বিশ্বকাপে প্রকৃতির আশীর্বাদ মিলবে রোনালদোর?

ঢাকা, সোমবার, ২৩ জুলাই ২০১৮ | ৭ শ্রাবণ ১৪২৫

বিশ্বকাপের ১০০ কিংবদন্তি—৩৩

বিশ্বকাপে প্রকৃতির আশীর্বাদ মিলবে রোনালদোর?

খাইরুল আমিন তুহিন ৪:১২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৭, ২০১৮

print
বিশ্বকাপে প্রকৃতির আশীর্বাদ মিলবে রোনালদোর?

এবারের বিশ্বকাপ পর্তুগালও জিততে পারে! এমন কথা কিন্তু কোনো কোনো পন্ডিত বলেই ফেলেছেন। কিন্তু ১৯৬৬ সালে ইউসেবিওর বিপ্লবে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েই সেমি ফাইনালে ওঠার ইতিহাস ছুঁতেই তো পর্তুগিজদের লেগেছিল কত বছর! লেগেছিল আসলে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোকে। ২০০৬ সালে রোনালদোর পর্তুগালই আবার বিশ্বকাপের সেমিতে খেলল। রোনালদোর দলটাই গেলবার ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আর সিআরসেভেন একা হাতে তো কতো কিছুই করে দিতে পারেন! করছেন তো। পর্তুগালের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় রোনালদোই আজ বিশ্বকাপের ১০০ কিংবদন্তির তালিকায়। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের ১০০ দিনের কাউন্টডাউন উৎসব চলছে। লিখছেন খাইরুল আমিন তুহিন।

বয়স হয়েছে ৩৩। সুতরাং এটাই শেষ সুযোগ। কিন্তু বিশ্বকাপ জিততে তো একটা দল লাগে। সেই যে লুই ফিগোর সোনালি প্রজন্ম ছিল, রোনালদো তখন এইটুকুন। সেই দল ইউরো জিততে পারেনি। বিশ্বকাপেও কিছু করে দেখাতে পারেনি। এখন রোনালদো আগুন ছড়ান দুনিয়ায়। দলটাও বেশ। কিন্তু বিশ্বকাপ জেতার মতো কি না কে জানে। অবশ্য যে দলটি ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন হতে পারে তাদের পক্ষে তো সব সম্ভব। আর সেটা রাশিয়ায় সম্ভব না হলে ফুটবল খেলাটারই সবচেয়ে বেশি দুঃখ থেকে যাবে নির্ঘাৎ। কারণ, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সময় রোনালদোর বয়স হবে ৩৭। ওই বয়সে তিনি কি আর খেলবেন? রোনালদোর মতো সর্বকালের সেরা এক খেলোয়াড়ের হাতে বিশ্বকাপটা দেখতে না পারা তো বিশ্বকাপেরই দুঃখ হয়ে থাকার কথা।

তর্কসাপক্ষে বর্তমান বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। আসলে এই শ্রেষ্ঠত্বটা তার অনেক দিনের। রেকর্ড ছোঁয়া ৫টি ব্যালন ডি'অর জয়ী। ইউরোপে অবশ্য এই রেকর্ডের একমাত্র মালিক রোনালদো। ইউরোপের ৫ লিগ মিলিয়ে সর্বোচ্চ গোলের মালিক। গোল মানেই রোনালদো। স্প্যানিশ জায়ান্ট ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের প্রায় সব গোলের রেকর্ডেই তিনি। গোলের বরপুত্রই তো! ক্লাব ফুটবলে তার অবিশ্বাস্য সব অর্জন।

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ (১৪৯) খেলার রেকর্ডের সাথে সর্বাধিক গোল (৮১) করার রেকর্ডটাও রোনালদোর। ১৮ বছর বয়সে জাতীয় দলে অভিষেক। ২২তম জন্মদিনের পরই দেশের অধিনায়ক। সেই থেকে নেতৃত্বেই। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বাজার কাটতি বা বাণিজ্যিক মূল্য যার সেই তিনিও রোনালদো। পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন ২০১৫ সালেই রোনালদোকে 'সর্বকালের সেরা পর্তুগিজ ফুটবলার' ঘোষণা দিয়ে রেখেছে।

