অ্যাশেজ ২০১৯ : স্টিভেন স্মিথের শাপমুক্তির গল্প

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯ | ২ কার্তিক ১৪২৬

অ্যাশেজ ২০১৯ : স্টিভেন স্মিথের শাপমুক্তির গল্প

প্রণব আচার্য্য ১১:২২ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯

অ্যাশেজ ২০১৯ : স্টিভেন স্মিথের শাপমুক্তির গল্প

স্টিভেন স্মিথ

গেল বছরের ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো অস্ট্রেলিয়ার বর্ষসেরা পুরস্কার অ্যালান বোর্ডার মেডেল জেতেন স্টিভেন স্মিথ। তার আগে ঘরের মাঠে জেতেন অ্যাশেজ। বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে সমকালীনদের মধ্যে তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বিরাট কোহলি। আর সামনে কেবল স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। আধুনিক যুগের ব্র্যাডম্যান বলা হত তাকে।

স্বপ্নের মতো এক সময় পার করছিলেন স্মিথ। ছিলেন টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের শীর্ষ ব্যাটসম্যান। রেটিং পয়েন্টও ছিল অবিশ্বাস্য উত্থান। ব্র্যাডম্যানের গড়া সর্বকালের সেরা রেটিং পয়েন্ট ৯৬১ থেকে মাত্র ২৩ পয়েন্ট দূরে ছিলেন তিনি। মানে সেই সময় স্মিথের রেটিং পয়েন্ট ছিল ৯৩৮। যেভাবে এগুচ্ছিলেন তিনি তাতে সবার ধারণা হয়েছিল, অচিরেই ব্র্যাডম্যানকে ছাড়িয়ে যাবেন স্মিথ।

কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল মার্চে। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে স্বর্গ থেকে পতন ঘটে স্মিথের কেপ টাউন টেস্টে বল ট্যাম্পারিং কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে নন্দিত খেলোয়াড় থেকে বিশ্বের সবচেয়ে নিন্দিত খেলোয়াড়ে পরিণত হন তিনি। একই সাথে সব ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হন ১২ মাসের জন্য।

এ ঘটনাকে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের সবচেয়ে কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও বল ট্যাম্পারিংয়ের ঘটনায় স্মিথ একা জড়িত ছিলেন না। এর মূল হোতা ছিলেন ক্যামেরন ব্যানক্রফট ও ডেভিড ওয়ার্নার। শাস্তি পেয়েছিলেন তারাও।

স্মিথের মতো বিশ্বমানের ক্রিকেটারের এমন ন্যক্কারজনক আচরণে বিস্মিত হয়েছিল সারাবিশ্ব। এ ঘটনায় অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট সংস্কৃতি নিয়েও উঠেছিল প্রশ্ন। সব মিলিয়ে একটা অন্ধকার সময় পার করেছিল ক্রিকেটের এই অভিজাত দলটি।

এই সময় পেছনে ফেলে অবশ্য আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে অস্ট্রেলিয়া। নির্বাসন দণ্ড কাটিয়ে দলে ফিরেছেন স্মিথও। কিন্তু শঙ্কা ছিল নিজের হারানো গৌরব কি পুনরুদ্ধার করতে পারবেন তিনি?

এই প্রশ্নের উত্তর সদ্য সমাপ্ত অ্যাশেজে দিয়েছেন স্মিথ। ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এবারকার অ্যাশেজ দিয়েই আবার টেস্ট ক্রিকেটে ফিরেছেন স্মিথ। ফিরেই করলেন অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স। মূলত তার ব্যাটে ভর দিয়েই দীর্ঘ ১৮ বছর পর ইংল্যান্ডের মাটিতে অ্যাশেজ ধরে রাখতে পেরেছিল টিম পেইনের দল। এই অ্যাশেজকে বলা চলে স্মিথের শাপমুক্তির অ্যাশেজ।

এজবাস্টনের প্রথম টেস্টেই করেছিলেন জোড়া সেঞ্চুরি। লর্ডসে প্রথম ইনিংসে আউট হয়েছিলেন ৯২ রানে। তার আগে অবশ্য আর্চারের বাউন্সিতে মাথায় আঘাত পান তিনি। ফলে দ্বিতীয় ইনিংসে আর ব্যাট করতে পারেননি। একই কারণে খেলতে পারেননি হেডিংলির তৃতীয় টেস্ট। চতুর্থ টেস্টে ফিরেই করলেন ডাবল সেঞ্চুরি। পঞ্চম টেস্টেও পেয়েছেন রান।

সিরিজে তার ইনিংসগুলো এরকম— এজবাস্টন (১৪৪ ও ১৪৩), লর্ডস (৯২), ওল্ড ট্রাফোর্ড (২১১ ও ৮২) ও দ্য ওভাল (৮০ ও ২৩)। অর্থাৎ মোট সাত ইনিংসে একবারই পঞ্চাশের নিচে আউট হয়েছেন তিনি। পুরো টেস্টে সেঞ্চুরি করেছেন ৩টি, যার একটি আবার ডাবল সেঞ্চুরি। সব মিলিয়ে মোট রান ৭৭৪, গড় ১১০.৫৭। অবিশ্বাস্য!

এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো অ্যাশেজের ৬০০ পেরুনো রান করলেন স্মিথ। শুধু তাই নয় এই শতাব্দীতে এক টেস্ট সিরিজে সর্বাধিক রান করার রেকর্ডও ভেঙে দিলেন তিনি। এর আগে অবশ্য স্মিথেরই এই রেকর্ড ছিল। ভারতের বিপক্ষে ২০১৪-১৫ সালে ৭৬৯ রান করেছিলেন তিনি।

এই সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টেই র‌্যাঙ্কিংয়ে নিজের শীর্ষস্থান ফিরে পান স্মিথ। তার অনুপস্থিতিতে এতদিন রাজত্ব করেছিলেন কোহলি। কিন্তু ফিরেই ভারত অধিনায়ককে হটিয়ে শীর্ষে ফেরেন। শুধু তাই নয় রেটিং পয়েন্টেও অবিশ্বাস্য উল্লম্ফন ঘটান। বর্তমানে তার রেটিং পয়েন্ট ৯৩৭। কোহলির চেয়ে স্পষ্ট ৩৪ পয়েন্ট এগিয়ে।

ভীষণ দুঃসময় কাটিয়ে লোক নিন্দা উপেক্ষা করে এমন প্রত্যাবর্তন কেবল স্মিথের পক্ষেই সম্ভব। কারণ তিনি তো জানেন জীবনটা আসলে একটা জার্নি। যেখানে চলার পথে থাকবে নানা উত্থান পতন। থাকবে হতাশার কালো অন্ধকার। যা অতিক্রম করে কেবল এগিয়ে যেত পারে ‘গ্রেট’রাই।

অবিস্মরণীয় এই সিরিজ শেষে সবার পাশাপাশি স্মিথ ধন্যবাদ দিয়েছেন স্ত্রী ডানি উইলিসকে। নির্বাসনে থাকাকালীন তিনিই তো ঘুরে দাঁড়ানের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন স্বামীকে। তাই ওভালে সিরিজ শেষে স্মিথ বলেছেন, ‘দীর্ঘ ১৮ মাস ক্রিকেট থেকে দূরে ছিলাম। এই ভাবে ফিরে আসার জন্য অনেককেই ধন্যবাদ দিতে চাই। বিশেষ করে আমার স্ত্রীকে।’

পিএ

 

ক্রিকেট: আরও পড়ুন

আরও