খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য চট্টগ্রামে ৮৫ লাখ টাকা আদায়

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য চট্টগ্রামে ৮৫ লাখ টাকা আদায়

চট্টগ্রাম ব্যুরো  ৭:৪২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৮, ২০১৯

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য চট্টগ্রামে ৮৫ লাখ টাকা আদায়

খাদ্য মন্ত্রণালয়ে ঘুষ দেয়ার নামে চট্টগ্রাম বিভাগীয় খাদ্য পরিবহন ঠিকাদারদের (ডিআরটিসি) কাছ থেকে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা হাতিয়ে পনয়ার অভিযোগ উঠেছে ডিআরটিসি সভাপতি যুবলীগ নেতা সৈয়দ মাহমুদুল হকসহ তিন নেতার বিরুদ্ধে।  খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে ডিআরটিসির ঠিকাদারদের খাদ্য পরিবহনের অ্যানহান্সমেন্ট (বর্ধিত) বিল মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় করে আনতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে এ টাকা আদায় করেন তারা। অন্য দুই নেতা হচ্ছেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রশীদ ও ক্যাশিয়ার আমির হোসেন।

ঠিকাদাররা জানান, তাদের প্রত্যেক ঠিকাদারের কাছ থেকে আদায় করা হয় ২৩ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। আবার যাদের অ্যানহান্সমেন্ট বিলের পরিমাণ বেশি (৪ লাখ টাকার বেশি) তাদের কাছ থেকে আরও অতিরিক্ত ৭ শতাংশ করে চাঁদা আদায় করা হয়েছে। ডিআরটিসিতে মোট ঠিকাদার রয়েছেন ৩২৭ জন। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে এ টাকা আদায় করা হয়েছে। ঠিকাদারদের কাছ থেকে আদায় করা চাঁদার টাকার পরিমাণ প্রায় ৮৫ লাখ টাকা। ডিআরটিসির অন্তত অর্ধ শতাধিক ঠিকাদার তিন নেতাকে চাঁদা দেয়ার বিষয়টি এই প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন।

ঠিকাদারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের কথা স্বীকার করে ডিআরটিসি সাধারণ সম্পাদক আবদুর রশীদ বলেন, ‘অ্যানহান্সমেন্ট বিল আনতে আমাদের বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়েছে, খরচ করতে হয়েছে। আমরা দুই বছর যাবত এ কাজটা করেছি। আমাদের অনেক টাকা খরচ হয়ছে না? সব ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে টাকা নেয়া হয়েছে। এতে অন্যায়ের কি আছে। এদেশটা হয়েছে গিভ অ্যান্ড টেকের (দেয়া- নেয়ার)।’      

ঠিকাদাররা অভিযোগ করেন, তাদের অ্যানহান্সমেন্ট বিল ছাড় হয়েছে ঠিকই। কিন্তু তারা খবর নিয়ে জানতে পেরেছেন, তাদের কাছ থেকে যে ৮৫ লাখ টাকার মতো মন্ত্রণালয়ে দেয়ার কথা বলে নেয়া হয়েছে সেই টাকা আদৌ দেয়া হয়নি।  তাই ঠিকাদাররা প্রদত্ত চাঁদার টাকা ফেরত চান। টাকা ফেরত  চাইলে তাদেরকে দেয়া হয় হুমকি-ধমকি। যুবলীগ নেতা মাহমুদুল হকের সাফ জবাব-‘ঘুষের টাকার হিসেব থাকে না। টাকার কোন হিসেবে নেই। কয়েকজন নাম প্রকাশ করতে রাজি হলেও বেশির ভাগই মাহমুদুল হকের বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বেশির ভাগ ঠিকাদার চট্টগ্রামের বাইরের হওয়ায়  কাউকে পরোয়া করেন না যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মাহমুদুল হক।

