বিশেষ শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরাচ্ছে ‘প্রয়াস স্কুল’

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

বিশেষ শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরাচ্ছে ‘প্রয়াস স্কুল’

জহির শান্ত, কুমিল্লা ১:১৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ০২, ২০১৯

বিশেষ শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরাচ্ছে ‘প্রয়াস স্কুল’

প্রাত্যহিক সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত বিশেষ শিশুদের (প্রতিবন্ধী) স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে ‘প্রয়াস স্কুল’।

অবজ্ঞা-অবহেলায় সমাজে পিছিয়ে থাকা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন এসব শিশুদের স্কুলটিতে ‘জীবনের পাঠ’ দেয়া হয় বিশেষ যত্নসহকারে। ছায়াঘেরা মনোরম পরিবেশ আর আদর-মমতায় ১৩৫ শিশু বেড়ে উঠছে স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার প্রয়াসে।

‘বিশেষ শিশু বিশেষ অধিকার’—এ মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ২০১২ সালের ১ মার্চ কার্যক্রম শুরু হয় প্রয়াস কুমিল্লার। সেনাবাহিনী পরিচালিত এ স্কুলে বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি শিশুদের কর্মক্ষম করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেওয়া হয় বিভিন্ন প্রশিক্ষণও। ফলে একদিকে যেমন তাদের সাবলম্বী হওয়ার পথ সুগম হচ্ছে; অন্যদিকে প্রস্ফুটিত হচ্ছে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক আবেগের সুপ্ত বিকাশও।



কুমিল্লা সেনানিবাসের বাংলা বাজার এলাকায় গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দেখা গেছে, চারদিক ঘেরা বৃত্তাকার সুবিশাল ভবনের পরিচ্ছন্ন পরিবেশে আপন আঙিনায় বিচরণ করছে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু-কিশোররা। ভবনে প্রবেশমুখে বাঁ-পাশের দেয়ালে লেখা ‘আই এম ডিফারেন্টলি এবলড্- নট ডিজেবলড্...’।

শ্রেণিকক্ষে গিয়ে চোখে পড়ল এসব শিশুদের বিশেষভাবে সক্ষমতার চিত্র। হাত নেড়ে, ইশারায় নিজস্ব ভঙ্গিতে কুশল বিনিময় করছেন; বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ রুমালে চিত্র আঁকছেন তো কেউ আবার ছড়া আবৃত্তি করে শোনাচ্ছেন।

অপর একটি শ্রেণিকক্ষে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে, সেলাই করা, রুমাল তৈরি, পুতি দিয়ে বিভিন্ন উপকরণ তৈরি, পাখা তৈরি, বিভিন্ন উৎসবের কার্ড তৈরিসহ নানাবিধ বিষয়।

এ ক্লাসের শিক্ষিকা শাহীনা আক্তার জানান, এসব হাতের কাজ ছাড়াও তাদের আমরা বিভিন্ন শাকসবজি ও ফল উৎপাদনের প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকি।


প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর কল্যাণে গড়ে ওঠা ‘প্রয়াস’ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে বলে জানা গেছে, শারীরিক-মানসিক বিকাশে অপূর্ণ শিশুদের সকল দুর্বলতা কাটিয়ে সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে আসাই লক্ষ্য তাদের। আর সে লক্ষ্য পূরণে এখানে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের সঠিক পরিচর্যা, বিশেষায়িত শিক্ষা এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। পাঠদানের ক্ষেত্রে ফলো করা হয় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কারিকুলাম।

স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সেলিনা জাহান পরিবর্তন ডটকমকে জানান, এখানে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, অটিজম, বাক্য শ্রবণে প্রতিবন্ধীতাসহ সব ধরনের বিশেষ শিশুই রয়েছে। স্কুলে ভর্তির পর প্রথমেই বাচ্চাটিকে লেভেলিং করা হয়। তার অক্ষমতার ধরনটা কি; যদি দেখা যায়, বাচ্চাটির পড়াশোনার সক্ষমতা থাকে আমরা তাকে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান দিয়ে থাকি।



এনসিটিভির কারিকুলাম ফলো করেই এসব বাচ্চাকে শিক্ষা দেওয়া হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে প্রতিটি শিশুকেই দৈনন্দিন জীবনযাপনের ওপর বিশেষভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়। সকালে প্রাতঃক্রিয়া থেকে শুরু করে রাতে ঘুমুতে যাওয়া পর্যন্ত একজন মানুষের নিত্যদিনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডই আছে বিশেষায়িত শিক্ষা কার্যক্রমে। যাতে করে শিশুটি স্বাভাবিক জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হতে পারে, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে।

স্কুলের একটি শ্রেণিকক্ষে গিয়ে কথা হয়, শিক্ষিকা সাহেদা আক্তারের সাথে। পরিবর্তন ডটকমকে তিনি বলেন, এ শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীদের বাক্য শ্রবণ সমস্যা রয়েছে। তাই আমরা তাদের সেভাবেই শিক্ষা দিয়ে থাকি। তারা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন সিম্বলে ভাব বিনিময় করে থাকে। কিন্তু বাইরের পরিবেশেও যেনো খাপ খাইয়ে নিতে পারে, অন্যদের সাথেও যেন প্রয়োজনীয় বার্তাটুকু আদান-প্রদান করতে পারে—সেভাবেই তাদের গড়ে তোলা হচ্ছে।

প্রয়াসের প্রধান উপদেষ্টা সেনাবাহিনীর কুমিল্লা এরিয়া কমান্ডার ও ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আহম্মদ তাবরেজ শামস চৌধুরী, এনডিসি, পিএসসি বলেন, বিশেষ শিশুদের জন্য পরিচালিত স্কুল ‘প্রয়াসের সব সুযোগ-সুবিধা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হবে।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সবার শৃঙ্খলিত সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়াস কুমিল্লা ভবিষ্যতে একটি দৃষ্টান্তমূলক বিশেষ শিশু সেবাকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দিন দিন ব্যাপ্তি ছড়াচ্ছে ‘প্রয়াস’। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যেই বিশেষ শিশুদের অভিভাবকদের কাছে হয়ে উঠেছে আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক।

২০১২ সালে মাত্র ১৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কার্যক্রম শুরু করা স্কুলটিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী আছে ১৩৫ জন। এর মধ্যে ৫২ জন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, ১৭ জন শারীরিক প্রতিবন্ধী, ৪২ জন অটিজম, ১৬ জন বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী এবং ৮ জন বহুমাত্রিক প্রবিন্ধী শিশু রয়েছে।

এসব শিক্ষার্থীকে স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত করে তুলতে এখানে দায়িত্ব পালন করছেন প্রধান শিক্ষক, ১৬ জন শিক্ষক, ১৩ জন সহকারী শিক্ষক ও একজন করে ফিজিও থেরাপিস্ট ও স্পিচ থেরাপিস্ট। নিজস্ব পরিবহনের মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়া করা হয়। যাতায়াতের সুবিধার্থে কুমিল্লা এরিয়া সদর দপ্তরের পক্ষ হতে সম্প্রতি আরো একটি বাস প্রদান করা হয়েছে।

জেডএস/এমএ