ঐতিহাসিক বেতিয়ারা শহীদ দিবস

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

ঐতিহাসিক বেতিয়ারা শহীদ দিবস

জাহিদ পাটোয়ারী, কুমিল্লা ২:০৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৭

ঐতিহাসিক বেতিয়ারা শহীদ দিবস

আজ ১১ নভেম্বর। ঐতিহাসিক বেতিয়ারা শহীদ দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের জগন্নাথদীঘি ইউনিয়নের বেতিয়ারা নামক স্থানে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনীর ৯ জন বীরযোদ্ধা পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের এই ইতিহাসকে সমুজ্জ্বল করে রাখতে প্রতি বছরের মতো এবারো ১১ নভেম্বর যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হবে বেতিয়ারা শহীদ দিবস।

বেতিয়ারায় পাক হানাদার বাহিনীর বিরদ্ধে সম্মুখ সমরে নিহত হন নিজাম উদ্দিন আজাদ (ছাত্র নেতা), সিরাজুল মনির, জহিরুল হক দুদু, মোহাম্মদ সফি উল্যাহ, আওলাদ হেসেন, আবদুল কাইয়ুম, বশিরুল ইসলাম, মো. শহীদ উল্যাহ সাউদ ও আবদুল কাদের।

বেতিয়ারা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি রক্ষা পরিষদের সভাপতি মো. জিয়াউল হোসেন জিবু বলেন, শনিবার ভোর ৬টায় পতাকা উত্তোলন, সকাল ১০টায় স্থানীয়দের পুষ্পমাল্য অর্পণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে প্রিয় মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার প্রত্যয়ে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির উপদেষ্টা সভাপতি মনজুরুল আহসান খানসহ যৌথ গেরিলা বাহিনীর ৭৮ জন সদস্য ভারতের বিভিন্ন  ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেন।

দেশে ফিরে যুদ্ধে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে এসব গেরিলা যোদ্ধারা ভারতের বাইকোয়া বেইজ ক্যাম্প থেকে ১০ নভেম্বর রাত ৮ টায় চৌদ্দগ্রাম সীমান্তবর্তী ভৈরব নগর সাব ক্যাম্পে (চৌত্তাখোলা ক্যাম্পের শাখা) পৌঁছান।

এ বাহিনীর পরিকল্পনা ছিল দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক, শ্রমিক নেতা রুহুল আমিন কায়সারের সঙ্গে যোগাযোগ করে নোয়াখালীর সেনবাগ ও কাজীর হাট এলাকা নিয়ে একটি মুক্তাঞ্চল গড়ে তোলা।

ভৈরব নগর সাব-ক্যাম্পের দুইজন মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের বিএসসি ও সামসুল আলম ১১ নভেম্বর রাতেই গেরিলা বাহিনীর ওই দলটির বাংলাদেশে প্রবেশের নকশা প্রণয়ন করেন।

প্রণীত নকশা অনুযায়ী সাব-ক্যাম্পের ৩৮ জন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে বেতিয়ারা চৌধুরী বাড়ির দু’পাশে এ্যাম্বুশ পাতা হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক শত্রুমুক্ত কিনা পরীক্ষা করার জন্য স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কাদের ও আবদুল মন্নানকে ওই সড়কে পঠানো হয়।

সিগনালের দায়িত্বে থাকা কাদের ও মন্নান মহাসড়ক শত্রুমুক্ত বলে রাত ১২টায় মূল বাহিনীকে জানান। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে যৌথ গেরিলা বাহিনীর ৩৮ জনের এ দলটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অতিক্রমের জন্য এগিয়ে আসে। এসময় সড়কের অপর (পশ্চিম) পাশে গাছের আড়ালে অ্যাম্বুশ পেতে লুকিয়ে থাকা হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অতর্কিতে ব্রাশফায়ার শুরু করে। এতে ৯ গেরিলা যোদ্ধা ঘটনাস্থলেই শহীদ হন এবং বেশ ক’জন আহত হন।

এক সপ্তাহ পর স্থানীয় লোকজন ধানক্ষেত থেকে শহীদদের গলিত লাশ উদ্ধার করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে একটি গর্ত খুঁড়ে মাটি চাপা দেয়। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের  প্রাণপণ লড়াইয়ে ২৮ নভেম্বর  চৌদ্দগ্রামের এ জগন্নাথদীঘি অঞ্চল শত্রুমুক্ত হয়।

পরদিন ২৯ নভেম্বর স্থানীয় নেতারা এবং মুক্তিযোদ্ধারা গর্ত থেকে লাশগুলো উত্তোলন করে ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক মাওলানা  আব্দুল আলীর (মরহুম) মাধ্যমে নামাজে জানাজা দিয়ে মহাসড়কের পশ্চিম পাশে দ্বিতীয়বার দাফন করেন এবং শহীদদের গণকবরের উপর স্বাধীন বাংলার লাল-সবুজের পতাকা উত্তোলন করে পাশেই নির্মাণ করেন স্মৃতিস্তম্ভ।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি রক্ষা পরিষদের সভাপতি জিয়াউল হোসেন জিবু আরো জানান, মহাসড়ক ৪ লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু হলে ৯ শহীদের গণকবর ও স্মৃতিস্তম্ভ মহাসড়কের মধ্যে পড়ে যায়।

পরবর্তীতে স্থানীয় লোকজনের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ফোর লেন প্রকল্পের ঠিকাদার ২০১৫ সালের জুন মাসে গণকবরটি মহাসড়কের পূর্ব পাশে সড়ক ও জনপথের ৪০ শতক জায়গায় স্থানান্তর করে।

জেপি/বিএইচ/