকিছু নিশ্চিত করা হয়। খেলোয়াড়দের অনুশীলন সুবিধা শুধু ঢাকায় না, সব বিভাগের দল যেন তাদের নিজেদের মাঠেই সে সুবিধা পায়। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে মানসম্পন্ন বল দিতে হবে। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ক্রিকেটারদের যেসব হোটেলে রাখা হয়, সেসব আবাসিক হোটেল যেন মানসম্পন্ন হয, খাবার যেন ভালো মানের হয়। যাতায়াত ভাতা হিসেবে ‘প্লেন ফেয়ার’ নিশ্চিত করতে হবে। যেসব হোটেলে রাখা হবে, সেসব হোটেলে যেন জিম এবং সুইমিং পুল থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

৬ নম্বর দাবি তুলে ধরে এনামুল হক জুনিয়র বলেন, ‘জাতীয় দলের চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়ের সংখ্যা বাড়িয়ে ৩০ করতে হবে। তিন বছর ধরে বেতন-ভাতা বাড়ানো হচ্ছে না। তা শিগগিরই বাড়াতে হবে।

৭ নম্বর দাবি তুলে ধরেন তামিম ইকবাল, ‘দেশি কোচদের গুরুত্ব দিতে হবে। দেশি ও বিদেশি কোচদের বেতন বৈষম্য দূর করতে হবে। আম্পায়ারিংয়ের মান উন্নত করতে হবে। আর সেজন্য আম্পায়ারদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। দেশি ট্রেনার এবং ফিজিওর ক্ষেত্রেও তাই। মাঠ কর্মীদের বেতন-ভাতাও বৃদ্ধি করতে হবে।’

৮ নম্বর দাবি উত্থাপন করে এনামুল হক বিজয় বলেন, ‘ঘরোয়া ক্রিকেটে ৫০ ও টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট বাড়াতে হবে। বিপিএলের আগে আরেকটি টি-টোয়েন্টি লিগ চালু করাটা জরুরী। জাতীয় লিগে আগে প্রথম শ্রেণীর ম্যাচের সঙ্গে একটি ম্যাচ খেলা হতো, সেটা আবার চালু করতে হবে।’

৯ নম্বর দাবি তুলে ধরে নুরুল হাসান বলেন, ‘ঘরোয়া ক্রিকেটে একটি নির্দিষ্ট দিনপঞ্জিকা দিতে হবে। যাতে আগে থেকেই উক্ত টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি নেওয়া যায়।’

১০ নম্বর দাবি তুলে ধরেন জুনায়েদ সিদ্দিকি, ‘প্রিমিয়ার লিগের বকেয়া টাকা যেন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাওয়া যায়, এটা নিশ্চিত করতে হবে।’

সর্বশেষ ১১ নম্বর দাবিটি তুলে ধরেন ফরহাদ রেজা, ‘দুটির বেশি ফ্যাঞ্চাইজি (বিদেশি) লিগ খেলতে না দেওয়ার বিধিনিষেধ তুলে নিতে হবে। জাতীয় দল বা জাতীয় লিগে ব্যস্ত না থাকা ক্রিকেটারদের যেন অন্য কোথাও খেলার সুযোগ দেওয়া হয়।’

১১ দফা দাবি উত্থাপনের পর সমাপনী বক্তব্যে নেতা সাকিব তুলে ধরেন ঘরোয়া ক্রিকেটের সেই কলঙ্কিত অধ্যায়টি, ‘আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগের লিগে মাঠে নামার আগেই অনেক সময় ফল জানা যায়। টানা দুই তিনদিন আম্পায়ারের বাজে সিদ্ধান্তে আউট হওয়ার পর একদিন ভালো বলে আউট হলে দেখা যায়, একজন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার শেষ! খেলোয়াড় তৈরির পাইপলাইন ঠিক রাখতে চাইলে, ভবিষ্যতের খেলোয়াড় নিশ্চিত করতে হলে, আমাদের অবশ্যই এসব দিকে নজর দিতে হবে।

শেষটা তিনি করেন আরও একবার সেই কথা বলে, ‘যত দিন এই দাবিগুলো পূরণ না হচ্ছে, আমরা ক্রিকেটাররা কোনো রকম ক্রিকেট কার্যক্রমে অংশ নেব না।’

কেআর/

 

ক্রিকেট: আরও পড়ুন

আরও