চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় ডুবে আছে বিপজ্জনক ৩০ জাহাজ

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় ডুবে আছে বিপজ্জনক ৩০ জাহাজ

জামাল উদ্দিন হাওলাদার, চট্টগ্রাম ব্যুরো ৪:৪৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০১৯

চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় ডুবে আছে বিপজ্জনক ৩০ জাহাজ

চট্টগ্রাম বন্দর-সংলগ্ন কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় বিপজ্জনক অবস্থায় ডুবে আছে প্রায় ৩০টি ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের জাহাজ।

ডুবন্ত এসব জাহাজের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর হুমকির মুখে পড়বে কি না, তা নিশ্চিত নয় বন্দর কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, বন্দরের বহির্নোঙরে ডুবে যাওয়া জাহাজের কারণে এই মুহূর্তে বন্দরের জাহাজ চলাচলে তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

তিনি জানান, বন্দর-সংলগ্ন কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ডুবে থাকা জাহাজ তুলতে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। অতিশিগগিরই জাহাজ তোলার কার্যক্রম শুরু হবে।

একই সুরে বন্দরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ডুবে থাকা এসব জাহাজের কারণে বন্দরের কোনো ক্ষতি হবে না। জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক গতিতে চলছে। ডুবে যাওয়া জাহাজগুলোর লোকেশন চিহ্নিত আছে।

স্বাধীনতার পরপরই রাশিয়ান সমুদ্র অনুসন্ধানী দল ডুবে যাওয়া জাহাজগুলোর কারণে বন্দরে জাহাজ চলাচলে কোনো সমস্যা হবে না উল্লেখ করে প্রতিবেদন দিয়েছেন বলেও বন্দর সূত্র জানায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের কর্ণফুলী চ্যানেলে ও বহির্নোঙরে ডুবে থাকা জাহাজগুলোর ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও। কেউ কেউ এসব জাহাজ তুলে ফেলার পক্ষে, আবার কারো মতে এসব জাহাজ এমন জায়গায় ডুবন্ত আছে তাতে কোনো সমস্যা হবে না। অতীতে হয়নি, বর্তমানে নয়, ভবিষ্যতেও হবে না।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সমুদ্র বিশেষজ্ঞ বন্দরের বহির্নোঙর এলাকাটিকে টাইম বোমার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তেলবাহী ডুবন্ত জাহাজের সঙ্গে এসব ডুবে যাওয়া কোনো জাহাজের ধাক্কা লাগলে ভয়াবহ বিপর্যয় হলে, সেটা ঠেকানো যাবে না।

তিনি বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষ লাল পতাকা উড়িয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে। অথচ একের পর এক জাহাজডুবির ফলে বন্দরের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ডুবন্ত জাহাজের কারণে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনায় চট্টগ্রাম বন্দর দীর্ঘদিনের জন্য অচল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাহাজ চলাচলে অভিজ্ঞ একজন নাবিক বলেন, যে লাইন দিয়ে জাহাজ বন্দরের ভেতরে ঢোকে, সেটুকু পরিষ্কার করেই আমরা দায়িত্ব শেষ করছি। কর্ণফুলী যেভাবে দখল হচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে দুটি জাহাজ ক্রস করে পাশাপাশি এগিয়ে যাওয়াও কঠিন হবে। নির্দিষ্ট অংশ পরিষ্কার করে যুগ যুগ কোনো বন্দর চলতে পারে না।

বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে চট্টগ্রাম বন্দরের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ফরিদুল আলম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন স্থানে যেসব জাহাজ ডুবে আছে, তা বন্দর কর্তৃপক্ষের নজরে আছে। জাহাজগুলো পর্যায়ক্রমে তোলার পরিকল্পনা আছে। তবে এ মুহূর্তে এমন অনেকগুলো প্রকল্প হাতে আছে, যা এর চেয়েও জরুরি। সে কারণে বন্দর কর্তৃপক্ষ এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না।