ডিআরটিসির একাধিক ঠিকাদাররা জানান, তারা ২০১৩ সালে দুই বছরের জন্য ডিআরটিসি সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে। দুই বছরের জন্য চুক্তি করলেও তারা খাদ্য পরিবহন করে ২০১৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খাদ্য পরিবহন করতে গিয়ে ঠিকাদাররা অনেক সময় লোকসান দিয়েও সরকারি খাদ্য পরিবহন করেছেন। কেননা পাঁচ বছরে গাড়ি ভাড়াসহ অনেক কিছুর দামের তারতম্য হয়েছে বা বেড়েছে। একারণে ঠিকারদাররা লোকসান পুষিয়ে নিতে অ্যানহান্সমেন্ট (বর্ধিত) দর দিতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। ঠিকাদারদের আবেদন খাদ্য মন্ত্রণালয় হয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে গিয়ে আবেদনটি গৃহিত হয়।

২১ অগাস্ট অতিরিক্ত পরিচালক (চলাচল) উৎপল কুমার  সাহা স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় উল্লেখ করেছেন-‘চট্টগ্রাম বিভাগীয় সড়ক খাদ্য পরিবহন ঠিকাদারদের কার্যদরের উপর ০১/০৭/২০১৬ হতে ৩০/০৯/২০১৮ ইংরেজী  তারিখ পর্যন্ত ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রশাসনিক অনুমোদন সূত্রস্ত স্মারকে প্রদান করা হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উক্ত পত্রের আলোকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সড়ক পরিবহন ঠিকাদারদের (ডিআরটিসি) কার্যদর বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’

এ নির্দেশ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তার কাছে আসলে যুবলীগ নেতা মাহমুদুল হক নিয়োজিত ঠিকাদারদের কাছে চাঁদার হার বসিয়ে দেন। তিনি ঠিকাদারদের সাফ জানিয়ে দেন, মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের মোটা অংকের ঘুষ দিতে হবে। ঘুষ না দিলে ওই বর্ধিত বিল ছাড় হবে না। এরপর ঠিকাদারদের কাছ থেকে টাকা আদায় শুরু করেন।

ডিআরটিসির প্রবীণ ঠিকাদার আবু তৈয়ব জানান, ‘অ্যানহান্সমেন্ট বিল আনতে আমার কাছ থেকে ২৩ হাজার নিয়েছেন সমিতির নেতারা। আবার অনেকের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকাও আদায় করা হয়েছে। যাদের বিলের পরিমাণ আরও বেশি তাদের কাছ থেকে আরও বেশি টাকা আদায় করা হয়েছে।’ 

মেসার্স দিপালী এন্টারপ্রাইজ এর স্বত্ত্বাধিকারী ধীরেন্দ্র দাশগুপ্ত জানান,‘অ্যানহান্সমেন্ট বিল নিতে সব ঠিকাদারকে টাকা দিতে হয়েছে  ডিআরটিসির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক-ক্যাশিয়ার এই টাকা নিয়েছেন। আমি নিজেও চাঁদা দিয়েছি। তবে মন্ত্রণালয়ে ঘুষ দেয়ার কথা বলে এই চাঁদা নেয়া হলেও আদৌ তা দেয়া হয়েছে কিনা তা আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না।’

চট্টগ্রাম বিভাগীয় খাদ্য পরিবহন ঠিকাদারদের (ডিআরটিসি) সভাপতি চাঁদা নেয়ার কথা স্বীকার করে সৈয়দ মাহমুদুল হক বলেন, ‘ওই টাকা আমি নিই নাই। সমিতির কার্যকরী কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নেয়া হয়েছে। এটা শুধু চট্টগ্রামে নয়, সারাদেশে ঠিকাদাররা এ টাকা দিয়েছে। এ বিল পাস করাতে আমাদের নানাভাবে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে। এতে আমাদের অনেক টাকা খরচ হয়েছে।

এমএইচ

 

চট্টগ্রাম: আরও পড়ুন

আরও