জৌলুস হারাচ্ছে কাপ্তাই হ্রদ

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

জৌলুস হারাচ্ছে কাপ্তাই হ্রদ

প্রান্ত রনি, রাঙ্গামাটি ১২:২৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০১৯

জৌলুস হারাচ্ছে কাপ্তাই হ্রদ

এক সময় রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদে বড় মাছের আধিক্য বেশি হলেও এখন তা হ্রাস পেয়েছে। জেলেদের অসচেতনতা ও ছোট ফাঁসের কারেন্ট জাল ব্যবহারের কারণেই দিনদিনই বড় মাছের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে, হ্রদ সৃষ্টির পরবর্তী সময়ের রেকর্ড ভেঙে বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদে ছোট মাছের আধিক্যই বেশি।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মূলত: হ্রদের নাব্যতা সংকট ও ছোট ফাঁসের কারেন্ট জালে রুই জাতীয় মাছের ছোট আকারের মাছ ধরার পড়ায় বড় মাছের উৎপাদন কমছে।

সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলাধার রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদ। এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বদ্ধজলাশয়সমূহের মধ্যে সর্ববৃহৎও। কাপ্তাই হ্রদের আয়তন প্রায় ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর। যা বাংলাদেশের পুকুরসমূহের মোট জলাশয়ের প্রায় ৩২ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ মোট জলাশয়ের প্রায় ১৯ শতাংশ। ১৯৬১ সালে রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে এ হ্রদের সৃষ্টি হলেও এটি রাঙ্গামাটিতে মৎস্য উৎপাদন ও স্থানীয় জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রেখে আসছে। অন্যদিকে মৎস্য উৎপাদনের মধ্যদিয়ে রাজস্ব আদায়েও ব্যাপক ভূমিকা রাখছে এই হ্রদটি।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কাপ্তাই হ্রদে দুই প্রজাতির চিংড়িসহ মোট ৭৫ প্রজাতির মাছের আবাসস্থল। এর মধ্যে ৬৭টি প্রজাতির মাছ দেশীয় এবং ৮ প্রজাতির মাছ বিদেশি। কাপ্তাই হ্রদে ২০০২-০৩ অর্থ-বছরে মাছের উৎপাদন ছিল ৪ হাজার ৫৬৬ মেট্রিকটন যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৫৭৬ মেট্রিকটন। তবে মাছের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়লেও কমেছে বড় মাছের সংখ্যা। তবে বাড়ছে ছোট মাছ।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, রাঙ্গামাটি নদী-উপকেন্দ্রের তথ্য মতে, ২০০২-০৩ অর্থবছরে কাপ্তাই হ্রদে রুই জাতীয় মাছের উৎপাদন ছিল ২৫৮ দশমিক ৭৫ মেট্রিকটন। যা বর্তমানে ৫৩ দশমিক ২ মেট্রিকটন। অন্যদিকে ছোট মাছের উৎপাদন ২০০২-০৩ অর্থবছরে ৩ হাজার ৪০০ দশমিক ১৯ মেট্রিকটন। যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩৭৪ দশমিক ১৩ মেট্রিকটন। এতে করে রুই জাতীয় মাছের বাণিজ্যিক উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ৮১ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে। অন্যদিকে ছোট মাছ ৮ শতাংশ থেকে ৯২ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ছোট মাছের মধ্যে বিশেষকরে কেচকি, চাপিলা ও মলা মাছের আধিক্যই সবচে বেশি।

রাঙ্গামাটি নদী-উপকেন্দ্র সূত্রে আরও জানা গেছে, বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়, কেচকি, চাপিলা, কাঁটা মইল্যা, দেশি মলা, তেলাপিয়া, কালিবাউস আইড়, বাটা ও ফলি মাছ। এর মধ্যে কেচকি, চাপিলা, কাঁটা মইল্যা, দেশি মলা এই চার প্রজাতির মাছ ছোট মাছ।