তিনি বলেন, রাশিয়ান অনুসন্ধানী টিম এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বন্দরকে ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে, ভবিষ্যতে এসব জাহাজের কারণে বন্দরের জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়বে না। বহির্নোঙরের গভীরতা কমছে না। একটি বড় জাহাজের যতটুকু গভীরতা প্রয়োজন তা অব্যাহত রয়েছে।

ক্যাপ্টেন ফরিদ বলেন, ডুবে থাকা জাহাজগুলো তোলা অনেক ব্যয়সাপেক্ষ। এর আগেই বেশ কয়েকবার চেষ্টা হয়েছে। ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে এসব জাহাজ তোলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে পর্যায়ক্রমে তোলার পরিকল্পনা বন্দরের রয়েছে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও কর্ণফুলীতে জাহাজডুবির ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষ নীরব থাকে। জাহাজডুবির পর গতানুগতিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া লাল পতাকা ওড়ানো ছাড়া বন্দরের আর কোনো কাজ থাকে না। অবগত থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তিগত দৈন্যতা ও তহবিল সংকটের দোহাই দিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ ডুবন্ত জাহাজগুলো উদ্ধার করছে না। বড় জাহাজ এখন খুব একটা না ডুবলেও প্রতি বছর ছোট কার্গো জাহাজগুলো ডুবছে। যে এলাকায় জাহাজ ডুবে সে এলাকার নাব্য স্বাভাবিকভাবে হ্রাস পায়।

ডুবে থাকা জাহাজগুলোর কারণে বন্দরের বহির্নোঙরের আলফা এনকোরেজকে অনেকে টাইম বোমার সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। কারণ এখানে ডুবে রয়েছে তেলবাহী ট্যাংকারও। যদি বড় কোনো জাহাজের সঙ্গে ডুবে থাকা  জাহাজের ধাক্কা লাগে, তাহলে বন্দর চ্যানেল বন্ধসহ বড় ধরনের বিপদ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে কর্ণফুলীতে ডুবে থাকা জাহাজগুলোর কারণে নদীতে বিশাল আকারের চরও গজিয়ে উঠছে। এসব জাহাজ উদ্ধারে সরকারি বা বেসরকারিভাবে কেউ এগিয়ে আসছে না।

জানা গেছে, তলিয়ে যাওয়া ৩০টি জাহাজের মধ্যে ১০টি জাহাজ উদ্ধারে একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। এ জন্য ২০০ কোটি টাকার খরচ প্রয়োজন হবে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়। ৯৭-৯৮ অর্থবছরে চালানো এ সমীক্ষায় বিপুল ব্যয়ের প্রসঙ্গটি এলে সব উদ্যোগ থেমে যায়। ২০০০ সালের দিকে ডুবন্ত জাহাজ উদ্ধারে টেন্ডারও ডাকা হয়।

একাধিক ঠিকাদার আগ্রহ দেখানোর পরও জাহাজ উদ্ধারের কাজ হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দর সংলগ্ন কর্ণফুলী নদীতে বর্ষা মৌসুমে সাড়ে আট ফুট ড্রাফ্টের জাহাজ প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। কর্ণফুলীর নাব্য ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে বর্তমান ড্রাফ্টের জাহাজ চলাচলও দুষ্কর হয়ে পড়বে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ বছরে ১৯টিসহ স্বাধীনতা পূর্ব ও উত্তর সময়ে প্রায় ৩০টি জাহাজ বন্দর চ্যানেল, বহির্নোঙর ও বন্দরসংলগ্ন কর্ণফুলী নদীতে ডুবে যায়। বর্তমান বাজারমূল্যে ডুবন্ত এসব জাহাজের দাম প্রায়  দেড়শ কোটি টাকা। এসব জাহাজ উদ্ধার করে লোহা-লক্কড় বিক্রি করলেও প্রায় ৩০-৪০ কোটি টাকা আয় হতে পারে। বন্দরের জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য বর্তমানেও ড্রেজিং বাবদ ২৪২ কোটি টাকা খরচ করছে বন্দর।