ছেলেবেলায় ছিল হার্টের সমস্যা। আর ছিল দারিদ্র। ছিলেন মদের নেশায় ডুবে থাকা বাবা। এর কোনোটাই রোনালদোর ঠিক ফুটবলার হয়ে ওঠার পক্ষে ছিল না। কিন্তু ফুটবলের জন্য অদম্য টান এবং এত্তটুকু থাকতেই ফুটবলকে বশে এনে ফেলাই কাজে দিয়েছে পরে। অল্প বয়সেই দেশের সেরা ক্লাবের রিজার্ভে। তারপর মাঠে নেমে মুগ্ধতা ছড়ানো। রূপকথার গল্পের মতো তারপরই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে উড়ে যাওয়া। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে বিশ্ব ফুটবলে নিজেকে জানান দেওয়াও ওই পথে। সেখান থেকে বিশ্বকাপে নিজেকে অপেক্ষাকৃত কম বড় দলের বিশাল তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলা। দলকে বিশ্ব শিরোপা থেকে মাত্র একধাপ দূরে নিয়ে গিয়েও একটুর জন্য থেমে যাওয়ার কষ্টও। কিন্তু অর্জনও ওটা। রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে ইংল্যান্ড ছেড়ে স্পেনের রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর তো আর পিছু ফিরে তাকানোর গল্প নেই। রোনালদো বছরের পর বছর বিশ্বেরই সেরা। লিওনেল মেসি তার যুগের খেলোয়াড় বলেই কেবল মাঝে মাঝে দ্বিতীয় সেরা হয়ে যাওয়া। কিন্তু ক্যারিশমায় কোনো না কোনো দিক দিয়ে সবসময়ই বিশ্বের সেরা, ইতিহাসের অন্যতম সেরা।

লোকে বলে, বিশ্বকাপের কিংবদন্তি হতে বিশ্বকাপ জিততে হয়। আরো বলে, সর্বকালের সেরা হতেও বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হতে হয়। কিন্তু রোনালদো এমন এক ফুটবলার যার আসলে এসব লাগে না। তা বিশ্বকাপ বাছাই থেকে প্রায় একা হাতে দেশকে বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়ার গল্প তার আছে। আছে বহুকাল পর দেশকে বিশ্ব আসরের সেরা চারে তোলার কীর্তিও। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে। আরো আছে বিশ্বকাপ হতাশা।

খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিতির শুরুটা উইংয়ে। রাইট উইং। যার কাজ শুধু ক্রস দেওয়া না। ওটা করেও আরো কতো কি করেন তার ইয়ত্তা নেই। শরীরটাকে বানিয়েছেন সুঠাম। বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম দ্রুতগতির ফুটবলার। সৃষ্টিশীলতায় রোনালদোর তুলনা কেবল রোনালদোই। লাতিন ফুটবলের সাথে ইউরোপিয়ানের মিলন এই শ্রমিক ও একাধারে শিল্পী ফুটবলারের খেলায়। প্লেমেকার থেকে সেন্টার ফরোয়ার্ড, ভূমিকা যখন যা প্রয়োজন তখন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশি আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়। রাইট থেকে লেফট উইং হয়ে গোলের মুখে। গোল করতে কোথাও থেকে বাধে না, কোনো অবস্থায় থামেন না। রীতিমতো এক আতঙ্কের নাম রোনালদো।

২০০৬ বিশ্বকাপে রোনালদো গিয়েছিলেন ইউরোপ বাছাইয়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে। সাতটি গোল করেছিলেন। এরপর বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে ইরানের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করলেন। ওটা বিশ্বকাপে তার প্রথম গোল। এরপর বিতর্ক আছে কোয়ার্টার ফাইনালে। ইংল্যান্ডের ওয়েইন রুনি ফাউল করেছিলেন। রুনি আর রোনালদো তখন ম্যানইউ সতীর্থ। ওই ফাউলের জন্য রেফারির কাছে এমনভাবে আবেদন করেছিলেন রোনালদো যে বলা হয় ওটার প্রভাবেই রুনিকে লাল কার্ড দেখতে হয়। পরের মুহূর্তে রোনালদোর পর্তুগাল বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে চোখ টেপাকেও ইংলিশ মিডিয়া ইস্যু বানিয়েছিল। ইংল্যান্ডে পরে জেরবার হয়ে গিয়েছিল ফুটবলারের। তো সেমি ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে ১-০ গোলে হারের ম্যাচ দর্শকের দুয়ো শুনতে হয়েছিল। ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ টুর্নামেন্টের 'বেস্ট ইয়ং প্লেয়ার অ্যাওয়ার্ড' এর জন্য রোনালদোকে গোনায় ধরেননি! অথচ কি খেলাটাই না খেলেছিলেন! ফিফার ওই সিদ্ধান্ত নাকি রোনালদোর আচরণের সাথে সম্পৃক্ত ছিল।

এই যে তারুণ্যের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি মিলল না, উল্টো এমন বিনোদন দিয়েও দুয়ো শুনতে হলো, আবার দলও যেতে পারলো না ফাইনালে। হতাশার নয়? পরের দুই বিশ্বকাপে যথাক্রমে শেষ ষোলো ও প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নেওয়া তো রোনালদোর জন্য আক্ষেপ হয়েই থাকবে। তাছাড়া তিন বিশ্বকাপে ১০ ম্যাচ খেলে মোটে দুই গোল, যার একটি আবার পেনাল্টিতে, রোনালদোর সাথে যায়? হতাশার নয়?

তবু সেরার জন্য প্রকৃতিও হাত বাড়িয়ে থাকে। সুযোগ এলে দেন উজার করে। প্রকৃতির সেই উজার করা আশীর্বাদ রোনালদোর ভাগ্যে বিশ্বকাপে জুটবে তো?

ক্যাট/এসএম

 
.



আলোচিত সংবাদ