এছাড়া হ্রদে মজুদকৃত মাছের মধ্যে রয়েছে, গ্রাস কার্প, সিলভার কার্প, কার্পিও, রাজপুঁটি, তেলাপিয়া, মোজাম্বিকা তেলাপিয়া, গিফট তেলাপিয়া, মহাশোল, আফ্রিকান মাগুর, বিগহেড কার্প ও থাই পাঙ্গাস। এর মধ্যে আট প্রজাতির মাছ বিদেশি প্রজাতির মাছ। কাপ্তাই হ্রদে ক্রমহ্রাসমান প্রজাতির সমূহের মধ্যে রয়েছে (যেগুলো দিনদিন কমছে), রুই, কাতল, মৃগেল, বাঁচা, পাতি পাবদা ও বড় চিতল। বিলুপ্ত প্রজাতির মধ্যে রয়েছে, দেশি মহাশোল, মধু পাবদা, পোয়া, ফাইস্যা, তেলে গুলসা ও সাদা ঘনিয়া। ইতোমধ্যে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিসমূহের মধ্যে রয়েছে সীলন, দেশি সরপুঁটি, ঘাউরা, বাঘাইড় মোহিনী বাটা ও দেশি পাঙ্গাস।

কাপ্তাই হ্রদে কার্প জাতীয় মাছের বংশবৃদ্ধি, হ্রদে অবমুক্ত করা পোনা মাছের সুষম বৃদ্ধি, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিতকরাসহ হ্রদের প্রাকৃতিক পরিবেশে মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধির সহায়ক হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিবছরের পহেলা মে থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদে তিন মাস মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। চলতি বছরও হ্রদে কার্প জাতীয় মাছের বংশবৃদ্ধি ও সুষম বৃদ্ধির জন্য কাপ্তাই হ্রদে ৩০ মেট্রিকটন পোনা ছাড়ল বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) রাঙামাটি কেন্দ্র।

এ প্রসঙ্গে রাঙ্গামাটি মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক উদয়ন বড়ুয়া জানান, হ্রদ সৃষ্টির অর্ধশতাব্দীর পর দিনদিনই হ্রদে রুই জাতীয় মাছ ধরা কম পড়ছে। বিশেষ করে হ্রদের নাব্যতা সংকটের কারণে গভীর জলাশয়ের অভাবে বড় মাছ বা গভীর জলের মাছের সংখ্যা কমছে। এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে হ্রদে পোনা ছাড়লে হ্রদের পানি স্বল্পতার কারণে জেলেদের কেচকি জালে রুই জাতীয় মাছের পোনা ধরা পড়ে যায়। এসব কারণে কাপ্তাই হ্রদে কার্প জাতীয় মাছের উৎপাদন কমছে।

এই ব্যবসায়ী নেতা মনে করেন, প্রতিবছর কেবল তিনমাস নয়, প্রয়োজনবোধে মাছ আহরণের নিষেধাজ্ঞার সময় বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া জেলেরা যাতে পোনা মাছ ধ্বংস করতে না পারে সে ব্যাপারে বিএফডিসিকে পাহারার ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা চাই আগের মত, কাপ্তাই হ্রদে বড় মাছের সংখ্যা বাড়ুক। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে তা হারাতে বসেছে।

কাপ্তাই হ্রদে দিনদিন বড় মাছের হ্রাস পাওয়া ও ছোটমাছের আধিক্য বাড়ার প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, রাঙামাটি নদী-উপকেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিএম শাহিনুর রহমান জানান, কাপ্তাই হ্রদে বড় মাছের উৎপাদন বাড়াতে বিশেষ করে হ্রদে ছোট ফাঁসের কারেন্ট জালের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে।

মৎস্য শিকার শুরুর প্রথম একমাস মশারী কাপড়ের কেচকি মাছের জালের ব্যবহার বন্ধ রাখতে হবে। এছাড়া ছোট প্রজাতির বড় আকারের মাছ আহরণের সুবিধার্তে মশারীর কাপড়ের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত বড় ফাঁস বিশিষ্ট জাল দিয়ে তৈরি কেচকি জাল ব্যবহার করতে হবে।

তিনি আরও জানান, বিশেষ করে প্রজনন মৌসুম শেষে যখন কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ শুরু হয়, তখন ছোট ফাঁসের জালে বড় প্রজাতির ছোট আকারের মাছগুলো ধরা পড়ে। অসাধু জেলেরা তখন মাছগুলোকে হ্রদে অবমুক্ত না করে রেখে দেয়। বিশেষকরে জেলেদের সচেতনতার অভাবে কাপ্তাই হ্রদে দিনদিনই বড় মাছের উৎপাদন কমছে। তাই জনসচেতনতার পাশাপাশি পাহারার মাধ্যমে কেচকি জালে রুই জাতীয় মাছের পোনা ও ছোট মাছের নিধন বন্ধ করতে হবে।

এআরই

 

চট্টগ্রাম: আরও পড়ুন

আরও