বন্দরের মেরিন বিভাগের তালিকা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর-সংলগ্ন কর্ণফুলী চ্যানেলে এবং বহির্নোঙরে যেসব জাহাজ ডুবে রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ১৯৬৭ সালে ডুবে যাওয়া এমভি স্টার আলটায়ার ও ১৯৭১-এর বিডিআরএস বার্জ নং-১১। ১৯৮৪ সালের পাঁচ জানুয়ারি বহির্নোঙর এলাকায় ডুবে যায় এসএস কাওয়া নামের অপর একটি জাহাজ। একই বছর ১৭ জুলাই কর্ণফুলীতে এমভি সাগর তলিয়ে যায়। ১৯৮৬ সালের নভেম্বর বন্দরে ১ নম্বর জেটির বিপরীতে এমভি সি-হর্স নামের একটি জাহাজ ডুবে যায়। এই জাহাজটির কিছু অংশ উদ্ধার করা গেলেও বেশির ভাগ ডুবে আছে। ১৯৮৭ সালের ২৮ জানুয়ারি বন্দরের বহির্নোঙর এলাকায় ডুবে যায় এমভি টিনা নামের জাহাজ। ১৯৮৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বহির্নোঙর এলাকায় ডুবে যায় এমভি লিটা। এ দুই জাহাজের কিছু অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। ১৯৯০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বহির্নোঙরে ডুবে যায় এমভি রয়েল বার্ড। ১৯৯২ সালের ১৬ মে এমভি ক্রিস্টাল-৯, ১৯৯৩ সালের ২২ জুলাই ড্রাইডক জেটির কাছে ডুবে যায় আলী-৫। একই বছরের ১২ ডিসেম্বর রিভার মুরিং-৮-এর কাছে ডুবে যায় বার্জ আর্গোনেট।

১৯৯৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজডুবির বছর। এ বছর এমভি মার্জিন, এমভি ইয়াছিন, এমভি মোনালিসাসহ ৫টি জাহাজ ডুবে যায়। ১৯৯৭ সালের ৩০ জানুয়ারি বহির্নোঙরে ডুবে যায় এমভি আটলান্ডার। এরপর চট্টগ্রাম বন্দরে এফভি মিন সন্ধানী। ২০০০ সালে ১ নম্বর জেটিতে আগুন লেগে ডুবে যায় সাউদার্ন কুইন নামের বিশাল জাহাজটি। ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি বহির্নোঙর এলাকায় মাদার ট্যাংকারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে দুই টুকরো হয়ে মালামালসহ ডুবে যায় এমভি ফজিলত-১। একই সালের ২০ মে ডুবে ফায়ারটেক, ৩ জুলাই ডুবে বিআইডব্লিওটিসির জাহাজ সি-১০৬৩। ২০০৫ সালের ২ আগস্ট ডুবে এমভি ফরচুন।

এসব জাহাজের কলেবর অনেক বড়। ২০০৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় বেশ কয়েকটি কার্গো জাহাজ বন্দরের বিভিন্ন স্থানে ডুবে যায়। যেসব জাহাজে পাথর, লোহাজাতীয় পণ্যসহ বিভিন্ন ভারী পণ্য রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন অংশে ডুবে থাকা এসব জাহাজের কারণে নৌ-চলাচলে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা। বহির্নোঙরেও ঝুঁকি আছে। কারণ এতগুলো ডুবন্ত জাহাজ বিশ্বের আর কোনো বন্দরে নেই। বিভিন্ন দেশে জাহাজ ডুবলেও চর পড়ার আগেই জাহাজ উদ্ধার করা হয়েছে।

৩০ হাজার টনের বেশি জাহাজ ঢুকতে পারে না বলে লাইটার জাহাজ দিয়ে লোড করে পোর্টে আনলোড করতে হয়। না হলে সময় ও অর্থের অপচয় এবং জাহাজজট হতে পারে। তবে ডুবে যাওয়া জাহাজ তুলতে টেন্ডার হলেও কোনো এক রহস্যময় কারণে অগ্রগতি নেই।

এইচআর

 

চট্টগ্রাম: আরও পড়ুন

আরও